ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

নৈতিক প্রতিবন্ধিত্ব?

নৈতিক প্রতিবন্ধিত্ব?
×

ড. মো. আলী ওয়াক্কাস সোহেল

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২০ | ০৫:৪৯ | আপডেট: ২২ জুন ২০২০ | ১০:৪২

অনিশ্চয়তা এবং আতঙ্ক পৃথিবীব্যাপী বিরাজমান। করোনার ভয়াল থাবায় তাবৎ দুনিয়ার মানুষ প্রতিনিয়ত এ থেকে বাঁচার নানাবিধ কৌশল গ্রহণ ও অভিযোজন এর মাধ্যমে টিকে থাকার প্রানান্তকর প্রচেষ্টায় সর্বদা সজাগ রয়েছে।

বদলে যাওয়া পৃথিবীতে এর উপস্থিতি মানব সমাজকে এ বার্তা দিচ্ছে যে, একটু পর কি ঘটবে তা নিয়ন্ত্রণে নেই, তারপরও কি আমরা সতর্ক হতে পেরেছি? আমরা কি নিজেদের বদলাতে সক্ষম হয়েছি? আমাদের চারপাশে চোখ বুলালে কি দেখতে পাই? মানব সমাজে নানা কারণে প্রতিবন্ধিত্বের উপস্থিত রয়েছে| দেখা যায় এসব প্রতিবন্ধীরা স্বীয় মেধার স্ফুরণ ঘটিয়ে বাধা কে পা মাড়িয়ে উচ্চাসনে সমাসীন হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের যেসব বিভাজনের মাধ্যমে প্রতিবন্ধিত্বের প্রকরণ করেছে এ যাবতকালে আমরা এর আলোচনা পর্যালোচনা করেই সমাজের অবশিষ্ট মানুষেরা তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছি। আসলে কি তাই যাদের হাত, পা,চোখ, কান এবং বুদ্ধি স্বাভাবিক রয়েছে, তারা কি হলফ করে বলতে পারি আমাদের মাঝে কোন ধরনের প্রতিবন্ধিত্ব নেই? চারপাশের বিভিন্ন প্রপঞ্চের দিকে দৃষ্টি দিলেই দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার ভাবে উপলব্ধি করা যাবে আমাদের অবস্থান কোথায়? মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। সেরা জীব হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মানবীয় গুণাবলীর স্ফুরণ ঘটিয়ে তার শ্রেষ্ঠত্বের জানান দেওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে আমরা কি দেখছি? হেন কোন অপকর্ম নেই যার সাথে মানব সমাজের সম্পর্ক নেই এ দিকটায় শিক্ষিত সমাজ অনেকটুকু এগিয়ে। আমরা প্রতিনিয়ত মিথ্যা কথা বলা, ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি,খুন-খারাবি, প্রতারণা, অসততা, অন্যায়, স্বার্থপরতা এবং লোভ-লালসা কে সামাজিক জীবনের অনুষঙ্গ হিসেবে ভেবে নিয়েছি।

গুরু-শিষ্যের মাঝে আবহমানকাল থেকেই পবিত্র সম্পর্ক বিরাজমান। শিক্ষিত সজ্জন ব্যক্তিরা শিক্ষকতাকে পেশা এবং নেশা হিসেবে গ্রহণ করার মানসে চাকচিক্যময় জীবনের হাতছানি উপেক্ষা করে জ্ঞান বিতরণের পবিত্র দায়িত্বটুকু সফলভাবেই  পালন করে আসছিল| 

সমসাময়িক বাস্তবতা আমরা কি দেখছি ? শিক্ষক সমাজের একাংশ দলীয় লেজুড়বৃত্তি, দল-উপদলে বিভক্তি, স্বজনপ্রীতি, যৌন কেলেঙ্কারির মতো নানা ঘটনায় নিজেদের সম্পৃক্ত করছে। মাদ্রাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছাত্রীরা নানাভাবে যৌন হেনস্থার শিকার হচ্ছে। এ মহান পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা স্বীয় প্রতিষ্ঠানের বাহিরে তাদের জ্ঞান ব্যবসা বিতরণ করছেন। যেখানে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তার ছাত্রদের সামনে নিজেকে নীতিবান হিসেবে জাহির করার প্রচেষ্টা চালায়, এদের মাঝেই এমন কতিপয়  শিক্ষক আছেন যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে গিয়ে  অবলীলায় ভুলে যায় তার নীতি-নৈতিকতার কথা। এ সমাজে এমন শিক্ষাগুরুরও দেখা মেলে যাদের দেখলে মনে হবে ভাজা মাছটা ও উল্টিয়ে খেতে পারেন না তারাই কিনা গবেষণা প্রকল্পের ভুয়া বিল ভাউচার তৈরি করে প্রকল্পের সমন্বয় করে থাকেন। যার কারণে তথাকথিত গবেষকরা শিক্ষিত সমাজে ভাউচার বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে থাকেন। এমন কি হওয়ার কথা ছিল? এ দায় কার?

করোনার ভয়াল ছোবল কিন্তু আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আমরা নৈতিকভাবে কথাটা স্বার্থপর। যেখানে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর এদেশের মানুষ এত বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়নি, সেখানটায় এ মহাবিপর্যয়ে আমরা কি দেখছি? বাজার থেকে সেনিটাইজার, অ্যান্টিসেপটিক উধাও।ব্যবহৃত সার্জিক্যাল মাস্ক কুড়িয়ে নিয়ে বাজারজাতকরণ, নকল ওষুধের ছড়াছড়ি, করোনা আক্রান্ত রোগী এবং সম্মুখ যোদ্ধাদের প্রতি সমাজের মানুষের নেতিবাচক মনোভাব, কবরস্থানের সাইনবোর্ড টানিয়ে লাশ দাফনের নিষেধাজ্ঞা, আক্রান্ত ব্যক্তির বাড়িতে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, নমুনা সংগ্রহে এ্যাম্বুলেন্স কে বাধা প্রদান, সম্মুখ যোদ্ধার ব্যাপারে বাড়িওয়ালাদের বিরূপ মনোভাব, লাশ দাফন ও সৎকারে গ্রামবাসীদের বাধা, ত্রাণ বিতরণের নামে গ্রহীতাদের সাথে দাতার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাস্যজ্জল ফটোবিলাস, নিম্নআয়ের মানুষের ব্যাপারে বাড়িওয়ালার নির্লজ্জ আচরণ এবং  করোনা উপসর্গ সম্পর্কিত ভুয়া  সনদের  প্রাপ্যতা-এসবই বলে দিচ্ছে আমাদের নৈতিকতার মান কেমন এবং  কতটুকু? একজন মা জ্বরে আক্রান্ত অথচ তার স্বামী সন্তান কিভাবে থাকে জঙ্গলে রেখে আসে?  কতটা অমানুষ হলে এটা করতে পারে। এসবই হচ্ছে বর্তমান সময়ের বাস্তবতা।

প্রতিবন্ধকতা আমাদের চারপাশে মাকড়সার জালের মত বিস্তৃতি লাভ করলে ও এখন ও এ সমাজে সাহসী, সজ্জন, মেধাবী, নির্লোভ, নিঃস্বার্থ, পরোপকারী, দানবীর, দয়ালু এবং নিরহংকারী মানুষের উপস্থিতি ও কদর রয়েছে। করোনায় দেশ প্রেমিক পুলিশ বাহিনীর সাহসী ভূমিকা এবং প্রণোদনা, ব্যাংকারদের দেশ সেবার মানসিকতা এবং আন্তরিকতা, চিকিৎসক ও সেবিকাদের জানবাজি রেখে আক্রান্তদের পাশে দাঁড়ানো, পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগ, স্বেচ্ছাসেবী মনোভাবসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি, মানবতাবাদী সংগঠন কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন, আনজুমানে মফিদুল ইসলাম, বিদ্যানন্দ, টিম জানালা, এক টাকার আহার সহ নানা কার্যক্রম জনতার মানসপটে ফিনিক্স পাখির মতো আবির্ভূত হচ্ছে। 

পৃথিবীতে  স্থায়ীভাবে থাকা যাবে না এবং মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করার কোন বিকল্প নেই। করোনার উপস্থিতি এ বিষয়টি নিয়ে ভাবার বিষয়ে নতুনভাবে ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে। কিসের অহংকার স্বার্থবাদীতা এবং ক্ষমতার দম্ভ? একদিন সবই অতীত হবে। তাই সময় থাকতেই সাবধান হওয়া দরকার।পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা, সামাজিক সম্পর্ক, পারিবারিক বন্ধন এবং আত্মীয়তা দৃঢ়তা এসব কে পুঁজি করেই সামনে আগাতে হবে। নৈতিক প্রতিবন্ধীরা যদি তাদের কৃতকর্ম অনুধাবন করতে পারে তাহলেই হয়তো বদলে যাওয়া পৃথিবীতে নতুন দিগন্তের দেখা মিলবে।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় 

[email protected]

আরও পড়ুন

×