করোনা পরবর্তী অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কৃষিখাত
ফাইল ছবি
ড. সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী ও মো. সাইফুল ইসলাম
প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২০ | ০২:১৮ | আপডেট: ২৫ জুন ২০২০ | ০২:৫৭
করোনাভাইরাসের প্রভাব অর্থনীতিতে কতটুকু পড়বে তা এখনি পুরোপুরি পরিমাপ করা সম্ভব নয়। তবে এই নিয়ে আমরা সবাই একমত যে, নিকট ভবিষ্যতে আমরা অর্থনৈতিক মন্দার সম্মুখীন হবো। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল জানিয়েছে, ১৯৩০ সালের মহামন্দা পরবর্তী বিশ্বে এই প্রথম আবারও আমরা ওই রকম একটি মহামন্দার সম্মুখীন হতে যাচ্ছি।
শুধুমাত্র বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্বকে সামনে কঠিন এক অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। তবে এই নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতে কতটুকু পড়বে, কত সময় থাকবে এবং তা থেকে কিভাবে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা যায় তা নিয়ে বিশদ আলোচনা, সঠিক পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের ঘোষিত আর্থিক প্রণোদনা এইক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং তা প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু এই আর্থিক প্রণোদনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তুলনামূলক গুরুত্বারোপ করে দ্রুত বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।
কিছুদিন আগে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সাক্ষাতকারে এক রিক্সাচালক বললেন,- `মামা, রিক্সা চালাইয়া আর লাভ হইতাসে না। ভাইবতাছি গ্রামে চইল্যা যামু, কারো থেকে কিছু জমি বর্গা লইয়্যা চাষবাস করুম।’ তখনই মনে হলো সত্যি এদেশের মানুষের বড় একটি অংশ এখনও কৃষিকে তাদের অবলম্বন হিসাবে মনে করে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথায়ও এই বিষয়টা ফুটে উঠেছে। তিনি বারবার বলেছেন কোনও একটি জমিও যেন অনাবাদী না থাকে এবং পাশাপাশি তিনি আর্থিক প্রণোদনার কথাও তুলে ধরেছেন। ছোট থেকে আমরা একটা কথা বলে থাকি, বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। কেননা বালাদেশের মানুষের বড় একটি অংশ কৃষির উপর নির্ভরশীল। গত কয়েক দশকের পরিসংখ্যানও সেই বিষয়টা ফুটে উঠে। ১৯৯২ সালে মোট জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল ৩০.৫১ শতাংশ, যা ২০১০-এ ১৭ শতাংশ এবং ২০১৮ তে ১৩.০৭ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। অর্থনীতির এই সেক্টরাল স্থানান্তরকে আমরা উন্নয়নের মাপকাঠি হিসাবে মনে করে থাকি। যা আমাদের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে। বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭ অনুসারে, বাংলাদেশের কর্মে নিয়োজিত মানুষের মধ্যে ৪০ শতাংশ মানুষ কৃষিকাজে নিয়োজিত। সুতরাং এই তুলনামূলক চিত্রের মাধ্যমে এই বিষয়টি ফুটে আসছে যে, জিডিপিতে কৃষির আনুপাতিক অবদান কমে আসলেও এখনও আমাদের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ কৃষি কাজে জড়িত।
ইতোমধ্যে করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশে লকডাউনের মাধ্যমে সরকার মানুষকে অনেকভাবে ঘরে রাখার চেষ্টা করেও বেশীদিন ঘরে রাখতে পারেনি এবং তা সম্ভবও নয়। কারণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম যত বেশিদিন বন্ধ থাকবে, এর নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতে ততো বেশিহারে বৃদ্ধি পাবে। কিছুদিন আগে লকডাউন খুলে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রদেশের গভর্নরের ভবন অবরোধেও এই বিষয়টা ফুটে উঠে যে, মানুষ এই করোনাভাইরাসের চেয়ে চাকরি হারিয়ে না খেয়ে থাকাকে বেশি শোচনীয় মনে করছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশ ধীরে ধীরে লকডাউন খুলে দিচ্ছে। কেননা অর্থনীতিকে স্থবির রাখলে কিছুদিন পর তা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। তাই স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে কিভাবে ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া যায় সরকারগুলো সে দিকেই মনোনিবেশ করছে।
সরকার ইতোমধ্যে কৃষকদের জন্যে কয়েকটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা দিয়েছেন। ৪ শতাংশ সুদ হারে ঋণ প্রদান, ৯ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি প্রদান, ৮৬০ কোটি টাকার বোরো শস্য ক্রয়, ২০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ক্রয়, ১৫০ কোটি টাকার বীজ প্রদানসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছে। এমতাবস্থায় কৃষির প্রতি আলাদা নজর দেওয়ার মাধ্যমে অর্থনীতিকে দ্রুত পুনরুদ্ধার করা যাবে। যেহেতু করোনা পরবর্তী অর্থনীতিতে শিল্প কারখানা আগেরমত পুরোদমে চলবে না এবং এই খাতে যে শ্রমিকরা কাজ করতো তারা গ্রামের দিকে ফিরে যাবে। সেহেতু কৃষিতে শ্রমিক সরবরাহ বাড়বে এবং গতিশীলতা পাবে। সুতরাং কৃষকরা যাতে কোনও ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন না হয় সেদিকে আলাদা নজর দিতে হবে। কেননা বাজারে সরবরাহ বাড়লে পণ্যমূল্য অবশ্যই কমে আসবে। আর করোনার প্রভাবে ভবিষ্যতে বেকারত্ব দেখা দিবে এবং জনসংখ্যার বড় একটি অংশের আয় কমে যাবে। যার ফলে পণ্যের চাহিদাও কমে যাবে, যা বাজারে পণ্যের দাম অনেকাংশে কমিয়ে দিবে। সুতরাং কৃষি উপকরণ ক্রয়ে সরকারের সরাসরি ভর্তুকি বৃদ্ধি করা, কৃষকদের উন্নতমানের বীজ প্রদানসহ অন্যান্য কার্যক্রম বাড়ানোর মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আনা যাবে। ফলে বাজারে পণ্যের দাম কমে আসলেও তাতে কৃষকদের তেমন কোনও ক্ষতি হবে না। তাছাড়া সরকার ইতোমধ্যে ২১ লাখ টন খাদ্যশস্য কিনবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। যার মধ্যে ৮ লাখ টন হচ্ছে ধান, ১০ লাখ টন চাল, ২.২ লাখ টন আতপ চাল এবং ৮০ হাজার টন গম। এইক্ষেত্রে মধ্যসত্ত্বভোগীরা যাতে কৃষকদের থেকে কম দামে কিনে তা বেশি দামে বিক্রি করতে না পারে সেদিকেও নজর রাখা দরকার। অন্যথায় এই সুবিধা কৃষকদের নিকট পৌঁছাবে না। পাশপাশি কৃষিতে বৈচিত্র্য নিয়ে আসার মাধ্যমে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি যাতে আরও বেশি নিশ্চিত করা যায় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। যেহেতু এই খাতের উৎপাদন, বাজারজাতকরণ খুব অল্প সময়ে হয়ে থাকে, সেহেতু এই খাত যত দ্রুত চাঙ্গা করা যাবে, ততো দ্রুত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা যাবে। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে কৃষি খাতে বরাদ্দ ছিল ২৭ হাজার ২৩ কোটি টাকা। নতুন বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ২৯ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের মাত্র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। কিন্তু অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি হিসেবে বিবেচিত এই খাত করোনা দুর্যোগকালীন বাজেটেও উপেক্ষিত। কৃষকদের নগদ অর্থ প্রদান, কৃষি ভর্তুকি বাড়ানো, কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি এবং প্রশিক্ষণে এই খাতকে আরও বেশি গুরুত্বরোপ করে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো উচিত ছিল।
তাছাড়া করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার এবং তা প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হওয়া একটি সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। এমতাবস্থায় সবার জন্য পুষ্টিকর খাবারের সহজলভ্য করার মাধ্যমে প্রাকৃতিক ইমিউনিটির (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এক্ষেত্রে যে সকল শাক-সবজি প্রাকৃতিক ইমিউনিটি তৈরি করতে সহযোগিতা করবে সে সকল শাক-সবজির উৎপাদনের দিকে আলাদা নজর দিতে হবে। তাছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশও জনগণের জন্য পুষ্টিকর খাবারের সরবরাহের দিকে নজর দিবে এবং সাধারণ মানুষও আগের তুলনায় পুষ্টিকর খাবার বেশি ভোগ করতে চাইবে। ফলে বিশ্ব বাজারে শাক-সবজি রপ্তানির নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি হবে, যা আমাদেরকে এই অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করার পথকে আরও প্রসারিত করবে। বাংলাদেশ বর্তমানে ৫৩ টি দেশে প্রায় ৭০ রকমের শাক-সবজির রপ্তানি করে থাকে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন দীর্ঘদিন যাবত বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা শাক-সবজির গুণমান নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সরকার ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বাজারে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা জারি করে। গতবছর সরকার এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর থেকে সবজি রপ্তানি আয় বাড়তে থাকে। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের শাক-সবজি রপ্তানি হয়েছিল। ২০১৯-২০ অর্থ বছরের প্রথম ছয় মাসেই বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১১৭ মিলিয়ন ডলারের শাক-সবজি রপ্তানি হয়েছে। এক্ষেত্রে কৃষি পণ্যের গুণমান বজায় রেখে রপ্তানি বাড়ানোর জন্যে সরকার রপ্তানিকারকদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। যা আমাদের রপ্তানি আয় বাড়াতে সহায়ক হবে।
সুতরাং করোনা পরবর্তীতে সরকারের সঠিক কর্ম পরিকল্পনা নেওয়া এবং তা দ্রুত বাস্তবায়নের কোনও বিকল্প নেই। কৃষকদের জন্য সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজগুলো ভবিষ্যতে আরও জোরদার করার মাধ্যমে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করার দিকে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন।
লেখকদ্বয় যথাক্রমে সিনিয়র রিচার্স ফেলো, বিআইজিডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও অধ্যাপক অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সহযোগী গবেষক, বিআইজিডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- করোনাভাইরাস
- অর্থনৈতিক মন্দা
- কৃষি
- চতুরঙ্গ