ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

সাদা বীরপুরুষের কালো ঘেন্না

সাদা বীরপুরুষের কালো ঘেন্না
×

আমিরুল আলম খান

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২০ | ০৫:৪২ | আপডেট: ২৫ জুন ২০২০ | ০৬:৩৪

আমেরিকান সভ্যতা ভূমিপুত্র লাল (রেড ইন্ডিয়ান) আর কালো (আফ্রিকান) মানুষের রক্তে মোড়া। হালে তাতে মোলাটো (সাদা-কালো রক্তের মিশেল) আর বাদামি (ভারত ও পশ্চিম এশীয়), হলুদ (চীন, ইন্দোচীন, জাপান, কোরিয়া) বর্ণের মিশেল বেড়েছে। কিন্তু আসল রক্ত গেছে ওই কালোদেরই। তাগড়া ষাঁড়ের মত চেহারা, কাজেও। পেটে দানাপানি থাক বা না থাক, গতর খেটে পিরামিড বানিয়েছে কোন আদিম জমানায় মিশরে, বা আসমানে বাগ বিনিয়েছে বেবিলনে। ফেরাও কিংবা সেমিটিক, ইউরোপীয় আর্য কিংবা স্ক্যান্ডিক এই কালোদের গতর সবার রোশনাই বাড়িয়েছে।

পুরাকালে গ্রিক, রোমান, ফরাসি কিংবা আরব কালো আফ্রিকানদের হাতের ছোঁয়া না পেয়ে ইতিহাসে ঠাঁই পায়নি। পাঁচশ' বছর আগে ঝড়ের তোপে দিক হারিয়ে নতুন দেশে পা ফেলে ইউরোপের সাদা হার্মাদরা ঠিকই বুঝে গিয়েছিল কালো মুরের কব্জির জোরে তারাও লাল মানুষের দেশে সোনা ফলাতে পারবে। আরবদের দেশে চালান হত উত্তর আফ্রিকার কালো গোলাম। আফ্রিদি বলেই কদর ছিল সে পুণ্যভূমে। ইউরোপে তাদের পরিচয় মুর। শেক্সপিয়রের নাটকে সনেটে তা অমর হয়ে আছে। কিন্তু আরবদের হাত-পা বুঝি আফ্রিকার গহীন জঙ্গল আর ঊষর মরু সাহারা পেরিয়ে আরও দক্ষিণে ঢোকার তাকত দেখায় নি। তারা বরং ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে উত্তরে অতলান্তের পারে হিস্পানিয়ায় গদি গাড়তে চেয়েছিল। সফল হলেও চিরস্থায়ী হতে পারে নি। সে তাদের মন্দ কপাল। কিন্তু যেটা তারা রেখে এসেছিল তার বদৌলতেই ইউরোপ সাগর বুকে দুঃসাহসী হয়ে উঠেছিল। 

শত শত জাহাজের খোপে কত কোটি কালো আদম নতুন দুনিয়ায় চালান দিয়ে কত বোম্বেটে ফিরিঙ্গি বিলিওনিয়ার হয়েছে তার অল্পবিস্তর লেখা আছে ইতিহাসের পাতায়। বেশিটাই হাপিস করে দিয়েছে। 

আমেরিকা স্বর্ণপ্রসবিনী হয়েছে এই আফ্রিকা থেকে জাহাজ ভরে আনা কালো মানুষের গতরখাটা শ্রম আর রক্তে। কিন্তু গদি ওই সাদা ইউরোপের। তক্ত তাউসে বসে তারাই ছড়ি ঘুরিয়ে বন্দুকের গুলি আর কামানের গোলায় শাসন করেছে নয়া দুনিয়া। সে ইতিহাস পাঁচশ' বছরের।

কালোদের জীবনের মর্মন্তুদ কাহিনি কল্পনাকেও হার মানায়। কালোদের কপাল! খেটে মরবে, কিন্তু খেতে পাবে না। তারপরও ঈশ্বর ওদের বিশাল বপু ভেঙে দেয় নি। বরং আরও শক্তি আর ক্ষমতা যুগিয়েছেন। আমেরিকার গত পাঁচশ' বছরের ইতিহাস কালো মানুষের হাতে আমেরিকার অহংকার টুইন টাওয়ারের লোহা টানার ইতিহাস, ওয়াশিংটন ডিসিতে বড় বাড়ি সাদাবাড়ি নির্মাণের ইতিহাস।

কালোরা শুধুই খেটে মরেছে এমন কিন্তু নয়। জাহাজের খোলেও তারা বিদ্রোহ করেছে। বিদ্রোহ করে জীবন বিসর্জন দিয়ে অতলান্তের হাঙর কুমিরের খাবার হয়েছে। জীবন দিয়েছে লাখে লাখে। তবু শেকলে বাঁধা দেহ নিয়ে হার মানতে চায় নি। আজ তাদের উত্তরপুরুষরা বিক্ষোভ করছে দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাশালী দেশে।

বিশ শতকে তাদের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন মার্টিন লুথার কিং। অধিকার আদায়ের কথা বলতেন তিনি। গাইতেন মুক্তির গান, “আমার একটি স্বপ্ন আছে”। সে স্বপ্ন পূরণে অহিংস লড়াইও মেনে নেয় নি সাদা মার্কিনীরা। তাকে গুলি করে মেরেছে ১৯৬৮ সালে। কিন্তু তাঁর স্বপ্নকে সাদা মার্কিনীরা হত্যা করতে পারে নি। কালো বীর ক্যাসিয়াস ক্লে (যিনি বেশি খ্যাত চিরকালের সেরা মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী নামে) গর্জে উঠে বলেছেন, “ভিয়েতনামে মানুষ খুন করতে যাব না আমি।” যান নি। সাদা মার্কিন হুকুমতে এতবড় চড় আর কখনও মারে নি কেউ। হজম করতে বাধ্য হয়েছে সাদা আমেরিকা। আবারও কিল খেয়ে কিল হজম করতে হয়েছে আধেক কালো ওবামাকে দেশটির সাদাঘরের বাসিন্দা বানিয়ে। 

সাদা রক্তের অহংকারী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাদাঘরে ঢুকেই আমেরিকার সব দরজা বন্ধ করতে শুরু করেন। শুধু কালো নয়, ঘেন্না তার কালো, আধাকালো, বাদামী বা হলুদ সবার চামড়ার সব মানুষের প্রতি। অন্যদেরও ছিল। ওয়াশিংটন,  জেফারসন, আব্রাহাম, আইজেনহাওয়ার, নিক্সন, রিগান, ক্লিন্টন, বুশ কেউ কম ছিলেন না। মার্কিন ইতিহাসে প্রথম যে নারীর সাদাঘরের বড় চেয়ারে বসার স্বপ্ন ছিল সেই হিলারিও ব্যাতিক্রম নন। 

হিস্পানিক বা দক্ষিণ আমারিকায় অবশ্য ছবিটা একটু আলাদা। কারণ ইউরোপীয় ক্ষমতার লড়াইয়ে সাদা ইংরেজ বোম্বেটেদের কাছে হেরে গিয়েছিল হিস্পানিক হার্মাদরা। প্রথম যে এলাকায় সাদা ইউরোপের পা পড়েছিল সে ক্যারিবিয় সাগর তীরের ব্রাজিল থেকে গোটা দক্ষিণ ভূখণ্ডে হিস্পানিক আর পর্তুগিজদের আধিপত্য হল বটে; কিন্তু উত্তর ভূখণ্ডে তারা সুবিধা করতে পারে নি। তারা নতুন হিসেব কষে নেয়। কালোদের একেবারে বাইরের ঘরে ফেলে বা না রেখে তাদের শিখিয়ে পড়িয়ে নিজেদের মত করে তোলে। প্রথমে কালোরা খেতে-খামারে কাজ পেত। পরে অনেক হিস্পানিক আর পর্তুগিজের শোবার ঘরেও জায়গা পেয়ে গেল। সাদা-কালোয় বিয়ে শাদি করে তারা গন্ডা গন্ডা মোলাটো (সাদা-কালোর বর্ণসংকর) পয়দা করে এক নতুন সভ্যতা গড়ে তুলল। সে ধারা শুধু টেকসই হল তাই-ই নয়, নতুন ইতিহাস লেখা হচ্ছে এই লাতিন আমেরিকায়।

আর উত্তরের দেমাগি মার্কিন ভূমিতে এখন জ্বলে উঠছে আগুন। গত আশি বছর ধরে সাদা মার্কিনীরা তামাম দুনিয়া তামা করে বেড়াচ্ছে। এবার নিজের ঘরেই আগুন লেগেছে। হালের আগুনের শুরু মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মেনোপোলিসে এক সাবেক বাস্কেটবল তারকা কালো জর্জ লয়েডকে শ্বাসরোধ করে খুন করা নিয়ে। মেরেছে এক সাদা পুলিশ ডেরেক। কালো মানুষ মারলে সভ্য আমেরিকার সাদা মানুষদের কৈফিয়ত দিতে হয় না। যেটুকু হৈচৈ হয় তা ওই খুন হয়ে যাওয়া কালো মানুষটার দোষ খুঁজে বের করা পর্যন্তই। তারপর মার্কিন সাদারা গলা ছেড়ে কেত্তন গায়, “হে হে, বজ্জাতটাকে মেরে ফেলাই সঠিক কাজ হয়েছে। নইলে আমেরিকান গর্ব খতম করে দিত হারামিটা।” না, কালো মানুষের বিচার যে কোন সাদা নিজেই করতে পারে। দিতে পারে শাস্তিও। কোট-কাচারি লাগে না সভ্য আমেরিকায়। তাতে মানবাধিকারেরও কোন লোকসান নেই! এমন খুন হয়ে যাওয়া কালো মানুষের তালিকা করলে মহাভারত হবে। কিন্তু এবার হাওয়া গরম।

মার্কিন সভ্যতায় এ লজ্জা যত বড়ই হোক, ট্রাম্প সাহেব তাতেও খুশিতে ডগমগ। তা কালো লয়েডকে বেশ জম্পেশ করেই মেরেছেন সাদা মার্কিন পুলিশ অফিসার । হাতকড়া বাঁধা লয়েডকে হাঁটু দিয়ে ঘাঁড় চেপে ধরেছে পুলিশ কর্তা। লয়েডকে বলতে শোনা যায়, “আমি শ্বাস নিতে পারছি না।… মরে যাচ্ছি আমি।” বারবার তিনি এ কথা বলছেন। কিন্তু সাদা পুলিশকর্তা নির্বিকার। পাশে দাঁড়িয়ে আরেক সাদা মোহান্ত। আট মিনিট ৪৬ সেকেন্ডের এক ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল হতেই গর্জে উঠেছে গোটা আমেরিকা। আগুনে পুড়ল থানা। সেসব সামলাতে এই করোনাকালে ৪০ শহরে কারফিউ দিয়েও অমন বীরপুরুষ ট্রাম্প সাহেব সামাল দিতে পারছেন না কালো আগুন। আমেরিকা  জুড়ে ছড়িয়ে পড়া ক্ষোভের আগুনে সামিল এখন সাদা, বাদামি, পীত মোলাটো সব বর্ণের মানুষ। পুলিশ পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের সাথে সংহতি প্রকাশ করেছে নিউইয়র্কে।

করোনাকালে ট্রাম্প সাহেব দুনিয়ার মানুষকে ভালই মাস্তি দিলেন! কিন্তু সত্যিই সেদিন খুব দূরে নেই যেদিন ট্রাম্প সাহেবের সাদাবাড়ির বড় চেয়ারে কোন সাদা মানুষের দেখা পাওয়া হবে ভাগ্যের ব্যাপার। ট্রাম্প সাহেবরা কালের এ যাত্রাধ্বনি কি শুনতে পাচ্ছেন?

লেখক: যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান 

[email protected]

আরও পড়ুন

×