ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অর্থনীতি

বাজেটে মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ

বাজেটে মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ
×

ছবি: সংগৃহীত

মো. আকতার হোসাইন 

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১৩:০৮ | আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪:০৩

জাতীয় বাজেটের খুব বেশি সময় বাকি নেই। অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে ৫৫তম বাজেট পেশ করবেন। ইতিমধ্যেই ধারণা দিয়েছেন, এবারের বাজেটের আকার ৯ লক্ষ কোটি টাকার উপরে হবে। বিশাল বাজেটের ফলে দেশের অর্থনীতির গতি কতটা সঞ্চার হবে, সেটিই প্রশ্ন। দেশের অর্থনীতি সচল করতে না পারলে সাধারণ মানুষের আশার প্রতিফলন ঘটবে না। বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে এক স্থির অবস্থায় বিরাজমান রয়েছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ঋণাত্মক অবস্থাও পরিলক্ষিত হয়। এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক গতি সঞ্চার করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে কিনা, তা ভাববার বিষয়। তার উপর রয়েছে বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা, যার প্রভাব থেকে বাংলাদেশ নিজেকে আড়াল করতে পারবে না। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করেছে, যা একটি দুষ্টচক্রের মতো আবর্তিত হয়ে প্রায় প্রতিটি পণ্যেরই মূল্যবৃদ্ধি ঘটাবে। অপরদিকে, সরকারের এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সরকার বাধ্য হয়েই ভ্যাট বৃদ্ধি করতে পারে, যার প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের আয়ের উপর। অর্থাৎ, এটি মূল্যস্ফীতিকে আরও উস্কে দিতে পারে। সুতরাং, জাতীয় বাজেটে মূল চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা।

বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি একটি যৌক্তিক বিষয়। কিন্তু এই যৌক্তিকতা এখনো বাস্তব চিত্রের সাথে মিল পাওয়া যায়নি। কারণ তেলের পাম্পগুলোতে আজও তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন দৃশ্যমান। সরকার বলছে তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে, কিন্তু কেন যেন সাধারণ মানুষ তা বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না। মানুষের মধ্যে এক ধরনের আস্থাহীনতা কাজ করছে। 

আমাদের দেশে মূল্যবৃদ্ধিও একটি দুষ্টচক্রে আটকে যায়। যখন আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি পায়, তখন আমাদের দেশে তাৎক্ষণিকভাবে মূল্য সমন্বয় না করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের নামে বিলম্ব করা হয় বা কখনো কখনো সিন্ডিকেটকে প্রশ্রয় দিয়ে তাদের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়। বাজারে সিন্ডিকেটকারীরা মজুত শেষ করলে তখন মূল্য বৃদ্ধি করা হয়। ঠিক ওই সময় দেখা যায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য স্থিতিশীল রয়েছে বা কমে গেছে। আবার আমাদের দেশে একবার মূল্য বৃদ্ধি পেলে তা সহজে পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে না। ২০২২ সালে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলে পরিবহন খাতে ভাড়া বাড়ানো হয়। কিন্তু পরবর্তীতে জ্বালানি তেলের মূল্য কিছুটা কমলেও সেই অনুপাতে পরিবহন ভাড়া কমানো হয়নি। অথচ আবার জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবে পরিবহন ভাড়া বাড়ানো হয়েছে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উস্কে দেবে। 

দেশে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতির পেছনে বাজার সিন্ডিকেট যেমন দায়ী, তেমনি রাষ্ট্রক্ষমতায় দায়িত্বরত ব্যক্তিবর্গও এর জন্য দায়ী। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করার ফলে এর খেসারত দিতে হয় সাধারণ জনগণকে। লক্ষ কোটি টাকার বাজেটে সরকার কম করে হলেও এক লক্ষ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণের মাধ্যমে বা ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে সংগ্রহ করবে। ফলে ওই টাকা সরকারের খরচের মাধ্যমে আবার জনগণের মধ্যে ফিরে আসবে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, ব্যাংকিং খাতে প্রান্তিক পর্যায়ে বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ চরমভাবে হ্রাস পাবে বা বাধাগ্রস্ত হবে। কিন্তু বড় বড় ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে ঠিকই ঋণ পাবেন, যা দিয়ে দেশে কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। ফলে বেকারত্ব বেড়ে যাবে এবং মূল্যস্ফীতিও আরও বৃদ্ধি পাবে। ব্যাংক যদি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে বা নতুন উদ্যোক্তাদের সহজে ঋণ প্রদান করে, তবেই দেশে কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এতে বেকারত্ব কমবে এবং মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আসবে। সুতরাং উচ্চ বিলাসী বাজেট পরিহার করা উচিত। বর্তমান সরকার যদি বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় এনে একটি সংকোচনমূলক বাজেট প্রণয়ন করে, তবে তা অধিকতর যুক্তিযুক্ত হবে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন।

সরকার যেমন চাপে আছে, তেমনি খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষও বিপদে আছে। এক মাসে দুইবার এলপিজি গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম লাগামহীন। এই লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে হলে কার্যকর জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। জাতীয় বাজেটে আরেকটি চ্যালেঞ্জিং বিষয় হলো সরকারি কর্মকর্তাদের পে-স্কেল ঘোষণা বা বাস্তবায়ন। বাস্তবায়ন করলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ে পস্তাতে হবে, আর বাস্তবায়ন না করলেও বর্তমান সরকার বিপদে পড়তে পারে। সুতরাং সবকিছু মিলিয়ে জাতীয় বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ।

বিগত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের উপরে বিরাজমান থাকলেও, গত অর্থবছরে তা এক অঙ্কে নেমে আসে; তবে তা এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। বর্তমান অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা কত নির্ধারণ করা হয়, সেটাই দেখার বিষয়। সবার প্রত্যাশা, মূল্যস্ফীতি অবশ্যই সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে এবং লক্ষ্যমাত্রাও সে অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে। 

মো. আকতার হোসাইন: ব্যাংকার 

আরও পড়ুন

×