ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

স্বাস্থ্যখাত

সরকারি হাসপাতালে অব্যবস্থাপনার শেষ কোথায়

সরকারি হাসপাতালে অব্যবস্থাপনার শেষ কোথায়
×

ছবি: সমকাল

জুয়েল হাসান

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ | ১৪:১১ | আপডেট: ১০ মে ২০২৬ | ১৪:১৬

বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলো দীর্ঘদিন ধরেই দেশের সাধারণ মানুষের প্রধান চিকিৎসা নির্ভরতার কেন্দ্র। অর্থনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ মানুষদের জন্য এসব হাসপাতালই একমাত্র ভরসা। কিন্তু সরকারি হাসপাতালের সেবা নিয়ে দুর্ভোগের অন্ত নেই। প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী ভিড় জমায় সরকারি হাসপাতালের আঙিনায়। দীর্ঘ লাইন, সীমিত বেড, চিকিৎসকের স্বল্পতা, নার্সদের অতিরিক্ত চাপ—সব মিলিয়ে এক অদৃশ্য বিশৃঙ্খলা যেন প্রতিনিয়ত সেখানে কাজ করে যাচ্ছে। অনেক সময় রোগীরা সঠিক সময়ে চিকিৎসা পায় না, জরুরি সেবা পেতে বিলম্ব ঘটে, আর এই বিলম্বই কখনো কখনো জীবন-মৃত্যুর সীমারেখা নির্ধারণ করে দেয়। হাসপাতালের ভেতরের এই বাস্তবতা উন্নয়নের ঝলমলে পরিসংখ্যানের সঙ্গে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য সৃষ্টি করে।

অন্যদিকে, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদেরও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব, কর্মপরিবেশের চাপ, এবং কখনো কখনো নিরাপত্তাহীনতা—এসবই তাদের কাজের মান ও মনোবলকে প্রভাবিত করে। ফলে একটি জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যেখানে রোগী ও সেবাদাতা উভয়ই এক ধরনের অসহায়তার শিকার হয়ে পড়ে।

এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছি, নাকি উন্নয়নের বাহ্যিক রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর অব্যবস্থা? সরকারি হাসপাতালের সেবা কি সত্যিই মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারছে, নাকি দিন দিন সেই আস্থা ক্ষয়ে যাচ্ছে?
সরকারি হাসপাতালের সেবার বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করতে গেলে প্রথমেই চোখে পড়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নের এক দৃশ্যমান অগ্রগতি। গত এক দশকে বাংলাদেশে বহু নতুন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতালের সংখ্যা ও শয্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হয়েছে। এসব উন্নয়ন নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য চিকিৎসা সেবার সুযোগ আগের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত হয়েছে। এর মধ্যেও বড় প্রশ্ন থেকে যায়-এই সুবিধাগুলো কি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে? বাস্তবে দেখা যায়, অনেক হাসপাতালেই আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল নেই। কখনো যন্ত্র নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে মাসের পর মাস, আবার কখনো অপারেটর না থাকায় সেগুলো ব্যবহারই করা যায় না। ফলে উন্নয়নের এই চিত্র অনেক ক্ষেত্রে কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো রোগীর তুলনায় চিকিৎসকের স্বল্পতা। একটি সরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন যে পরিমাণ রোগী আসে, তা সামলানো অনেক সময় চিকিৎসকদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে প্রতিটি রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না, রোগ নির্ণয়ে ত্রুটি ঘটে, এবং রোগীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। এই চাপ শুধু রোগীদের জন্য নয়, চিকিৎসকদের জন্যও মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এছাড়া হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাবও একটি বড় সমস্যা। রোগী ভর্তি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ সরবরাহ-প্রতিটি ধাপেই দেখা যায় দীর্ঘসূত্রিতা ও জটিলতা। অনেক সময় রোগীদের এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে ছুটতে হয়, যা বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। এই ধরনের অভিজ্ঞতা মানুষের মনে সরকারি হাসপাতালের প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয়।

ওষুধ সরবরাহের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। যদিও সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে ওষুধ দেওয়ার কথা, বাস্তবে অনেক সময় রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে বাধ্য হতে হয়। এতে দরিদ্র মানুষের জন্য চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যায়, যা তাদের জন্য এক বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে।

তবে সবকিছুর মাঝেও একটি ইতিবাচক দিক অস্বীকার করা যায় না-এই হাসপাতালগুলোই প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছে। সীমিত সম্পদ ও নানা বাধা সত্ত্বেও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। অনেক সময় তাদের মানবিকতা ও আন্তরিকতাই রোগীদের জন্য বড় আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সরকারি হাসপাতালের চিত্র একদিকে উন্নয়নের, অন্যদিকে সীমাবদ্ধতার। এখানে যেমন সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জগুলোকে চিহ্নিত করে কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করাই এখন সময়ের দাবি। কারণ একটি কার্যকর ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা ছাড়া কোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

হাসপাতাল ঘিরে গড়ে ওঠা এক শ্রেণির দালাল চক্র ও অনিয়ম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। রোগী ভর্তি, বেড পাওয়া, দ্রুত পরীক্ষা করানো-এসব ক্ষেত্রেই অনেক সময় অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ শোনা যায়। এই প্রবণতা শুধু স্বাস্থ্যসেবার মানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং পুরো ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকেও নষ্ট করে দেয়। একজন অসহায় রোগী যখন চিকিৎসার জন্য আসে, তখন তাকে যদি এমন অনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তা নিঃসন্দেহে একটি রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক বাস্তবতা।

দুর্নীতি ও দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে স্বাস্থ্যসেবা একটি স্বচ্ছ ও ন্যায্য ব্যবস্থার মধ্যে পরিচালিত হয়। প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ-যেমন ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন, অনলাইন রিপোর্ট, টেলিমেডিসিন-এসব উদ্যোগ সেবাকে আরও সহজ ও দ্রুত করতে পারে। পাশাপাশি গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন ঘটিয়ে শহরের ওপর চাপ কমানোও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, স্বাস্থ্যসেবাকে শুধু একটি খাত হিসেবে নয়, একটি মানবিক অধিকার হিসেবে দেখতে হবে। একজন নাগরিক যখন হাসপাতালে আসে, তখন সে শুধু চিকিৎসা নয়, সম্মান ও সহানুভূতিও প্রত্যাশা করে। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারলেই একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা সত্যিকার অর্থে উন্নত বলে বিবেচিত হবে।
সরকারি হাসপাতালের করিডোরে ভেসে থাকা দীর্ঘশ্বাসকে যদি আমরা প্রশান্তির নিঃশ্বাসে রূপান্তর করতে পারি, তবেই আমাদের উন্নয়ন সার্থক হবে। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড কেবল অবকাঠামো নয়, বরং মানুষের মুখে ফিরে আসা সেই নিশ্চিন্ত হাসি-যেখানে ভরসা আছে, নিরাপত্তা আছে, আর আছে বেঁচে থাকার এক দৃঢ় প্রতিশ্রুতি।

জুয়েল হাসান: প্রকৌশলী 

আরও পড়ুন

×