দুই জার্মানির একত্রীকরণের ত্রিশ বছরে নানা কথা
দাউদ হায়দার
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২০ | ০৪:০৭ | আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০২০ | ০৫:৫৯
বার্লিন দেয়াল গাঁথা (১২-১৩ আগস্ট ১৯৬১) দেখিনি। ভাঙন (৯ নভেম্বর ১৯৮৯) দেখেছি। অংশও নিয়েছি। মনে হয়েছিল দুই বাংলার কথা। দুই বঙ্গের জল-হাওয়া এক। রঙে-ছিরি-সুরতেও হেরফের নেই তেমন, ভাষাতেও। সংস্কৃতি, শিল্পেও। মন যখন, মনের ভাবনায় কারও হস্তক্ষেপ, নিষেধাজ্ঞা নেই। বাধা দেওয়ারও কেউ নেই।
দুই জার্মানি তথা পূর্ব-পশ্চিম জার্মানির পুনর্মিলনের (৩ অক্টোবর ১৯৯০) সরকারি অনুষ্ঠানমালায় যোগ দিয়েছি ডয়েচে ভেলের বার্লিন প্রতিনিধির দায়িত্বে। প্রত্যক্ষদর্শী। ইতিহাসের সাক্ষী। সবই চোখের সামনে।
পুনর্মিলনের প্রথম পাঁচ বছরে হুলস্থুল কাণ্ড, জার্মান ভাষায় উন্গেৎস্যুগেল্ট্। অভাবনীয়, হঠাৎই নিও নাৎসির জাগরণ, বিদেশি বিদ্বেষ নয় কেবল, হত্যাও। বিদেশিকে বাড়ি ভাড়া নয়। চাকরির ক্ষেত্রেও দোনামনা। রাজনীতির চেহারাও বেখাপ্পা। দেয়াল ভেঙে, কমিউনিজম ধ্বংস করে, দুই জার্মানির একত্রীকরণেও স্বস্তি নেই। দেখা গেল, প্রেম মহরতমিলনের জার্মানিতে, জাতীয় নির্বাচনে, কমিউনিস্টরা বার্লিনসহ পূর্বাঞ্চলের (পূর্ব জার্মানির) কয়েকটি রাজ্যে বিস্তর আসনে জয়ী। সংসদে উল্লেখযোগ্য সাংসদ। পরবর্তী আরও পাঁচটি নির্বাচনেও।
প্রথম পাঁচ বছরে ব্যবসায়েও হযবরল। বিশ্বব্যাপী আমন্ত্রণ, ব্যবসায়ীরা মূলধন খাটাবেন, সাহায্য পাবেন। তৈরি করা হয় 'ট্রয়ছান্ড' নামে সংস্থা। এক মিলিয়ন ডয়েচ মার্ক ইনভেস্ট করলে ব্যবসায়ের জন্য পাঁচ থেকে দশ মিলিয়ন এককালীন সাহায্য পাবে। শর্ত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (হোক তা কলকারখানা) তৈরি এবং জার্মান কর্মী নিয়োগ।
তিনজন ভারতীয়কে জানি। একজন গুজরাটের। একজন মুম্বাইয়ের (তৎকালীন বোম্বে)। একজন দিল্লির। তাদের প্যাডে (ব্যবসায়িক) অফিসের আলিশান ছবি। ঠিকানা। দুই থেকে চারজন ডিরেক্টরস (বোর্ডে)। সবই বিশ্বাসযোগ্য। এক মিলিয়ন ডয়েচ মার্ক ইনভেস্ট করেছেন বিনা শর্তে। ব্যবসা পেতে অসুবিধা নেই। (নামধামসহ পাসপোর্টের কপিও জমা দিয়েছেন)। জার্মানরা বোধহয় জানতেন না, নামধাম, পাসপোর্ট দু'নম্বরি হয়। ওরা তো বড় অফিসও নিয়েছেন বার্লিনে। মাস ছয়েক ব্যবসায়ের নানা তৎপরতা। অতঃপর আট মিলিয়ন নিয়ে উধাও। বার্লিনস্থ ভারতীয় দূতাবাসের দ্বারস্থ হয়েও তাদের টিকি পাওয়া যায়নি।
কেবল ভারতীয় নয়, আমেরিকা, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, এশিয়ার বহু দেশের ব্যবসায়ী ঠগবাজ। সবচেয়ে বেশি ঠকিয়েছে ইহুদিরা। বাড়ি, জমিজমার ক্ষেত্রে। দাবি করেছে বার্লিনসহ জার্মানির এ রাজ্যে-ও রাজ্যে বাড়ি, জমি ছিল। ফল্স কাগজপত্র, দলিল দেখিয়ে দখল, সময়মতো বিক্রি করে লাপাত্তা। ইহুদিদের বিষয়ে জার্মানরা 'টুঁ কথা কইতে নারাজ।'
দুই জার্মানির একত্রীকরণে জার্মানি ইউরোপের বড় দেশ, অর্থে ধনী, ইউরোপে পয়লা। ক্ষমতায় দ্বিগুণ। গোটা ইউরোপ কবজাগত।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে (কমিশনে) সদস্যসংখ্যা বেশি। ইইউসির (ইউরোপীয় ইউনিয়ন কমিশন) কর্তা (প্রেসিডেন্ট) লোকবলে এবং ভোটে জার্মান। বাকি দেশগুলো (ইউরোপীয় ইউনিয়নের) অনেকটাই নতজানু। ছোট দেশগুলোকে ধমকাধমকি। শর্ত মানতে বাধ্য করা। বড় দেশও (ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স) খুব বেশি চিল্লাচিল্লি করে শেষাবধি মৌনী। যেমন, গ্রিসের অর্থনৈতিক সমস্যার সময়কালে। জার্মানির বিশাল প্যাকেজে সায় দিয়েছে, অংশীদারও ইউরোপের দুটি ধনী দেশ।
জার্মানি মার খেয়েছে সিরিয়া-লেবানন (মধ্যপ্রাচ্য-এশিয়ার-আফগানিস্তানের) উদ্বাস্তু সমস্যায়। দেড় মিলিয়ন উদ্বাস্তু হাজির। ইইউর অন্য দেশ নেয়নি। জার্মানি নিয়ে বিপদে। এখন, চাপে পড়ে বিতাড়ন। পঞ্চাশ হাজারও নয়। উদ্বাস্তুর কারণেই জার্মানির রাজনীতি বিতিকিচ্ছিরি।
নিও নাৎসিরা মুখর, নিউ নাৎসির বাড়ন্ত। চরম দক্ষিণপন্থি এএফডি (অলটারনেটিভ ফ্যুর ডয়েচলান্ড) দল শনৈ শনৈ কালকেতু, রাজ্যে ও পার্লামেন্টেও (সংসদে) ঠাঁই। শতাব্দীপ্রাচীন দল এসপিডি (সোশ্যাল পার্টি ফর ডেমোক্রেটিক) প্রায় তলানিতে। সবুজ দলের (গ্রিন পার্টি) উত্থান। দেখছি, জার্মানির অর্থনীতির মূল কেন্দ্রে পশ্চিমই (পশ্চিম জার্মান)। গত ত্রিশ বছরে। পূর্বাঞ্চলে (পূর্ব জার্মানি) বড় কোনো শিল্প গড়ে ওঠেনি। না কলকারখানার, না গাড়ির। শিল্পমালিকদের যুক্তি অমান্য। কেন গড়বে? 'সব প্রডাক্ট কয়েক ঘণ্টায় স্থানান্তরিত।' দেখা যাচ্ছে, এই ব্যবস্থাপনায় পূর্বাঞ্চলে বেকারত্ব, কাজ নেই, চাকরি নেই। সংখ্যা দশগুণ। পশ্চিমে এসেও কাজ পাচ্ছে না পূর্বাঞ্চলের অনেকেই। দুই জার্মানির ফলাফল কী তবে? হতাশা ছাড়া আর কী? পূর্ব জার্মানির অনেকেই বলছেন, কমিউনিস্ট আমলে কি মন্দ ছিলাম? না। দুই জার্মানি এক হলেও মনমানসিকতায় এখনও বিভাজন ত্রিশ বছরেও।
- বিষয় :
- চতুরঙ্গ
- দাউদ হায়দার
- বার্লিন
