ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

বিশ্ব মাস্ক ও করোনা দিবসের প্রস্তাব

বিশ্ব মাস্ক ও করোনা দিবসের প্রস্তাব
×

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার

প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০২০ | ০৩:৫১

২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহান শহরে করোনাভাইরাসের একটি প্রজাতির সংক্রমণ দেখা দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ ভাইরাসকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কভিড-১৯ নামকরণ করে। ভাইরাসটির ভয়াবহতা ও তীব্রতা এত ব্যাপক যে, প্রতিদিন লাখ লাখ আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি মারাও যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনার প্রথম ধাক্কার পর এখন দ্বিতীয় ধাক্কা চলছে, যা প্রথমটির চেয়ে ভয়াবহ। এ ধাক্কায় বয়স্ক ও যুবক তো বটেই; শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে মারাত্মকভাবে।

সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বিশ্বের ২১৭টিরও বেশি দেশ ও অধীনস্থ অঞ্চলে ১৭ কোটি ৯২ লাখেরও বেশি ব্যক্তি এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের। এ রোগ থেকে রেহাই পেতে প্রতিষেধক ভ্যাকসিন তৈরির ওপর গবেষণা চলছে বিশ্বব্যাপী। রাশিয়া, চীন, অপফোর্ড, আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা ভ্যাকসিন আবিস্কারের খবর মাঝেমধ্যেই দিয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ফাইজার-বায়োএনটেক, মডার্না, অপফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, স্পুটনিক-ফাইভ ইত্যাদির সাফল্য অনেকটা প্রতীয়মান। ভ্যাকসিনের প্রয়োগ চলছে এবং পরীক্ষাও শেষ হয়েছে কোথাও কোথাও। সংক্রমণ আটকাতে ভ্যাকসিনই যে একমাত্র পথ- তাও বিশ্বের কাছে স্পষ্ট। কিন্তু সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় ভ্যাকসিন পেতে হয়তো আরও সময় লাগবে। যদিও ডিসেম্বরের মধ্যেই উন্নত দেশগুলো ভ্যাকসিন বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। দামও ৩-৪ ডলার থেকে ৩০-৪০ ডলার পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে।

বাংলাদেশ সরকার প্রাথমিকভাবে প্রায় দেড় কোটি ভ্যাকসিনের বুকিং দিয়েছে বলে জানা গেছে। পরে তিন কোটি মানুষকে বিনামূল্যে এই ভ্যাকসিন দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। অবশ্য গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী সবার জন্যই বিনামূল্যে ভ্যাকসিন দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সরকারকে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইনাস ৭০-৮০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে ভ্যাকসিনটি রাখার মতো সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই এবং এ জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। তবুও সবকিছু ঠিক থাকলে প্রথমদিকে সাধারণ মানুষের ভাগ্যে এসব টিকা পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, আমলা, সেনাবাহিনী, সাংবাদিক, পুলিশ, ডাক্তার, ব্যবসায়ীদের চাহিদা মিটিয়ে আসতে আসতে সব ভ্যাকসিন শেষ হয়ে যাবে। তা ছাড়া আছে অসাধু ব্যবসায়ীদের অধিক মুনাফা লাভের প্রবণতা। তাই ভ্যাকসিনের আশায় না থেকে মাস্ক পরিধান করে আপাতত রক্ষা পাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজন এ ভাইরাসে আক্রান্ত। বাংলাদেশে শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৭৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং মৃত্যুহার ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। শনাক্তের দিক থেকে পঞ্চদশ আর মৃতের সংখ্যায় বাংলাদেশ রয়েছে ২৯তম অবস্থানে। এমতাবস্থায়, গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত বিকল্প হিসেবে সঠিকভাবে মাস্ক পরিধান করে এ সংক্রমণ থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ পৃথিবীর সব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সঠিকভাবে মাস্ক পরিধান ছাড়াও হ্যান্ডগ্লাভস ব্যবহার করা, বারবার হাত ধোয়া এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলাসহ বেশ কিছু পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন শুরু থেকেই। সাধারণ মানুষও এ আহ্বানে যথেষ্ট সাড়া দিয়েছিল বটে। যদিও মহামারি শুরুর দিকে এসব পণ্যের দাম খুব চড়া ও ভেজালে পরিপূর্ণ ছিল, তবু করোনাভাইরাস ঠেকাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হিড়িক পড়েছিল মাস্ক কেনার। সরবরাহে হিমশিম খাওয়ায় বাড়তি কর্মী নিয়োগ করতে বাধ্য হয়েছিল বিশ্বের অনেক মাস্ক উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। কোনো কোনো দেশে দেখা দিয়েছিল মাস্ক সংকট। তবে শুধু মাস্ক ব্যবহারই ভাইরাস ঠেকাতে যথেষ্ট নয় বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

বায়ুর পাশাপাশি মানুষের হাঁচি-কাশি, হ্যান্ডশেক কিংবা স্পর্শ থেকেও এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। যেহেতু করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার প্রধান লক্ষণগুলোই হলো- শ্বাসকষ্ট, জ্বর, কাশি, নিউমোনিয়া ইত্যাদি। ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার প্রধান উপায় হলো শ্বাসনালী থেকে বেরিয়ে আসা ক্ষুদ্র জলকণা (ড্রপলেট), যা মানুষ কথা বলা, গান গাওয়া, কাশি বা হাঁচি দেওয়ার সময় তরল বিন্দুর মতো বেরিয়ে আসে। আর একজন করোনা আক্রান্তের ড্রপলেটেই থাকে ভাইরাস, যেগুলো বাতাসে ৩-৪ ঘণ্টা ভেসে থাকতে সক্ষম। সেই ড্রপলেট কোনো সুস্থ ব্যক্তির নাক, মুখ, চোখ হয়ে শরীরে প্রবেশ করলেই সুস্থ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়। সে জন্য প্রথম থেকে যে বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছিল, সেই মাস্কই পারে এই মাইক্রো-ড্রপলেট বন্ধ এবং ভাইরাসের বিপদ থেকে প্রাথমিকভাবে রক্ষা করতে।

করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে অন্যান্য দেশও গবেষণা করছে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এ ভ্যাকসিন সবার জন্যই উন্মুক্ত হবে স্বল্পমূল্যে। কলেরার ভ্যাকসিনের কথা আমরা অনেক শুনেছি। অনেক গবেষণা হয়েছিল। অনেক ভ্যাকসিনও বাজারে এসেছিল। শেষ পর্যন্ত কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য সমাধান মিলেছে 'ওরস্যালাইন' সেবনে, যা এখন ঘরে বসে যে কেউ তৈরি করতে পারে। আর ফার্মেসি থেকে শুরু করে যে কোনো ছোট দোকানে তা পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫ টাকায়। চিন্তা করা যায় কি, এ রকম একটি মহামারির ওষুধ এত সস্তা ও সহজলভ্য হবে? করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যও এর চেয়ে সহজ সমাধান আসবে, তাতে সন্দেহ নেই। সে কাল পর্যন্ত অপেক্ষায় না থেকে সঠিকভাবে মাস্ক পরিধানের অভ্যাস গড়ে তুলে নিজে করোনামুক্ত থাকি, অপরকে করোনামুক্ত থাকতে সহায়তা করি; নিজ দেশ ও বিশ্বকে করোনামুক্ত করতে অবদান রাখি।

মাস্ক পরিধানে সরকারও প্রচার চালাচ্ছে। 'নো মাস্ক নো সার্ভিস' প্রজ্ঞাপন জারি করেছে; ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে মনিটরিং করছে, মাস্ক না পরলে জরিমানাও করছে। তবে শুধু সরকারের এই প্রচারের ওপর নির্ভর করলে চলবে না; আমাদেরও সতর্ক হতে হবে। মসজিদ, মন্দির, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান, জনসমাবেশ, গাড়ি কিংবা রিকশায় আরোহণ, হাট-বাজার-দোকানে প্রবেশ ইত্যাদি ক্ষেত্রে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক বলে সামাজিক প্রচার চালাতে হবে। অর্থাৎ আমাদের দৈনন্দিন কাজের মতোই মাস্ক পরিধান করা একটি অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। পাশাপাশি যেখানে সেখানে থুতু না ফেলা, প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়া, হাসি-তামাশা কিংবা কথা কম বলা, কাশি বা হাঁচি প্রতিরোধ করা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, বারবার হাত ধোয়া, ব্যায়াম করা, বায়ু চলাচল স্বাভাবিক রাখায় খেয়াল রাখতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও প্রচার চালানো যেতে পারে। বর্তমানে সর্বত্র অনলাইনে ক্লাস হচ্ছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিকসহ সর্বস্তরে মাস্ক ব্যবহারে প্রথম পাঁচ মিনিট আলোচনা করা যেতে পারে। এমনকি প্রাথমিক পাঠ্যসূচিতে মাস্ক ব্যবহারবিধি অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা, ব্যাপকতা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিক্ষা ব্যবস্থা, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, সমাজনীতি- সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে এই করোনা। এমতাবস্থায় মাস্ককেই করোনা থেকে বাঁচার অন্যতম এবং অপরিহার্য অনুষঙ্গ মনে করা যেতে পারে। তাই সাধারণ মানুষের মধ্যে মাস্কের সঠিক ব্যবহার ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবং বিশ্বব্যাপী সর্বজনীন মাস্কিং নীতি গ্রহণপূর্বক ৩১ ডিসেম্বরকে 'বিশ্ব মাস্ক ও করোনা দিবস' হিসেবে পালন করার প্রস্তাব রাখছি। মুজিব শতবর্ষে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ থেকেই এ প্রস্তাবটি পৌঁছে যাক বিশ্বনেতৃবৃন্দের কাছে।



আরও পড়ুন

×