ফিনল্যান্ড- একটি সমাজকল্যাণমূলক রাষ্ট্র
ড. কাজী ছাইদুল হালিম
প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ০৪:২১
বলুন তো কেমন লাগবে এমন যদি হয় কখনও যে আপনার কাজ নেই, আপনি বেকার, অন্ন ও বস্ত্র কেনার জন্য পকেটে টাকা নেই, বাসা ভাড়া দিতে পারছেন না, কিনতে পারছেন না জীবন রক্ষাকারী অতি প্রয়োজনীয় ওষুধ, পাঠাতে পারছেন না আপনার সন্তানকে স্কুলে! অবশ্যই দিশাহারা হওয়ার মতো অবস্থা তাই না! এমন অবস্থায় অন্যের কাছে হাত পাতা ছাড়া আপনার আর কিইবা থাকতে পারে! না, এমনটি হবে না, আপনি যদি ফিনল্যান্ডে বসবাস করেন। ফিনল্যান্ডের একজন নাগরিক হিসেবে অথবা এখানে যদি আপনার স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি থাকে। কারণ, ফিনল্যান্ড একটি উদার সমাজকল্যাণমূলক রাষ্ট্র। উদার সমাজকল্যাণমূলক রাষ্ট্রে সম্পদের ন্যায়সংগত বণ্টন ব্যবস্থা খুবই শক্তিশালী। কীভাবে সম্পদের এই ন্যায়সংগত বণ্টন ব্যবস্থা নিশ্চিত হয় তা ফিনল্যান্ডের আলোকে আলোচিত হবে।
যে কারণগুলো ফিনল্যান্ডকে উদার সমাজকল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পেছনে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রেখেছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে স্ক্যানডিনেভিয়ান (নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড এবং ডেনমার্ক) সামাজিক সমতাবাদের দর্শন। একটা খুব ছোট জাতি হিসেবে ঐক্যবদ্ধভাবে টিকে থাকার সংগ্রাম, সুষম জাতীয় উন্নয়ন, শীতপ্রধান আবহাওয়া এবং রাশিয়ার মতো একটা পরাশক্তির পাশে বসবাস। এছাড়াও রয়েছে অর্থশাস্ত্রীয় কারণ। অর্থনীতির সূত্র মতে ধনীদের প্রান্তিক ভোগ প্রবণতা খুবই কম। ধনীদের প্রান্তিক ভোগ প্রবণতা খুব কম বলতে বোঝায় যে, ধনীরা যখন বেশি আয় করে তখন তারা তাদের সেই বর্ধিত আয় থেকে খুব কম অর্থ ভোগের পেছনে খরচ করে, বেশিরভাগই জমা করে। তাই ধনীদের বর্ধিত আয়ের ওপর প্রগতিশীল হারে করারোপ করে সেই করের অর্থ সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করলে বা অভাবীদের মাঝে বণ্টন করা হলে অর্থনীতিতে খরচ বাড়বে, অর্থনীতির গতিশীলতা আসবে এবং অধিক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। কারণ, অভাবীদের প্রান্তিক ভোগ প্রবণতা খুব বেশি। অভাবীরা বা অল্প আয়ের মানুষেরা তাদের বর্ধিত আয়ের প্রায় সম্পূর্ণটাই খরচ করে। এর কারণ হচ্ছে, তাদের অনেক প্রান্তিক ভোগ সাধারণ অবস্থায় অসম্পূর্ণ থাকে।
বর্তমান বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রই কম-বেশি সমাজকল্যাণমূলক। সমাজকল্যাণমূলক রাষ্ট্র বলতে আমরা এমন এক ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে বোঝাই, যেখানে সরকার নাগরিকের অর্থনৈতিক প্রয়োজনে তার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় এবং অনেক সময় প্রয়োজনীয় সেবা ও দ্রব্যাদি বিনামূল্যে প্রদান করে। এদিক থেকে বিচার করলে বাংলাদেশও একটি সমাজকল্যাণমূলক রাষ্ট্র। তবে এখনও বাংলাদেশকে আমরা একটা উদার জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারব না। অপরদিকে এই ফিনল্যান্ড একটি উদার সমাজকল্যাণমূলক রাষ্ট্র। এখন দেখার বিষয় যে, ফিনল্যান্ড কীভাবে তার সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনায় অর্থের জোগান দেয় এবং এই উদার সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম কীভাবে ফিনল্যান্ড এবং ফিনিশ জাতিকে উপকৃত করেছে।
উদার সমাজকল্যাণমূলক রাষ্ট্রে যেমন ফিনল্যান্ডে সরকার জনগণের প্রয়োজনে তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়, পূরণ করে বেকার এবং অভাবী জনগণের জীবনধারণের মৌলিক চাহিদা- অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং শিক্ষা। এ জন্যেই ফিনল্যান্ডে চরম দরিদ্রতা নেই। তবে এখানেও দরিদ্রতা আছে আর তা হলো আপেক্ষিক দরিদ্রতা। সমাজে অন্যদের চেয়ে আপেক্ষিকভাবে দরিদ্র তারাই যারা সাধারণত সরকারি সহযোগিতায় জীবন ধারণ করে। সরকারি সহযোগিতায় জীবন ধারণ করলেও তাদের জীবনযাত্রার মান বেশ উঁচু। কারণ, ফিনল্যান্ডে জীবনযাত্রার নূ্যনতম মান সরকার দ্বারা নির্ধারিত; যেমন একজন বেকার ব্যক্তি প্রতি মাসে বাসাভাড়া পায় সরকার থেকে আর ৬০০ ইউরোর মতো বেকার ভাতা পায়। এর পরেও আবার আছে বিনামূল্যে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা। এভাবে উদার সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম ফিনিশদের দিয়েছে ভালোভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা এবং জাতি হিসেবে উন্নতি করার আত্মবিশ্বাস। আপনি সমাজের যে কোনো সাফল্যের স্বপ্ন দেখতে পারেন।
এখন স্বাভাবিকভাবে একটা প্রশ্ন জাগতে পারে, জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে সরকার এত টাকা পায় কোথায়? উত্তরটা খুবই স্বাভাবিক। বিভিন্ন উৎস থেকে আহরিত করের ন্যায়সংগত বণ্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে। এভাবে ফিনল্যান্ডে অর্থনৈতিকভাবে কাউকে কখনও সমাজের খুব ওপরে উঠতে দেওয়া হয়না। আবার কাউকে কখনও সমাজের খুব নিচেও নামতে দেওয়া হয় না। সুষম প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্র তৈরিতে ফিনিশ রাষ্ট্র ব্যবস্থা সর্বদা ক্রিয়াশীল ও সফল এবং এর মূলে রয়েছে সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম। এ জন্যই ফিনল্যান্ডকে বলা হয়ে থাকে বিশ্বের আইনের শাসনের দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম একটা।
সমাজের খুব ওপরে উঠা কিংবা খুব নিচে নামার মধ্যে ভারসাম্য করা হয় মূলত প্রগতিশীল আয়করের মাধ্যমে। তার মানে আপনি যত বেশি আয় করবেন, তত বেশি কর প্রদান করবেন। সেটা চাকরি থেকে আয় বা বিনিয়োগ থেকে লাভ যাই হোক না কেন। উচ্চ আয়করের পর আবার দিতে হবে মূল্য সংযোজন কর। এ দুটো ছাড়াও উত্তরাধিকার কর তো আছেই। অনেককে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে উত্তরাধিকারের মাধ্যমে প্রাপ্ত সম্পদের কর পরিশোধ করতে হয়। এছাড়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশের ওপরও আছে উচ্চ হারে করপোরেশন কর।
উল্লিখিত উৎসগুলো থেকে অর্জিত কর অর্থ দিয়ে সরকার হরেক রকম ভাতা, ভর্তুকি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা করে থাকে। যেমন- শিক্ষার্থীদের অধ্যয়নভাতা, জন্ম থেকে শুরু করে সতেরো বছর বয়স পর্যন্ত সবাইকে শিশুভাতা, নিজ সন্তানকে লালনপালনের জন্য মাতৃত্ব ভাতা, কাজ না থাকলে বেকার ভাতা, আবাসন ভর্তুকি, ওষুধ কেনায় ভর্তুকি, বেসরকারি চিকিৎসক দেখানোয় ভর্তুকি, বিনা পয়সায় বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ এবং সবার জন্য টিউশন ফিমুক্ত শিক্ষা। এভাবেই ফিনিশ সামাজিক জীবন হরেক রকম কর, ভাতা, ভর্তুকি এবং সরকারি সহযোগিতায় ভরা। এতো সুন্দর সমাজকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে ফিনিশদের যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে, তা হলো তাদের সততা। দুর্নীতিমুক্ত ফিনিশ রাষ্ট্রের মূলেই রয়েছে তাদের সততা। এ জন্যই ফিনল্যান্ড সব সময় দুর্নীতিমুক্ত দেশের তালিকার শীর্ষে অবস্থান করে। বর্তমানে এর অবস্থান তিন নম্বরে। কর আহরণ এবং তা জনগণের মাঝে ভাতা, ভর্তুকি এবং সরকারি সহযোগিতা হিসেবে বণ্টনে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের কোনো বিকল্প নেই।
ফিনিশরা যদিও দৈনন্দিন কথাবার্তায় অনেক সময় উচ্চ আয়করের ব্যাপারে একে অপরের কাছে অভিযোগ করে থাকে। তবুও তারা সব সময় আন্তরিকভাবে কর আইন মেনে চলে এবং নিয়মিত কর প্রদান করে। কখনও কখনও ব্যক্তিগত পর্যায়ে এবং মাঝেমধ্যে দুই-একটা করপোরেশন কর ফাঁকি দেওয়ার ঘটনা ও তার বিরুদ্ধে নেওয়া আইনগত ব্যবস্থার কথা শোনা যায়। যেহেতু ফিনিশ রাষ্ট্রের সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম কর দ্বারা অর্জিত অর্থে পরিচালিত হয়। তাই ফিনল্যান্ডে প্রতিটি কর ফাঁকির ঘটনা গুরুত্ব সহকারে দেখা হয় এবং দোষী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হয়। ট্যাপের বা করের ফিনিশ শব্দ হচ্ছে ভেরো। প্রতিটি শহরে ট্যাপ অফিস আছে, আর এই ট্যাপ অফিসই হচ্ছে সবচেয়ে পরিচিত অফিস সবার কাছে। ফিনল্যান্ডে যে কোনো চাকরি বা ব্যবসা শুরু করতে হলে প্রথমেই আপনার যা লাগবে তা হলো ট্যাপ কার্ড। বছর শেষে আবার আপনাকে ফিরে যেতে হবে ট্যাপ অফিসে রিটার্ন জমা দিতে। ফিনল্যান্ডের ট্যাপ ব্যবস্থার একটা উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, আপনি যদি বর্তমান বছরে সরকারকে বেশি ট্যাপ দেন তাহলে তা আগামী বছরে ফেরত পাবেন। আবার যদি আপনি বর্তমান বছরে কম ট্যাপ দেন তাহলে আগামী বছরে তা আবার পূরণ করে দিতে হবে।
ফিনিশরা ভীষণভাবে দেশপ্রেমিক। দেশের প্রতিটি জিনিসকে তারা নিজের জিনিস মনে করে। এর অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম একটা কারণ হচ্ছে, প্রতিটি ফিনিশ নাগরিক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর দেওয়ার মাধ্যমে দেশ গঠনে অংশগ্রহণ করে। কর দেওয়াকে ফিনিশরা দেশের প্রতি ভালোবাসার অংশ হিসেবে দেখে। তাদের কর আহরণ এবং তদারকি ব্যবস্থাটা এমন যে কর ফাঁকি দেওয়া বেশ কষ্টকর। ফাঁকি দিয়ে ধরা পড়লে শাস্তিও বেশ কঠিন। বাংলাদেশের কর আহরণ এবং তদারকি ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করা উচিত, যাতে কেউ কর ফাঁকি দিতে না পারে। সবাই নিয়মিত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর প্রদান করলে, দেশের প্রতি সবার ভালোবাসাও বাড়বে। আহরিত করের সুসম বণ্টনও নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে মানুষ কর দিতেও উৎসাহিত হবে। এভাবে বাংলাদেশও একদিন হতে পারে একটা উদার সমাজকল্যাণমূলক রাষ্ট্র। বাংলাদেশে থাকবে না তখন কোনো চরম দারিদ্র্য, এভাবে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে, আমরা এগিয়ে যাব। বাংলাদেশ দাঁড়াবে উন্নত দেশের কাতারে।
- বিষয় :
- চতুরঙ্গ
- ড. কাজী ছাইদুল হালিম