ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুদ্ধবন্দী শৈশব (পর্ব- ৩)

যুদ্ধবন্দী শৈশব (পর্ব- ৩)
×

সুরাইয়া পারভীন

সুরাইয়া পারভীন

প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ | ০২:১৮

অবশেষে এলো সেই দিন। আগে থেকে ক্যাম্পে অপেক্ষারত কোচে এসে উঠে বসলেন সবাই। আনুমানিক দুইশ' বাঙালি। সকাল ১১টায় অনিশ্চয়তার পথে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। সারাদিন গাড়ি চললো বিরতিহীনভাবে এবং বিকেল ৫টার দিকে বিশাল এক মাঠে এসে থামলো বাস। সেই মাঠেই সবাইকে নামিয়ে দেওয়া হলো। এ সময় এয়ারম্যানদের ডেকে নেওয়া হয় রোল কলের জন্য। ঘণ্টাখানেক পর তারা ফিরে আসেন। তারা তথ্য নিয়ে এলেন- পাশেই রেলস্টেশন এবং আমাদের জন্য বিশেষ ট্রেন অপেক্ষা করছে। আমরা ট্রেনের কাছে গিয়ে দেখি আনুমানিক দুইশ' মানুষ ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন ট্রেনটি এমনভাবে সাজানো আছে যে, ট্রেনের একটি ছোট বগির পরই একটি বড় প্যাসেঞ্জার বগি। ছোট বগিগুলো গার্ডদের জন্য এবং বড় বগিগুলো প্যাসেঞ্জারদের জন্য। প্যাসেঞ্জার বগিগুলোতে এয়ারম্যানদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা অনুযায়ী জায়গা বরাদ্দ করে, সবার নামে ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হয়।

সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে আমাদের ট্রেনে তোলা হলো৷ সন্ধ্যার পর ট্রেনটি চলতে শুরু করে। ট্রেন চলছে তো চলছেই, আমার বেশ ভালোই লাগছিল, কিছুক্ষণের জন্য হলেও মুক্তির আনন্দ। তৃতীয় দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখি ট্রেন থেমে আছে৷ আব্বা বললেন, আমরা পৌঁছে গেছি। গার্ডের কাছ থেকে জানা গেল, আমাদের পাঞ্জাবে আনা হয়েছে৷ সকাল ১০টা বা ১১টার দিকে প্রথমে এয়ারম্যানদের নামিয়ে রোল কল করা হয়। এরপর আমাদের সবাইকে নামানো হয়।  জনবসতিশূন্য বিশাল প্রান্তর। বালিযুক্ত মরুভূমি, মাঝে মাঝে কাটাযুক্ত গুল্ম গাছ, মরুভূমিতে যেমন হয়। কোথাও ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে না, জনমানব শূন্য। আমরা ভাবলাম- এই কি তবে আমাদের নতুন ঠিকানা? কোথাও কোনো তাবুও দেখা যাচ্ছে না। তবে কি খোলা প্রান্তরে মরার জন্য এভাবে ফেলে রাখা হবে আমাদের- এমন আতঙ্ক ঘিরে ধরলো সবাইকে।

পরে বাবা এসে জানান, এটা নয়, আমাদের গন্তব্য আরও দূরে। আবার কোচে ওঠানো হল আমাদের। এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর মনে হলো- গাড়িগুলো কোনো একটা ক্যাম্পের ভেতরে গিয়ে ঢুকলো। পরে জানা যায়, এটি ছিল বুলান্দহীল ক্যাম্প। আমাদের যেখানে নামানো হয় তার সামনেই ছিল আকাশছোঁয়া বিশাল পানির ট্যাংক, পাশেই বিশাল আকৃতির পানির ফোয়ারা। যদিও তখন সেটা নষ্ট ছিল। এয়ারম্যানদের আবার রোল কলের জন্য ডেকে নেওয়া হয়। মাথার ওপর প্রচণ্ড রোদ। কেউ চাদর দিয়ে, কেউ বা শাড়ি দিয়ে ছাউনির মতো কিছু একটা বানালেন। কেউ কেউ আশে-পাশের ইট-লাকড়ি কুড়িয়ে, ট্যাংক থেকে পানি এনে চালে-ডালে খিচুড়ি চড়িয়ে দিলেন। রান্না শেষ না হতেই বাবাসহ এয়ারম্যানরা ফিরে এলেন। জানালেন, এই ক্যাম্পেই আমাদের থাকতে হবে। সবাই ভীষণ খুশি। অন্তত পানিহীন, বিদ্যুৎহীন তাবুতে থাকতে হচ্ছে না, পাকা ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে।

পাঞ্জাবের এই বুলান্দহীল ক্যাম্পেই শুরু হয় আমাদের নতুন জীবন। ক্যাম্পটির অবস্থান করাচি থেকে ৬০০ মাইল দূরে এবং সারগোদা থেকে ২০ মাইল দক্ষিণে। জানা যায়, ক্যাম্পটি এক সময় কানাডীয় এক কন্সট্রাকশন কোম্পানির ছিল। তারা এখানে থেকে পুরো সারগোদা নির্মাণ করেছিল। তারা চলে যাওয়ার পর এই ক্যাম্পে আর কোনো জনবসতি ছিল না বহু বছর। আবার অনেকের মতে, এটি ব্রিটিশদের চলে যাওয়ার পর থেকেই জনমানব শূন্য রয়েছে। সেই পরিত্যক্ত ক্যাম্পেই কোরঙ্গী ক্রীকের বাঙালিদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়৷ চরিদিকে কাঁটা তারের বেড়া এবং কিছুদূর পর পর বন্দুক নিয়ে পাহারারত গার্ড।

[ চলবে ]

আরও পড়ুন

×