ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকাল এক্সপ্লেইনার

হান্টাভাইরাস কী, কীভাবে ছড়ায়, কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

হান্টাভাইরাস কী, কীভাবে ছড়ায়, কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
×

প্রতীকী ছবি

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ | ১৪:০৭ | আপডেট: ০৭ মে ২০২৬ | ২৩:০২

হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত একটি প্রমোদতরী এখন ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর পথে। ‘এমভি হন্ডিয়াস’ নামের জাহাজটিতে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। জাহাজটির তিনজন যাত্রীর শরীরে এই ভাইরাস নিশ্চিত হয়েছে যাদের মধ্যে একজন মারা গেছেন। পাঁচজন এ রোগে আক্রান্ত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে ২৩টি দেশের ১৪৬ জন যাত্রী ও নাবিক এখনও এমভি হন্ডিয়াসে অবস্থান করছেন। জাহাজটি ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে পৌঁছানোর পর সবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে। তারপরই তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরার অনুমতি দেওয়া হবে। 

হান্টাভাইরাস কী?

হান্টাভাইরাস, যা দক্ষিণ কোরিয়ার একটি নদীর নামে নামকরণ করা হয়েছে। এটি হচ্ছে একগুচ্ছ ভাইরাসের সমষ্টি, যা সাধারণত ইঁদুর বা এ জাতীয় ক্ষুদ্র প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) মতে, ২০টিরও বেশি ভিন্ন ভাইরাস প্রজাতি রয়েছে, যেগুলোর প্রায় সবই ইঁদুরজাত প্রাণী- বিশেষ করে ইঁদুর ও ইঁদুরজাত প্রাণীর সংক্রমণের সঙ্গে যুক্ত। এটি শুকনো প্রস্রাব ও মলের মাধ্যমে ছড়ায়।

বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর আনুমানিক ১০ হাজার থেকে এক লাখ মানুষ হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত হন, যার মধ্যে এশিয়া ও ইউরোপে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এর একটি ধরন, যাকে ‘আন্দেস ভাইরাস’ বলা হয়, এটি খুব বিরল হলেও মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর কমিউনিকেবল ডিজিজেস’-এর তথ্য অনুসারে, ওই জাহাজ থেকে নামা দুই ব্যক্তির দেহে ‘আন্দেস ভাইরাস’-এর উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।

‘আন্দেস ভাইরাস’ মূলত আর্জেন্টিনা ও চিলিতে পাওয়া যায়। ২০১৮ সালের শেষ দিকে আর্জেন্টিনায় একটি পার্টিতে একজন হান্টাভাইরাস সংক্রমিত ব্যক্তি থেকে ৩৪ জন এ রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন যাদের মধ্যে ১১ জন মারা যান। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ধারণা করছে, ভাইরাসটি জাহাজে খুব ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে, ইঁদুরজাত সংস্পর্শের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। এখন অ্যান্ডেস ভাইরাস নিশ্চিত হওয়ায় জাহাজে থাকা যাত্রী ও নাবিকদের জন্য কোভিড সময়ের মতো সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হয়েছে। যাত্রীরা বর্তমানে সংক্রমণ সীমিত রাখতে তাদের কেবিনে বন্দি আছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগীদের আলাদা করে রাখা, নিয়মিত হাত ধোয়া, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণ এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হান্টাভাইরাস কীভাবে ছড়ায়?

এটি সাধারণত ছড়ায় যখন মানুষ ইঁদুরজাত প্রাণীর মল, প্রস্রাব ও লালার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসে। সরাসরি স্পর্শ ছাড়াও কেবল আক্রান্ত প্রাণীর বর্জ্য মিশ্রিত ধূলিকণা বা বাতাস ফুসফুসে প্রবেশের মাধ্যমে এ রোগের বিস্তার ঘটে।

ইঁদুরের কামড়ের মাধ্যমেও হান্টাভাইরাস সংক্রমণ হতে পারে। তবে এমনটা সচরাচর ঘটে না। সাধারণত এমন সব কাজ, যা ইঁদুরের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি বাড়ায়, যেমন বদ্ধ বা পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নেই এমন ঘর পরিষ্কার করা, কৃষিকাজ, বনায়নের কাজ বা ইঁদুর উপদ্রুত স্থানে বসবাস বা ঘুমানোর মতো বিষয়গুলো মানুষের এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

লক্ষণ 

ভাইরাসটি দুটি গুরুতর রোগ সৃষ্টি করতে পারে। প্রথমটি হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম (এইচপিএস), যা শুরু হয় ক্লান্তি, জ্বর ও পেশির ব্যথা দিয়ে, পরে মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, ঠান্ডা লাগা ও পেটের সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে এবং তখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন হয়। অ্যান্ডেস ধরনের এই রোগটি ২০-৪০ শতাংশ মৃত্যুহারের সঙ্গে যুক্ত। ইনকিউবেশন পিরিয়ড ১ থেকে ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত হতে পারে।

দ্বিতীয় রোগটি হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম (এইচএফআরএস), যা ফ্লুর মতো শুরু হয়ে কিডনি বিকল, নিম্ন রক্তচাপ এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারে।

প্রাদুর্ভাব কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অস্কারজয়ী অভিনেতা জিন হ্যাকম্যানের স্ত্রী বেটসি আরাকাওয়া হান্টাভাইরাসজনিত শ্বাসকষ্টে মারা যান। তার বাড়ির পাশে ইঁদুরের বাসা ও মৃত ইঁদুর পাওয়া গিয়েছিল।

বিশেষজ্ঞরা জানান, বিশ্বব্যাপী হান্টাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি খুবই কম। এখন পর্যন্ত জাহাজের বাইরে ছড়ানোর কোনো প্রমাণ নেই।

অন্যদিকে বিশেষজ্ঞ হিউসন বলেছেন, প্রমোদতরিতে এই সংক্রমণ পাওয়া গেছে বলেই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, ‘একই জাহাজের একাধিক ব্যক্তি আক্রান্ত হওয়ার মানে এই নয় যে, তারা জাহাজের ভেতরেই সংক্রমিত হয়েছেন। তারা জাহাজে ওঠার আগে, যাত্রাপথে কোনো দ্বীপে নামার সময় বা পরিবেশগত অন্য কোনো কারণেও আক্রান্ত হতে পারেন। ঠিক এ কারণেই জনস্বাস্থ্য তদন্ত, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং করা জরুরি।’

জাহাজে হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটল কীভাবে?

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও মহামারি বিশেষজ্ঞ ড. শার্লট হ্যামার বলেছেন, এর একাধিক সম্ভাব্য পরিস্থিতি রয়েছে। ইঁদুর জাতীয় প্রাণীর জাহাজে চড়ে আসাটা একেবারে অস্বাভাবিক নয়, যা একটি সম্ভাবনা হতে পারে।
 
হ্যামার আরও বলেন, যেহেতু এই রোগের সুপ্তিকাল এক থেকে আট সপ্তাহ, তাই এটাও সম্ভব যে, জাহাজটি শেষবার আর্জেন্টিনার বন্দরে ভেড়ার সময় মানুষ সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারে। আরেকটি সম্ভাবনা হলো ‘মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ’, যা তার মতে এই মাত্রায় ‘অত্যন্ত অসম্ভব’।
 
জাহাজে রোগটি কীভাবে ছড়িয়েছে তার কারণ জানতে প্রিমিয়ার মেডিকেল গ্রুপের চিকিৎসক এবং প্রেসিডেন্ট ও সিইও ড. স্কট মিসকোভিচ বলেছেন, ভাইরাস শনাক্ত করার জন্য সেগুলোকে ইনকিউবেট করার প্রক্রিয়া হিসেবে জাহাজটিকে ‘সর্বোচ্চ মাত্রায় কালচার’ করতে হবে। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি ঘরের সমস্ত ড্রপলেট, সমস্ত ধুলো, সমস্ত রান্নাঘর, সমস্ত ভেন্টিলেশন সিস্টেম থেকে নমুনা সংগ্রহ করে তারপর কালচার করতে হবে।’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ভাইরাসটির সিকোয়েন্সিংসহ বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। 

 

আরও পড়ুন

×