ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

কতটুকু মাংস খাওয়া স্বাস্থ্যসম্মত

কতটুকু মাংস খাওয়া স্বাস্থ্যসম্মত
×

ডা. এ হাসনাত শাহীন

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ০৭:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

কোরবানির ঈদ সমাগত। ঈদ মানেই আনন্দ, ফুর্তি আর উৎসবের আমেজ। এই আনন্দের বড় একটি অংশ জুড়ে থাকে হরেক রকমের খাবার-দাবার। ঈদের খাবার মেন্যুতে অন্য যাই থাক না কেন, টেবিল ভর্তি মাংসের বাহারি পদ মুখে না দেওয়া পর্যন্ত কোরবানি ঈদের আসল আমেজ যেন শুরুই হয় না। উৎসবের এই দিনগুলোতে অনেকেই আছেন; যারা কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়া অনবরত বেশি পরিমাণে মাংস খেয়ে ফেলেন। আবার বিপরীত দিকে এমন মানুষও আছেন, যারা মাংসের ক্ষতিকর দিক নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করেন এবং রোগব্যাধির ভয়ে মাংস ছোঁয়ার সাহসই পান না। 

রেডমিট বা গরু ও খাসির মাংসের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে চারপাশের নানা নেতিবাচক আলোচনা শুনতে শুনতে আমাদের মনে এক ধরনের অমূলক ভীতি তৈরি হয়েছে। তবে মনে রাখা জরুরি, যেকোনো খাবারের যেমন নেতিবাচক দিক থাকে, তেমনি সঠিক নিয়মে খেলে তা আমাদের শরীরের জন্য অনেক বড় উপকারেও আসে। গরু কিংবা খাসির মাংস হচ্ছে উচ্চমানের প্রাণিজ প্রোটিনের অন্যতম প্রধান উৎস। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, প্রতি ১০০ গ্রাম গরুর মাংসে প্রায় ২৬ গ্রাম বিশুদ্ধ প্রোটিন থাকে। এই প্রোটিন শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি এবং মজবুত দেহ গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া আমাদের শরীরের ভেতরের নতুন কোষ গঠন, ক্ষয়পূরণ এবং যেকোনো ধরনের ক্ষতস্থান দ্রুত সারিয়ে তুলতে প্রোটিনের কার্যকারিতা অপরিসীম। যখন কোনো কারণে দেহে চর্বি ও শর্করার অভাব দেখা দেয়, তখন এই প্রোটিনই শরীরে শক্তি উৎপাদনের জরুরি কাজটি সম্পন্ন করে। শুধু তাই নয়, রোগ সৃষ্টিকারী নানাবিধ জীবাণুকে প্রতিরোধ করার জন্য শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় অ্যান্টিবডি তৈরি করতে প্রোটিনের উপস্থিতি অপরিহার্য। তাছাড়া গরুর মাংস কেবল প্রোটিনেই সমৃদ্ধ নয়, এটি একই সঙ্গে আয়রন, জিঙ্ক, থায়ামিন, রিবোফ্লাভিন, সেলেনিয়াম এবং ভিটামিন বি-১২-এর মতো অতিপ্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর অন্যতম বড় উৎস। এই উপকারী মিনারেল ও ভিটামিনগুলো আমাদের শরীরের পেশি, দাঁত ও হাড়ের গঠনে সরাসরি ভূমিকা রাখে। এগুলো রক্তস্বল্পতা দূর করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং ত্বক, চুল ও নখের স্বাস্থ্য সতেজ রাখতে সাহায্য করে। তবে মনে রাখতে হবে যে, মাত্রাতিরিক্ত যেকোনো কিছুই স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ক্ষতির কারণ হতে পারে। প্রতিদিনের প্রোটিনের সঠিক চাহিদা মূলত নির্ভর করে একজন মানুষের শারীরিক ওজনের ওপর। ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ৭০ গ্রামের বেশি এবং সপ্তাহে ৫০০ গ্রামের বেশি প্রোটিন জাতীয় খাবার খাওয়া উচিত নয়। সেই হিসেবে একজন সুস্থ মানুষ দৈনিক ৫০ থেকে ৭০ গ্রাম কিংবা সপ্তাহে গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত লাল মাংস অনায়াসে খেতে পারবেন।

কিন্তু মাংসে প্রচুর পরিমাণে স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা জমাট চর্বি থাকায় অতিভোজনের কারণে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। প্রতি ১০০ গ্রাম গরুর মাংসে স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে প্রায় ২.৫ গ্রাম। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী, দৈনিক ২০০০ ক্যালরি চাহিদাসম্পন্ন একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ সারা দিনে সর্বোচ্চ ১৩ গ্রাম স্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রহণ করতে পারেন। তবে মনে রাখা দরকার, কেবল গরুর মাংসেই যে এই ফ্যাট রয়েছে তা কিন্তু নয়; আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকার অন্যান্য রান্নাবান্না ও প্রক্রিয়াজাত খাবারেও এর উপস্থিতি থাকে। তাই মাংসে থাকা অতিরিক্ত ফ্যাটের প্রবাহে রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়, যার ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং কোলন ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়। 
বিশেষ করে যাদের শরীরে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে চর্বির আধিক্য বা ডিসলিপিডেমিয়া রয়েছে কিংবা যাদের পরিবারে হৃদরোগের পূর্ব ইতিহাস আছে, তাদের কোরবানির ঈদে মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
ঈদের সময়ে সুস্থতার সঙ্গে মাংসের স্বাদ উপভোগ করতে কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি:
মাংস কাটার সময় ওপরে থাকা দৃশ্যমান সাদা চর্বিগুলো কেটে পুরোপুরি আলাদা করে ফেলে দিন। মাংস রান্নার সময় টুকরোগুলো কিছুটা পাতলা ও ছোট আকারে করুন, এতে মাংসের ভেতরের চর্বির পরিমাণ অনেকটাই কমে যায়।

মাংসে থাকা অতিরিক্ত ফ্যাট বা চর্বির প্রভাব কমাতে রান্নার আগে ভিনেগার, লেবুর রস কিংবা টক দই দিয়ে ম্যারিনেট করে নিতে পারেন। এটি মাংসকে নরম করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত করতে সাহায্য করে। কোরবানির মাংস রান্না করার সময় অতিরিক্ত তেল-মসলা দিয়ে ভুনা বা কষা না করে যতটা সম্ভব অল্প তেলে রান্না করার চেষ্টা করুন। মাংস চর্বিহীন করতে বেক, গ্রিল বা হালকা ঝোল করে রান্না করাই সবচেয়ে উত্তম। খাওয়ার সময় ঝোলটুকু বাদ দিয়ে শুধু মাংসের টুকরোটি খাওয়া ভালো। খুব উচ্চ তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় ধরে মাংস রান্না করলে তাতে পলিসাইক্লিক হাইড্রোকার্বন এবং হেটেরোসাইক্লিক অ্যামাইন জাতীয় ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান তৈরি হয়, যা শরীরের জন্য বিষাক্ত। তাই মাংস সবসময় মাঝারি বা অল্প তাপে ঢেকে ধীরে ধীরে রান্না করুন।
রান্না করার আগে মাংস হালকা গরম পানিতে সামান্য সেদ্ধ করে সেই পানিটুকু ফেলে দিতে পারেন। এতে মাংসের গায়ে লেগে থাকা চর্বি অনেকটাই দূর হয়ে যায়। একবার রান্না করা মাংস বারবার চর্বি গলিয়ে গরম করবেন না। বারবার উচ্চ তাপে গরম করলে মাংসের স্বাভাবিক পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায় এবং এতে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান তৈরি হয়।
পশুর ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেমন কলিজা, মগজ, গুরুদা ও পায়া বা নেহারি খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। কারণ এই অংশগুলোতে ক্ষতিকর ও ঘন চর্বির মাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে, যা হার্টের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। খাবারের পাতে শুধু মাংসের নানা পদের ভিড় না জমিয়ে সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে তাজা শসা-টমেটোর সালাদ, লেবু এবং সবজির জোগান রাখুন। আঁশযুক্ত খাবার মাংস হজম করতে দারুণ সাহায্য করে। খাওয়ার পর কৃত্রিম কোল্ড ড্রিংকস বা অতিরিক্ত মিষ্টি ডেজার্টের পরিবর্তে মাঠা, জিরাপানি, পুদিনার শরবত কিংবা টকদই খাওয়ার অভ্যাস করুন। এগুলো পাকস্থলীর অস্বস্তি দূর করে।
উৎসবের আনন্দের মধ্যেও নিয়মিত প্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন করতে যেন কোনো ভুল না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন। ঈদে খাওয়ার পরিমাণ কিছুটা বাড়লে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সকালে বা বিকেলে নিয়মিত হাঁটাচলা ও হালকা ব্যায়াম করা কোনোভাবেই বাদ দেবেন না।  
[ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও হরমোন রোগ বিশেষজ্ঞ এবং কনসালট্যান্ট, ইমপালস হাসপাতাল, ঢাকা]

আরও পড়ুন

×