ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

কী করে বুঝবেন হাড়ের ইনফেকশন

কী করে বুঝবেন হাড়ের ইনফেকশন
×

ছবিটি জেমিনি এআই দিয়ে তৈরি করা হয়েছে

 ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল 

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৭:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

হাড়ের ইনফেকশনকে চিকিৎসা পরিভাষায় বলে অস্টিওমাইলাইটিস (Osteomyelitis)। এ ক্ষেত্রে হাড় ও অস্থিমজ্জায় সংক্রমণ ও প্রদাহ হয়। সংক্রমণ রক্তের মাধ্যমে বা নিকটবর্তী টিস্যু থেকে ছড়াতে পারে। আবার সংক্রমণ হাড় থেকেও শুরু হতে পারে, যদি হাড়টি কোনোভাবে আঘাত পেয়ে সরাসরি জীবাণুর সংস্পর্শে আসে। যেসব লোক ধূমপান করেন এবং যারা দীর্ঘস্থায়ী রোগ–যেমন ডায়াবেটিস বা কিডনি বিকলতায় ভুগছেন, তাদের অস্টিওমাইলাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। যদিও একসময় অস্টিওমাইলাইটিসের চিকিৎসা সহজ ছিল না। বর্তমানে এর সফল চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। যেসব রোগীর হাড়ের কোনো অংশ মরে যায়, তাদের অপারেশনের মাধ্যমে সেই মৃত হাড় অপসারণের প্রয়োজন হয়।

উপসর্গ
অস্টিওমাইলাইটিসের উপসর্গের মধ্যে রয়েছে:
lতীব্র জ্বর  lইনফেকশনের স্থান ফুলে যাওয়া, গরম হওয়া ও লাল হয়ে যাওয়া
lইনফেকশনের স্থানে তীব্র ব্যথা হওয়া
lগুরুতর অবসন্নতা
কখনও কখনও অস্টিওমাইলাইটিসে কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। আবার অনেক সময় উপসর্গগুলো অন্য কোনো স্বাস্থ্য সমস্যার মতো মনে হওয়ায় আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এটি নবজাতক, বয়স্ক লোক এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত কম, তাদের ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য।

হাড়ের ইনফেকশনের কারণ
বেশিরভাগ অস্টিওমাইলাইটিসের মূল কারণ হলো স্ট্যাফাইলোকক্কাস ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়া সাধারণভাবে সুস্থ মানুষের ত্বকে ও নাকে বাস করে। জীবাণুগুলো তিনটি মাধ্যমে হাড়ে ঢুকতে পারে:
রক্ত: আপনার শরীরের অন্য কোনো স্থানের জীবাণু; উদাহরণস্বরূপ, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ফুসফুস কিংবা প্রস্রাবের ইনফেকশনযুক্ত থলি থেকে রক্তের মাধ্যমে হাড়ের কোনো দুর্বল স্থানে গিয়ে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
ইনজুরি বা আঘাত: আঘাতের ফলে ত্বকে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হলে জীবাণু শরীরের গভীরে ঢুকে যেতে পারে। যদি আঘাতের স্থানটি সংক্রমিত হয়, তবে জীবাণু পার্শ্ববর্তী হাড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আবার যদি আঘাতের ফলে হাড় ভেঙে চামড়া ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসে, তাহলে জীবাণু সরাসরি হাড়ে প্রবেশ করার সুযোগ পায়।
সার্জারি: জয়েন্টে অপারেশন বা কোনো ভাঙা হাড় জোড়া দেওয়ার জন্য মেটাল প্লেট/স্ক্রু লাগানোর সময় সরাসরি জীবাণুর সংস্পর্শ ঘটতে পারে।

ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়
আপনার হাড় স্বাভাবিকভাবে ইনফেকশন প্রতিহত করতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সুরক্ষার মাত্রাও কমতে থাকে। 

সাম্প্রতিক আঘাত বা অর্থোপেডিক সার্জারি:
গুরুতরভাবে হাড় ভেঙে গেলে কিংবা গভীর ক্ষত হলে হাড় বা আশপাশের টিস্যুতে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে। পশু-পাখির কামড় কিংবা জুতার মাধ্যমে পায়ে বা নখে ইনজুরি হলে সেখান থেকেও ব্যাকটেরিয়া ঢুকতে পারে। ভাঙা হাড় অপারেশনের মাধ্যমে ঠিক করার সময় বা জোড়া প্রতিস্থাপনের সময় কিংবা হাড়ে স্থাপিত বিভিন্ন অর্থোপেডিক ইমপ্লান্টের কারণে ইনফেকশন হতে পারে।

রক্ত সঞ্চালনে অস্বাভাবিকতা:
যখন রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা বন্ধ হয়ে যায়, তখন শরীরের ইনফেকশনের বিরুদ্ধে লড়াইকারী কোষগুলো (শ্বেতকণিকা) আক্রান্ত স্থানে পৌঁছাতে পারে না। ফলে একটি ছোট কেটে যাওয়া অংশও বড় ক্ষতে পরিণত হতে পারে, যার দরুন গভীর টিস্যু ও হাড় উন্মুক্ত হয়ে ইনফেকশন ঘটে।

কিছু রোগে রক্তসঞ্চালন গুরুতরভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়:
lঅনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস
lপ্রান্তিক রক্তনালির রোগ, যা সচরাচর ধূমপানের সঙ্গে সম্পৃক্তlসিকেল সেল রোগ 
যেসব চিকিৎসায় ক্যাথেটার ব্যবহার করা হয়:
lডায়ালাইসিস প্রক্রিয়া lইউরিনারি ক্যাথেটার 
দীর্ঘমেয়াদি শিরাপথে স্যালাইন বা ইনজেকশন
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া:
যদি কোনো কারণে আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হয়, তবে হাড়ে সংক্রমণ হওয়ার ব্যাপক আশঙ্কা থাকে। নিচের বিষয়গুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়:
ক্যান্সারের চিকিৎসা (যেমন- কেমোথেরাপি)

অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস
দীর্ঘদিন ধরে কর্টিকোস্টেরয়েড (Corticosteroid) জাতীয় ওষুধ গ্রহণ

অবৈধ বা নিষিদ্ধ ড্রাগ গ্রহণ:
যেসব লোক শিরাপথে ইনজেকশনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ ওষুধ বা ড্রাগ গ্রহণ করেন, তারা প্রায়ই জীবাণুযুক্ত বা একই সুই বারবার ব্যবহার করেন। ফলে তাদের হাড়ের ইনফেকশন হবার আশঙ্কা অনেক বেশি থাকে।

জটিলতা
হাড় মরে যাওয়া: হাড়ে ইনফেকশন হলে হাড়ের ভেতরের রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে হাড়ের ওই অংশটি মরে যায়। হাড়ের যে স্থানটি মরে যায়, সেটি অপারেশনের মাধ্যমে কেটে ফেলে দিতে হয়; তাহলেই কেবল অ্যান্টিবায়োটিক ঠিকমতো কাজ করতে পারে।
সেপটিক আর্থ্রাইটিস: কখনও কখনও হাড়ের ইনফেকশন খুব দ্রুত পার্শ্ববর্তী জয়েন্ট বা গিঁটে ছড়িয়ে পড়ে।
বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া: শিশুদের ক্ষেত্রে হাড় বা জয়েন্টের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে, যদি সংক্রমণটি হাড়ের নরম অংশ বা গ্রোথ প্লেটে আঘাত হানে।
ত্বকের ক্যান্সার: যদি হাড়ের ইনফেকশনের ফলে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষত তৈরি হয়ে পুঁজ বের হতে থাকে, তবে সেখানকার আশপাশের ত্বকে ক্যান্সার  হবার উচ্চ ঝুঁকি থাকে।
প্রতিরোধ: আপনার যদি হাড়ের ইনফেকশনের উচ্চ ঝুঁকি থাকে, তবে তা কমানোর জন্য আগে থেকেই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করুন।
সাধারণভাবে কেটে যাওয়া, ছড়ে যাওয়া বা প্রাণীর আঁচড়-কামড় এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবেন, কারণ এগুলোর মাধ্যমে সহজে জীবাণু ভেতরে ঢোকে। যদি আপনার নিজের বা আপনার সন্তানের শরীরের কোথাও সামান্য কেটেও যায়, তবে জায়গাটি দ্রুত অ্যান্টিসেপ্টিক দিয়ে পরিষ্কার করুন এবং সেখানে পরিষ্কার ব্যান্ডেজ বেঁধে দিন। ক্ষতে ইনফেকশনের কোনো লক্ষণ (যেমন- লাল হওয়া, ফুলে যাওয়া বা পুঁজ হওয়া) দেখা যাচ্ছে কিনা, তা নিয়মিত খেয়াল রাখুন।

[ লেখক: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক]
 

আরও পড়ুন

×