দীর্ঘদিনের কাশি: কখন সতর্ক হবেন
ডা. এ কে এম মূসা
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৬:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
ইচ্ছা বা অনিচ্ছায়–দু’ভাবেই আমরা কাশি দিয়ে থাকি। মূলত, হঠাৎ ও সজোরে ফুসফুসের বাতাস সশব্দে বের হয়ে আসাই হলো কাশি। এটি শ্বাসনালি ও ফুসফুসকে স্লেষ্মা বা কফ (Phlegm), মিউকাস, বাইরের ধূলিকণা বা জীবাণু থেকে মুক্ত রেখে পরিচ্ছন্ন রাখে। সুতরাং, কাশি শরীরের রোগ প্রতিরোধের একটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় রিফ্লেক্স (Reflex) ক্রিয়া, যার রিসেপ্টরগুলো শ্বাসনালিতে থাকে। তবে অতিরিক্ত বা দীর্ঘদিনের কাশি বিভিন্ন জটিল রোগের লক্ষণ হতে পারে।
কাশির প্রকারভেদ
স্বল্পমেয়াদি কাশি: সাধারণত ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ এবং নিউমোনিয়ার কারণে এই কাশি হয়। এটি সাধারণত তিন থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়।
ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী কাশি: যদি প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে কাশি আট সপ্তাহের বেশি এবং শিশুর ক্ষেত্রে চার সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, তবে তাকে দীর্ঘস্থায়ী কাশি বলে। দীর্ঘদিনের কাশি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় গুরুতর বিঘ্ন ঘটায়। এর ফলে ঘুমের ব্যাঘাত, ব্যাপক ক্লান্তি, বুক ব্যথা, মাথা ঘোরা, প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারা (Urinary incontinence), এমনকি হার্নিয়া বা বুকের পাঁজরের হাড় ভেঙে যাওয়ার মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী কাশির প্রধান কারণ
অ্যাজমা বা হাঁপানি: বংশগত কারণ, দূষিত বাতাস, বিভিন্ন অ্যালার্জেন এবং ভাইরাস সংক্রমণের কারণে অ্যাজমা হতে পারে। এতে শ্বাসনালি সংকুচিত হয়ে বাতাস চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে; ফলে কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ ধরা ও বাঁশির মতো শব্দ হয়। সাধারণত এই কাশি রাতে ও ভোরে বাড়ে। এ ছাড়া ‘কফ ভ্যারিয়েন্ট অ্যাজমা’র ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্টের মতো অন্য লক্ষণ না থাকলেও শুধু তীব্র শুকনো কাশি দেখা যায়।
গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ: পাকস্থলী ও খাদ্যনালির সংযোগস্থলের রিং বা স্ফিংটার (Sphincter) শিথিল হয়ে গেলে পাকস্থলীর এসিড খাদ্যনালিতে চলে আসে। একে এসিড রিফ্লাক্স বলে, যা দীর্ঘস্থায়ী কাশির অন্যতম কারণ। এর অন্যান্য লক্ষণের মধ্যে রয়েছে মুখ টক হয়ে যাওয়া, বুক জ্বালাপোড়া করা এবং টক ঢেকুর ওঠা।
সিওপিডি (COPD–Chronic Obstructive Pulmonary Disease): যারা দীর্ঘকাল ধূমপান করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই রোগ বেশি দেখা যায়। ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসের কারণে টানা দুই বছর, প্রতি বছরে অন্তত তিন মাসের বেশি সময় কফযুক্ত কাশি থাকে। এর ফলে ফুসফুসের বায়ুথলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রক্তে অক্সিজেন প্রবাহ ব্যাহত হয় এবং রোগী অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠেন।
ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের কিছু ওষুধ, যেমন–ACE Inhibitor (যেমন: রামিপ্রিল, এনামোপ্রিল ইত্যাদি) এবং বিটা ব্লকারের কারণে দীর্ঘস্থায়ী শুকনো কাশি হতে পারে। তাই দীর্ঘদিনের কাশির রোগীদের কোনো বড় পরীক্ষার আগে তাদের ওষুধের ইতিহাস জানা জরুরি।
হার্ট ফেইলিউর: হৃদযন্ত্রের পাম্প করার ক্ষমতা কমে গেলে ফুসফুস ও শরীরে পানি জমতে পারে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী কাশি, দুর্বলতা এবং সামান্য পরিশ্রমে ক্লান্তি আসে। বিশেষ করে রাতে শোয়ার সময় এই কাশি ও শ্বাসকষ্ট তীব্র রূপ নেয়।
ফুসফুসের সংক্রমণ (যেমন: যক্ষ্মা): আমাদের দেশে যক্ষ্মা বা টিবি রোগের প্রকোপ অনেক বেশি। তাই দুই সপ্তাহের বেশি কাশি হলে অবশ্যই যক্ষ্মা পরীক্ষা করা জরুরি। যক্ষ্মার অন্যান্য প্রধান লক্ষণ হলো–বিকেলে মৃদু জ্বর, ওজন কমে যাওয়া, ক্ষুধামান্দ্য এবং কফের সঙ্গে রক্ত আসা।
ফুসফুসের ফাইব্রোসিস: ফুসফুসের ভেতরের দেয়াল শক্ত বা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেলে (Diffuse Parenchymal Lung Disease) তীব্র শুকনো কাশি ও ক্রমান্বয়ে শ্বাসকষ্ট বাড়ে।
ফুসফুসের ক্যান্সার: যারা দীর্ঘ ২০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে প্রতিদিন গড়ে ২০টি বা তার বেশি সিগারেট খান, তাদের ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। ধূমপায়ীদের সাধারণ কাশির ধরন হঠাৎ বদলে যাওয়া, গলার স্বর পরিবর্তন হওয়া, দ্রুত ওজন হ্রাস, চরম ক্লান্তি এবং কফের সঙ্গে রক্ত যাওয়া এই রোগের অন্যতম লক্ষণ।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
lকাশির সঙ্গে তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে বা সিওপিডি রোগীর শ্বাসকষ্ট হঠাৎ বেড়ে গেলে।
lকফ বা শ্লেষ্মার সঙ্গে রক্ত দেখা দিলে।
lযে কাশির তীব্রতায় রাতে হুট করে ঘুম ভেঙে যায়।
lকাশির সঙ্গে বুক ব্যথা, তীব্র জ্বর, ক্ষুধামান্দ্য এবং দ্রুত ওজন কমতে থাকলে।
lবুকের এক্স-রে -তে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন ধরা পড়লে।
রোগ নির্ণয় ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা
রোগীর শারীরিক অবস্থা এবং রোগের ইতিহাস জানার পর চিকিৎসকেরা সাধারণত নিচের
পরীক্ষাগুলোর পরামর্শ দিয়ে থাকেন:
lরক্তের সাধারণ পরীক্ষা ও রক্তে ইওসিনোফিলের (Eosinophil) মাত্রা যাচাই।
lকফ বা শ্লেষ্মা পরীক্ষা (যক্ষ্মার জীবাণু বা ম্যালিগন্যান্ট কোষ শনাক্তকরণ)।
lবুকের এক্স-রে।
lবুকের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সিটি স্ক্যান
lস্পাইরোমেট্রি (Spirometry) বা ফুসফুসের কার্যক্ষমতা পরীক্ষা।
lপ্রয়োজনে ব্রঙ্কোস্কোপি ।
প্রতিরোধ ও সাধারণ চিকিৎসা
lমূল রোগটি সঠিকভাবে নির্ণয় করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করতে হবে।
lধূমপানের অভ্যাস থাকলে তা সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে।
lধুলাবালি, অতিরিক্ত ঠান্ডা আবহাওয়া এবং অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী উপাদান এড়িয়ে চলতে হবে।
lবাইরে বের হওয়ার সময় মাস্ক ব্যবহার করার অভ্যাস করতে হবে।
lঠান্ডার দিনে বা ঋতু পরিবর্তনের সময় হালকা কুসুম গরম পানি ব্যবহার করা ভালো।
লেখক: অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ,
ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ, ঢাকা ও আলোক হেলথকেয়ার]
- বিষয় :
- চিকিৎসা
