সময় এখন ডেঙ্গুর সতর্ক থাকুন
ডা. আবদুল্লাহ শাহরিয়ার
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
বর্ষার আগমন মানেই চারপাশের প্রকৃতিতে স্বস্তি, কিন্তু একই সঙ্গে এই মৌসুমটি আমাদের দেশে ডেঙ্গু জ্বরের এক ভয়াবহ প্রকোপ নিয়ে আসে। বর্ষাকালের অবিরাম বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা এবং স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া এডিস মশার বংশ বিস্তারের জন্য সবচেয়ে উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। ফলে এই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা প্রতি বছর জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। এই পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু জ্বরকে কোনোভাবেই হেলাফেলা করার সুযোগ নেই। ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দেওয়ার একদম শুরু থেকেই সঠিক ও সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসায় সামান্য অবহেলা বা বিলম্ব আপনার জীবন সংশয়ের বড় কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুর প্রধান এবং অন্যতম কারণ হলো জটিলতা তীব্র হওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসকের কাছে দেরি করে আসা। তাই এই বর্ষা মৌসুমে যেকোনো ধরনের জ্বর হলে অবহেলা না করে প্রথম বা দ্বিতীয় দিনের মধ্যেই চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। বিশেষ করে শিশু, বয়োবৃদ্ধ, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং যারা আগে থেকেই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা কিডনি রোগে আক্রান্ত, তাঁদের জন্য প্রথম দিন থেকেই চিকিৎসকের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে থাকা আরও বেশি জরুরি।
অনেকের মধ্যেই একটি ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, ডেঙ্গু রোগের রক্ত পরীক্ষা জ্বর আসার অন্তত তিন দিন পার না হওয়া পর্যন্ত করা যায় না বা করলে সঠিক রেজাল্ট আসে না। এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান সম্মত নয়। ডেঙ্গু শনাক্তকরণের আধুনিক পরীক্ষা (যেমন NS1 Antigen Test) জ্বর আসার প্রথম দিন থেকেই করা সম্ভব এবং এর মাধ্যমে প্রথম দিনই নিশ্চিত হওয়া যায় রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত কিনা। তাই লক্ষণ দেখা দিলে পরীক্ষার জন্য তিন দিন বসে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।
যেসব লক্ষণ দেখলে হাসপাতালে যেতে হবে
ডেঙ্গু জ্বরের সাধারণ উপসর্গের বাইরে কিছু নির্দিষ্ট ‘ওয়ার্নিং সাইন’ বা বিপজ্জনক লক্ষণ রয়েছে, যা দেখা দিলে রোগীকে এক মুহূর্তও ঘরে না রেখে সরাসরি হাসপাতালে ভর্তি করা উচিত।
প্রথমত, যদি রোগীর পেটে প্রচণ্ড ও অবিরাম ব্যথা হতে থাকে এবং তার সঙ্গে ঘন ঘন বমি হয়, তবে বুঝতে হবে রোগটি জটিল আকার ধারণ করছে।
দ্বিতীয়ত, যদি রোগীর শ্বাসকষ্ট শুরু হয় অথবা হাত-পা ও পেট ফুলে যেতে দেখা যায়, তবে তা শরীরের ভেতরে পানি জমার লক্ষণ হতে পারে।
তৃতীয়ত, শরীরে কোনো বাহ্যিক আঘাত ছাড়াই যদি মাড়ি, নাক, বমি বা মলের সঙ্গে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ দেখা যায়, অথবা চামড়ার নিচে লালচে কালো দাগ দেখা দেয়, তবে তা প্লাটিলেট কমে যাওয়ার ভয়াবহ লক্ষণ।
চতুর্থত, রোগীর যদি জ্ঞানের মাত্রা কমে যেতে শুরু করে, তীব্র অবসাদ দেখা দেয় কিংবা সে যদি অস্বাভাবিক বা অসংলগ্ন আচরণ করতে থাকে, তবে তা মস্তিষ্কে ভাইরাসের প্রভাবের সংকেত দেয়।
পঞ্চমত, শরীরের অত্যধিক ও অস্বাভাবিক দুর্বলতা, যার কারণে রোগী বিছানা থেকে উঠতে পারছে না, এবং ষষ্ঠত, যদি দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্রাবের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে যায়, তবে তা কিডনি বিকল হওয়ার পূর্বলক্ষণ। এই লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি দেখা গেলেই রোগীকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যেতে হবে।v
[অধ্যাপক, পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি বিভাগ, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল]
- বিষয় :
- ডেঙ্গু