ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

দুদকের আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি

দুদকের আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি
×

আবু কাওসার

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৮ জুন ২০২০ | ১৫:৩৮

বিনা প্রশ্নে কালো টাকা সাদা করার যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে তা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন বিশ্নেষকরা। ঢালাওভাবে কালো টাকা বৈধ করার উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে তাদের। তা ছাড়া অর্থনীতিবিদ ও বিশিষ্টজন বলেছেন, যে উদ্দেশ্যে সরকার এ সুযোগ দিয়েছে, বর্তমান বাস্তবতায় তার সুফল তেমন মিলবে না। কেননা অতীতে এমন সুযোগ দেওয়া হলেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।

তবে সরকারের নীতিনির্ধারক সূত্রে জানা গেছে, অতীতে সাড়া পাওয়া না গেলেও এবার আশাবাদী সরকার। কারণ, সুবিধাভোগীরা যাতে এ সুযোগ নেয়, সে জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। সংশ্নিষ্টরা যাতে কালো টাকা সাদা করার অবারিত সুযোগ নেয়, সে লক্ষ্যে বাজেট পাসের পর বড় ধরনের প্রচারাভিযানে নামবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

প্রস্তাবিত ২০২০-২০২১ অর্থবছরের বাজেটে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি ১০ শতাংশ কর দিয়ে নির্ধারিত খাতে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিসহ অপ্রদর্শিত আয় (কালো টাকা) ঘোষণা করে, তা হলে অন্য আইনে যা-ই থাকুক না কেন, তার আয়ের উৎস সম্পর্কে কেউ জানতে চাইবে না। প্রচলিত আয়কর আইনের একটি ধারা সংযোজন করে এবারের বাজেটে আগামী এক বছরের জন্য এ সুযোগ দেওয়া হয়। অতীতে কালো টাকা সাদা করার ক্ষেত্রে শর্ত ছিল- এই টাকার উৎস সম্পর্কে এনবিআর কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারবে না। তবে অন্য কোনো সরকারি সংস্থা জানতে পারে। নতুন বাজেটে এ শর্ত শিথিল করে বলা হচ্ছে- এনবিআর, দুদক কিংবা অন্য কোনো সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা টাকার উৎস সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন প্রেক্ষাপটে ঢালাওভাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার বিধান কার্যকর হলে তা দুদকের আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে এবং দুদকের আইনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

দুদক জানাচ্ছে, সরকার যে আইন করবে তা প্রতিপালন করাই তাদের দায়িত্ব। অন্যদিকে এনবিআর বলেছে, করোনাকালীন সংকট মোকাবিলায় নির্ধারিত সময়ের জন্য বিশেষ এ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এনবিআর সূত্র বলেছে, আয়কর আইনে কালো টাকার উল্লেখ নেই। আছে অপ্রদর্শিত বা অঘোষিত আয়। এতে বলা হয়েছে, বৈধভাবে আয় করা হয়েছে অথচ কোনো কারণে ওই টাকা আয়কর রিটার্নে দেখানো হয়নি বা গোপন রাখা হয়েছে, সেটিই অপ্রদর্শিত বা অঘোষিত আয়। যাকে আইনের ভাষায় বলে আনট্যাক্স মানি। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কালো টাকার উৎসই হচ্ছে ঘুষ-দুর্নীতি, চোরাচালান, খুন-ডাকাতি ইত্যাদির মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ। কাজেই অপ্রদর্শিত আয় বা কালো টাকা এক বিষয় নয়।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বাজেটে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ ঘোষণার পর কয়েকটি বিষয় আলোচনায় উঠে এসেছে। প্রথমত. অবৈধ আয়ের উৎস সম্পর্কে যদি সংস্থা প্রশ্ন করতে না পারে, তাহলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনের কী হবে? দ্বিতীয়ত. দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে সরকার কী জবাব দেবে? তৃতীয়ত. যারা সুযোগটি নেবেন, পরে তাদের সরকার যে হয়রানি করবে না- এ গ্যারান্টি কে দেবে?। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, সরকার এসব বিষয় পরিস্কার না করলে এবারও এ সুযোগ কাজে লাগবে না।

এনবিআর বলেছে, বিষয়গুলো মাথায় রেখেই সরকারপ্রধানের সঙ্গে আলোচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া এমন সুযোগ নতুন নয়, আগেও দেওয়া হয়েছে। কাজেই বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক বা সমালোচনা করার কিছু নেই।

দুদকের আইনের পরিপন্থি : বিদ্যমান দুদকের আইনে বলা আছে, যদি কোনো ব্যক্তি জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত (অবৈধ উপায়ে অর্জিত) সম্পদ অর্জন করে, তা হলে ওই ব্যক্তির দুর্নীতি 'অপরাধ' হিসেবে গণ্য হবে। এ ক্ষেত্রে তদন্ত করে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা দুদক রাখে। আইনে আরও বলা আছে, দুর্নীতিরোধে সর্বশেষ যে আইনটি চলমান আছে, নতুন আইন না হওয়া পর্যন্ত সেটিই বলবৎ থাকবে। ফলে আইন অনুযায়ী প্রশ্ন উঠছে, দুদকের আইনটি কি এ ক্ষেত্রে কার্যকর থাকবে?

আগামী ৩০ জুন নতুন বাজেটে পাস হবে। সংসদে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব পাসের পর তা আইনে পরিণত হবে এবং সেটি হবে সর্বশেষ বা হালনাগাদ আইন। এতে সংশ্নিষ্ট বিষয়ে দুদকের আইন অকার্যকর হয়ে পড়বে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এনবিআর বলেছে, আগের ঘটনাগুলোর বিষয়ে দুদক তদন্ত করতে পারলেও নতুন ঘটনাগুলোর বিষয়ে তদন্ত করতে পারবে না।

দুদকের বক্তব্য : যোগাযোগ করা হলে দুদক কমিশনার (অনুসন্ধান ) ডক্টর মো. মোজাম্মেল হক খান সমকালকে বলেন, বাজেটে উত্থাপিত প্রস্তাব পার্লামেন্টে অনুমোদন দিলে সেটিই হবে সর্বশেষ আইন। সরকারের আইনের বাইরে কিছু করতে পারব না। দুদকের আইনও সরকারের এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুদকের আইন সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দিলে সরকার সেটি করবে। সরকার যে আইন করবে তা প্রতিপালন করাই দুদকের দায়িত্ব।

এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপকে সরকার কী জবাব দেবে- এ প্রশ্নের উত্তরে দুদক কমিশনার বলেন, অনেক ক্ষেত্রে তারা আমাদের সমালোচনা করে। কিন্তু 'ল অব দ্য ল্যান্ড' বলে একটা কথা আছে। আমরা আমাদের দেশের আইন অনুযায়ী চলব। তবে সরকার এমন কিছু করবে না যা দেশের ও জনগণের স্বার্থ বিঘ্নিত করে। এটা বাজেটের প্রস্তাব। সংসদে উপস্থাপন হলে এটা নিয়ে নানা প্রস্তাব আসবে। তবে আগে দেখা যাক সরকারের পক্ষ থেকে কী ব্যাখ্যা আসে। তারপর বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে বলে জানান তিনি।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া : মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক দুটি সংস্থা রয়েছে। একটি হচ্ছে এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অব মানি লন্ডারিং বা সংক্ষেপে এপিজি। আরেকটি হলো এগমন্ড গ্রুপ। বাংলাদেশসহ এই দুটি সংস্থার সদস্য ১৫০-এর বেশি। এসব সংস্থার শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি শর্ত হচ্ছে- এমন কিছু করা যাবে না যাতে সন্ত্রাসী অর্থায়ন ও মানি লন্ডারিংকে উৎসাহিত করা হয়। বিশ্নেষকরা বলছেন, এবারের বাজেটে ঢালাওভাবে কালো টাকা বৈধ করতে দেওয়ার সুযোগ আন্তর্জাতিক এ দুটি সংস্থার নীতি পরিপন্থি। এ বিষয়ে তারা বাংলাদেশ সরকারের কাছে কৈফিয়ত চাইতে পারে বা অন্য কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে। তাই প্রশ্ন উঠেছে- সরকার তাদের কী জবাব দেবে?

এনবিআরের বক্তব্য : বাজেট প্রণয়নে সম্পৃক্ত এনবিআরের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, করোনা মহামারির কারণে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে মহাসংকট চলছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে এ সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তাও নির্ধারিত সময়ের জন্য। তিনি বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশেই এ সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সরকারপ্রধানের সঙ্গে আলোচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে এর ব্যাখ্যা দেবে সরকার। তা ছাড়া ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও এমন সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এটা নতুন কিছু নয়।

আরও পড়ুন

×