ঢাকা চেম্বারের মতবিনিময় সভায় বক্তারা
বিনিয়োগের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের বিকল্প নেই
রাজধানীর মতিঝিলে শনিবার ডিসিসিআই আয়োজিত ব্যবসা সহজ করার বিষয়ে মতবিনিময় সভায় চেম্বার সভাপতি তাসকীন আহমেদসহ অতিথিরা - ফটাে রিলিজ
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে দেশব্যাপী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। গতকাল শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণে নির্বাচন-পরবর্তী উন্নত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখার অত্যাবশ্যকীয়তা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এমন মত দেন।
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, চাঁদাবাজি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও যানজট শুধু ব্যবসায়ী এবং বেসরকারি খাতের সমস্যা নয়। এগুলো সামগ্রিকভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিককে প্রভাবিত করছে। সরকারি কর্মকর্তা, এমনকি পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও দৈনন্দিন জীবনে এসব সমস্যার প্রভাব থেকে মুক্ত নন। তাদের পরিবারের সদস্যরাও চাঁদাবাজি, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তাসকীন আহমেদ বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর দায় চাপিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সময় এসেছে সামাজিক আন্দোলন তৈরি করার। সামাজিকভাবে চাঁদাবাজি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে।
ডিসিসিআই সভাপতির প্রত্যাশা, নতুন সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের মাধ্যমে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজীকরণে উদ্যোগী হবে। তাঁর মতে, বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে বেসরকারি খাতের সমন্বয় আরও বাড়ানো দরকার।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন এ এইচ এম আহসান বলেন, বাজার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সমন্বয়ের কোনো বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে পণ্যের সঠিক তথ্য-উপাত্ত নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। তিনি বলেন, ব্যবসা সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত হলে উদ্যোক্তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় কমে, যা পণ্যের দাম কমাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। নতুন সরকার সব স্তরে আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিতে আরও সুদৃঢ় পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি আশা করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এফবিসিসিআইর প্রশাসক আবদুর রহিম খান বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও বাজার ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু রাখার বিকল্প নেই। এ বিষয়ে দ্রুত কিছু কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে, যার মাধ্যমে দৃশ্যমান পরিবর্তন পরিলক্ষিত হবে। তিনি বলেন, গত ১৮ মাস দেশে রাজনৈতিক সরকার ছিল না। তখনও চাঁদাবাজি হয়েছে। চাঁদাবাজি বা চাঁদাবাজদের আসলে রাজনৈতিক কোনো অবস্থান নেই। এটি একটি ক্ষত। সমাজের এই ক্ষত বা অসুস্থতা দূর করতে দরকার সমন্বিত প্রয়াস।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া বলেন, সার্বিক উন্নয়নের জন্য উন্নত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো বিকল্প নেই। এর অভাবে আস্থার সংকট তৈরি হয়, যা বিনিয়োগের গতি কমায়।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আব্দুল জলিল বলেন, আলুতে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে এর গুণগত মান কমে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ঠিক না থাকায় বাংলাদেশ আলু রপ্তানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ বিষয়ে কৃষক, উদ্যোক্তা ও সরকারি সংস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে প্রায় পাঁচ লাখ ‘টেসলা’ গাড়ি ঢাকা শহরে ঢুকেছে বলে জানান ডিএমপির উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। তিনি বলেন, এগুলো যানজট বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সিদ্ধান্ত হয়েছিল এগুলো বন্ধ থাকবে অথবা প্রধান প্রধান সড়কে চলাচল করবে না। কিন্তু পরে বাধ্য হয়ে সরকার সেগুলো চলার অনুমতি দেয়। নতুন সরকার রিকশা নিয়ে কিছু সিদ্ধান্ত দিয়েছে। ঈদের পর টেসলা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম সবার চোখে পড়বে। অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে এতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আমদানি নীতিমালা ও গ্যারেজগুলো নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
সড়কে চাঁদাবাজি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, চাঁদাবাজির বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। যদি কোনো পুলিশ সদস্য বা প্রভাবশালী ব্যক্তি চাঁদাবাজিতে লিপ্ত থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সভায় মুক্ত আলোচনায় বাংলাদেশ চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবুল হাসেম বলেন, যানজট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রোধে সরকারকে বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে হবে। ভ্যাট ও ট্যাক্স বিষয়ে একটি সহনীয় নীতি করতে হবে। বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মওলা বলেন, সংকটকালে বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হলেও পরিস্থিতি উন্নয়নে তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না। নিত্যপণ্যের সঠিক কোনো তথ্য না থাকায় বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজির কারণে পণ্যের দাম বাড়ছে।
গোলাম মাওলা আরও বলেন, সীমান্ত এলাকা থেকে একটি ট্রাকে পণ্য আনতে ৩০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। আরও ১০ হাজার টাকা দিতে হয় শ্রমিক কল্যাণ তহবিল, ড্রাইভার কল্যাণ তহবিল, মানবিক তহবিলসহ বিভিন্ন অলিখিত খাতে। ‘চাঁদাবাজি’ একটি অদৃশ্য ব্যয়ের মতো। এটি হাতে ধরা যায় না। তবে এর প্রভাব অনেক বড়।
মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী ভুট্টো বলেন, নিত্যপণ্য আমদানিতে স্বল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট তৈরি হয়। এতে পণ্যের দাম বাড়ে। তাই পণ্য আমদানিতে বেশিসংখ্যক ব্যবসায়ীকে অনুমতি দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ক্রোকারিজ মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনির হোসেন বলেন, রোজার আগে নওগাঁ থেকে পণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়া ছিল ১৪ হাজার টাকা। এখন সেই ভাড়া বেড়ে হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। তাছাড়া রাস্তায় যানজট লেগেই থাকে। ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নতি নেই। ফলে রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি আটকে থাকে; যা পণ্যের সরবরাহ ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকে বহন করতে হয়।
- বিষয় :
- বিনিয়োগ
