ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিতে আমূল বদল

শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিতে আমূল বদল
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৮:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির শীর্ষ নেতৃত্ব আমূল বদলে ফেলার গুঞ্জন অনেক আগে থেকেই ছিল। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরকার গঠন ও দায়িত্ব গ্রহণের আগে থেকে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে এমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তাঁর ঘোষণার কয়েক মাস পর সে প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে।

এ খবরে আট দিন দর বাড়ার পর গতকাল লেনদেন শুরুর প্রথম আধা ঘণ্টায় দর সংশোধনের ধারায় যাওয়া শেয়ারবাজার ফের ঘুরে দাঁড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত মূল্য সূচক বেড়েছে টানা নবম দিনে, লেনদেন বেড়ে ৯ মাসের সর্বোচ্চে উঠেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে হঠাৎ করেই বিএসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা একযোগে পদত্যাগ করেন। এরপর দুপুরেই করপোরেট ব্যক্তিত্ব মাসুদ খানকে নতুন চেয়ারম্যান এবং নারী আইনজীবী নাহিদ মাহতাব, আশা ইন্টারন্যাশনালের ফাইন্যান্স ডিরেক্টর তানভীর হাবিব রহমান এবং ঢাকা ব্যাংকের মালিকানাধীন ব্রোকারেজ হাউসের এমডি নাফিজ-আল-তারিককে কমিশনার পদে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি)।

গতকাল দুপুরেই মন্ত্রণালয়ের যোগদানপত্রে স্বাক্ষর করে বেলা ৩টায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসি কার্যালয়ে আসেন তারা। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগবিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা তানভীর গণি এবং এফআইডির সচিব নাজমা মোবারেক সঙ্গে ছিলেন। 

তার আগে সকালে পদত্যাগপত্র পাঠান আগের চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং চার কমিশনার মোহসীন চৌধুরী, আলী আকবর, ফারজানা লালারুখ এবং মো. সাইফুদ্দিন। 
বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে মাসুদ খান কীভাবে দেশের শিল্প উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করে নতুন করে শেয়ারবাজারকে পুঁজি সরবরাহের প্রধান উৎস হিসেবে গড়তে চান, সে বিষয়ে এক গুচ্ছ লিখিত কর্ম-পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি পড়ে শোনান তিনি।

দেশের পুঁজিবাজারকে একটি স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ-নির্ভর বাজারে রূপান্তরের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি বলেন, তাঁর লক্ষ্য বর্তমানের ‘ফ্রন্টিয়ার মার্কেট’ থেকে বাংলাদেশকে একটি ‘এমার্জিং মার্কেট’-এ উন্নীত করা। তিনি বাজারের হারানো আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য যেখানে প্রয়োজন সেখানে নিয়ন্ত্রণ এবং যেখানে সম্ভব সেখানে সরলীকরণ নীতি অনুসরণের ঘোষণা দেন।তিনি বলেন, বহুজাতিক কোম্পানি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও বড় স্থানীয় করপোরেটগুলোকে বাজারে আনতে সক্রিয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। মূলধনের আকার বা ব্যবসা বা ঋণের আকার নির্দিষ্ট পরিমাণ অতিক্রম করা, পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানিগুলোকে বাধ্যতামূলক তালিকাভুক্ত করার নীতি গ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জোর করে নয়, তাদের শেয়ারবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহে উদ্বুদ্ধ করা হবে। এজন্য তালিকাভুক্ত কোম্পানি সুবিধা কর্মসূচি চালু করা হবে। 

তিনি বলেন, শেয়ার কারসাজি রোধে বিএসইসি, ডিএসই ও সিএসইকে সমন্বিত করে রিয়েল-টাইম নজরদারি কাঠামো গড়ে তোলা হবে। ইনসাইডার ট্রেডিং ও বাজার কারসাজির ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আরও কঠোর হবে এবং প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবে লেনদেন স্থগিতের ক্ষমতা ব্যবহার করা হবে। তিনি বলেন, যারা আইন ও বাজার শৃঙ্খলা মেনে শেয়ার কেনাবেচা করবেন, তাদের ভয় নেই। তবে যারা কারসাজি করবেন, তাদের অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় কঠোর আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা তানভীর গণি বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সম্ভাবনা অনেক বড়। কমিশন এবং বাজারসংশ্লিষ্টরা ভিন্ন কোনো পক্ষ নয় বরং সবাই একই টিমের অংশ হয়ে কাজ করবে। যতটা সম্ভব স্ব-নিয়ন্ত্রণ চালু করা হবে। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বড় প্রকল্পের জন্য কেবল ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল থাকা সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য পুঁজিবাজারই একমাত্র বিকল্প হতে পারে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, বর্তমান কমিশনের ওপর সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপ নেই। প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী তাঁদের মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে কাজ করার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন।

এফআইডি সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, বর্তমানে দেশে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জন্য ব্যাংক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার অর্থনীতিতে সমস্যা তৈরি করছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার পুঁজিবাজার সংস্কারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। 

বিএসইসির নবনিযুক্ত কমিশনার তানভীর হাবিব রহমান দেশের পুঁজিবাজারকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করা এবং বিনিয়োগকারীদের শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মো. নাফিজ-আল-তারিক পুঁজিবাজারের আধুনিকায়ন এবং আস্থার ওপর জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান কমিশনের লক্ষ্য হলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ এবং পরিচ্ছন্ন পুঁজিবাজার গড়ে তোলা। নাহিদ মাহতাব বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কমিশনের প্রধান কাজ হবে বিদ্যমান আইন-কানুনগুলোকে সঠিকভাবে কার্যকর করা। 
এদিকে বিএসইসির শীর্ষ নেতৃত্বে বদলের জন্য মুখিয়ে ছিলেন বিনিয়োগকারীরা। গতকাল সকালে প্রত্যাশা পূরণের খবর আসার আগের আধা ঘণ্টায় টানা আট দিন বৃদ্ধির পর বেশির ভাগ শেয়ার দর হারানোর ধারায় পড়তে যাচ্ছিল। অতি প্রতাশ্যার খবর ফের শেয়ারদর ঘুরে দাঁড়ায়। লেনদেনের প্রথম আধা ঘণ্টায় যেখানে সূচক ১৮ পয়েন্ট হারিয়েছিল। ওই অবস্থান থেকে টানা ৫৭ পয়েন্ট বেড়ে প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএএক্স ৫৪৭৫ পয়েন্ট ছাড়িয়েছে। এমনকি লেনদেন বেড়ে সাড়ে ১৩শ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা গত ৯ মাসের সর্বোচ্চ।

আরও পড়ুন

×