ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

নতুন অর্থবছরে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাজেটে ১০ অগ্রাধিকার

নতুন অর্থবছরে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাজেটে ১০ অগ্রাধিকার
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ | ১৫:৫১ | আপডেট: ১১ জুন ২০২৬ | ১৫:৫৪

সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে আগামী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আজ বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন তিনি।

মন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, দেশের অর্থনীতির মন্দার পাশাপাশি বৈশ্বিক অস্থিরতায় তৈরি হওয়া নতুন ঝুঁকিসমূহ মোকাবিলার প্রত্যয় কেন্দ্রে রেখেই আমরা এবারের বাজেটে স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সর্বোপরি ন্যায্যতাকে মূল বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করেছি, সামগ্রিক কৌশল নির্ধারণ করেছি।

আমির খসরু বলেন, আশা করি, এই পরিকল্পনা ও কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। একই সঙ্গে অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণের মাধ্যমে জনমিতিক লভ্যাংশ ও দীর্ঘজীবিতা লভ্যাংশের সুযোগ কাজে লাগিয়ে গণতান্ত্রিক লভ্যাংশও অর্জন করবে। সেই লক্ষ্যের আলোকে আগামী অর্থবছর মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা মানুষের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনতে চাই। 

এজন্য সরকার ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার বিবেচনায় রেখে বাজেট প্রস্তাব দাঁড় করিয়েছে বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।

১. সবার জন্য উন্নয়ন
আমাদের লক্ষ্য সর্বজনের, সর্বশ্রেণির, সর্বখাতের, সব অঞ্চলের সুষম অংশগ্রহণ ও অংশীদারত্ব নিশ্চিত করে বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা।

২. সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা
সব নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে বাস্তবমুখী, দক্ষতানির্ভর ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে যোগ্য মানবসম্পদে পরিণত করা। দ্বিতীয়ত, মৌলিক অধিকার হিসেবে সবার জন্য মানসম্মত সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

৩. সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা
সর্বজনীন জীবনচক্রভিত্তিক সুরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে সব বয়সের, সব স্তরের নাগরিকের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি মজবুত করা।

৪. বিনিয়োগনির্ভর, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি
পরিকল্পিত শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি এবং যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করা। কৃষিকে উৎপাদন, জীবিকা ও জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার কৌশলগত খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

৫. বিধিনিয়ন্ত্রণকরণ এবং সাশ্রয়ী ও সহজীকৃত ব্যবসার পরিবেশ

বিধিনিয়ন্ত্রণকরণের মাধ্যমে সরকারি কাজে বিলম্ব ও অপ্রয়োজনীয় ধাপ পরিহার করে একটি স্বচ্ছ, সহজ ও সাশ্রয়ী ব্যবসাসহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা।

৬. আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা

ব্যাংক ও আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করে আমানতকারীদের আস্থা এবং দায়বদ্ধতা ফিরিয়ে আনা। পুঁজিবাজারের সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগ উৎসাহ প্রদান।

৭. জ্বালানি নিরাপত্তা
উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ-জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আত্মনির্ভরশীল জ্বালানি নিরাপত্তা গড়ে তোলা।

৮. তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ

একটি ভবিষ্যৎমুখী, গতিশীল ও প্রকৃত অর্থে প্রযুক্তিগতভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান আইসিটি রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তর করা।

৯. প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে দেশকে রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় জনগণের অংশগ্রহণে বনায়নকে একটি সবুজ বিপ্লবে রূপান্তর, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পরিবেশগত বিবেচনার পাশাপাশি নদীসমূহের নাব্য ফিরিয়ে আনা এবং খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় শুরু করার মাধ্যমে একটি টেকসই, সবুজ ও পরিবেশ-সহনশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।

১০. স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা

টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি সরকারি বিনিয়োগ বাস্তবায়ন দক্ষ ও কার্যকর করে তোলা।

উল্লেখ্য, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিতব্য বাজেটে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। এটি মোট জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এই ঘাটতির বড় অংশই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মেটানোর প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা (জিডিপির ১২ দশমিক ৬ শতাংশ)। সংশোধিত বাজেটে আকার প্রাক্কলন করা হয় ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসাবে এবারের বাজেটের আকার বাড়ছে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা।

সাধারণত বাজেট ঘোষণার পরে দেখা যায় কিছু পণ্য ও সেবার দামে পরিবর্তন আসে। গত বছরের চেয়ে এ বছর বাজেটের আকার বাড়লেও বেশ কিছু পণ্যে উৎস কর, শুল্ক, ভ্যাট ও সারচার্জ বাড়ানো হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে। আবার কিছু কিছু খাতে করছাড় ও ভর্তুকির ফলে দাম কমবে পণ্যের।

এবারের বাজেট বক্তৃতায় কোন খাতে কর বাড়ছে, কোথায় করছাড় দেওয়া হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে এর কী প্রভাব পড়তে পারে- সেদিকে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও সাধারণ মানুষের নজর থাকবে।

আরও পড়ুন

×