শতকোটি টাকার সরঞ্জাম কার স্বার্থে
সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:১০
চট্টগ্রাম জেলার ১৬টি হাসপাতালে শতকোটি টাকায় কেনা নিম্নমানের শতাধিক
চিকিৎসা সরঞ্জাম অকেজো পড়ে আছে। চিকিৎসাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে
দিতেই উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালের জন্য এসব যন্ত্রপাতি কেনা হয়। তবে
এক্স-রে মেশিন, আলট্রাসনোগ্রাম, অ্যানেসথেসিয়া মেশিন, অটো অ্যানালাইজার,
ডেন্টাল ইউনিট ও অ্যাম্বুলেন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামাদি অকেজো পড়ে
থাকায় মফস্বলের অসচ্ছল রোগীরা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত কিংবা বাড়তি অর্থ
গুনতে বাধ্য হচ্ছেন। এক্স-রের জন্যও এখন তাদের উপজেলা থেকে ছুটে আসতে হচ্ছে
চট্টগ্রাম শহরে। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এসব সরঞ্জামে সাধারণ মানুষের কোনো
উপকার না হলেও একদল চিকিৎসক অবৈধ টাকার কুমির হয়েছেন।
নিম্নমানের এসব চিকিৎসা সরঞ্জাম কারা কিনছে, তা খতিয়ে দেখছে দুর্নীতি দমন
কমিশন। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে এমআরআই ও ডপলার মেশিন স্বাভাবিকের চেয়ে
চারগুণ বেশি দামে কেনার প্রমাণ পেয়েছে দুদক। নিম্নমানের সরঞ্জাম বাড়তি
দামে কিনে ৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এরই মধ্যে চট্টগ্রামের সাবেক
সিভিল সার্জনসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলাও করেছে দুদক।
জানা গেছে, চট্টগ্রামের ১৬ উপজেলায় কোন চিকিৎসা সরঞ্জাম কী অবস্থায় আছে, তা
জানতে চেয়ে সিভিল সার্জন অফিসে চিঠি পাঠিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ
মন্ত্রণালয়। চিঠি পেয়ে অকেজো জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জামের তালিকাও পাঠিয়েছে
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন অফিস। এ তালিকায় কোন সরঞ্জাম কখন কেনা হয়েছে,
বর্তমানে এটি সচল আছে কি-না, সরঞ্জাম পরিচালনার উপযুক্ত অবকাঠামো ও দক্ষ
জনবল আছে কি-না তাও উল্লেখ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে সদ্য বদলি হওয়া সিভিল
সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী এ তালিকা পাঠান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে।
ডা. আজিজুর রহমান সমকালকে বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে যন্ত্রপাতির যে তথ্য চাওয়া
হয়েছে, তা তিনি বদলি হওয়ার আগেই জমা দিয়েছেন। এসব যন্ত্রপাতির কোনটি কখন
কেনা হয়েছিল, তাও উল্লেখ করা হয়েছে।
কেনাকাটায় হরিলুট :জানা গেছে, এমআরআই যন্ত্রের বাজারমূল্য দুই কোটি ৮০ লাখ
টাকা হলেও সেটা কিনতে চট্টগ্রামের সাবেক সিভিল সার্জন ব্যয় দেখিয়েছেন নয়
কোটি ৯৫ লাখ টাকা। আবার চারটি কালার ডপলারের বাজারমূল্য এক কোটি আট লাখ
টাকা হলেও ব্যয় দেখানো হয়েছে দুই কোটি ৬০ লাখ টাকা।
দুদকের মুখপাত্র প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য জানান, ২০১৪ সালের ২৯ মে থেকে
২০১৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে এভাবে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে বিভিন্ন
যন্ত্রপাতি কেনার নামে ৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এ জন্য সিভিল
সার্জনসহ নয়জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সরঞ্জাম আছে, সেবা নেই :স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন
অফিসের পাঠানো তালিকায় দেখা যায়, চট্টগ্রাম জেলার প্রতিটি হাসপাতালে কোনো
না কোনো জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম অকেজো অবস্থায় আছে। এর মধ্যে এক্স-রে মেশিন
সচল আছে মাত্র পাঁচটি উপজেলায়। আনোয়ারা, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাঙ্গুনিয়া ও
সীতাকুণ্ডের জন্য কেনা এক্স-রে মেশিন 'মেরামতেরও অযোগ্য' বলে মন্তব্য করা
হয়েছে। এসব এক্স-রে মেশিন ৫ থেকে ১০ বছর আগে কেনা। এসব মেশিন থেকে ২০ থেকে
৩০ বছর নিরবচ্ছিন্ন সেবা পাওয়ার কথা। আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনেরও একই অবস্থা।
গুরুত্বপূর্ণ এ চিকিৎসা সরঞ্জাম সচল আছে সাত উপজেলায়।
জটিল অপারেশনে অপরিহার্য অ্যানেসথেসিয়া মেশিনও সচল নেই অনেক উপজেলায়।
আনোয়ারায় নয় বছর আগে কেনা মেশিনটিও অচল হয়ে পড়ে আছে। ২০১০ সালে মিরসরাইয়ের
জন্য কেনা অ্যানেসথেসিয়া মেশিনটি থেকেও সেবা পাচ্ছে না কেউ। সীতাকুণ্ডের
জন্য নয় বছর আগে কেনা মেশিনটিও পড়ে আছে অকেজো অবস্থায়।
জেলার ফটিকছড়ি, রাউজান ও সন্দ্বীপ উপজেলাতে নেই কোনো ডেন্টাল ইউনিট, সচল
আছে মাত্র পাঁচটিতে। হাটহাজারী, লোহাগাড়া, রাঙ্গুনিয়া, পটিয়া, সাতকানিয়া ও
সীতাকুণ্ডে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে ডেন্টাল ইউনিট। ২০০৭ সালে রাঙ্গুনিয়ার জন্য
কেনা ডেন্টাল ইউনিট এখন মেরামতেরও অযোগ্য বলে মন্তব্য করেছে সিভিল সার্জন
অফিস।
চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম অটো অ্যানালাইজার নেই জেলার দুই-তৃতীয়াংশ
উপজেলায়। পাঁচটি উপজেলায় এ মেশিন থাকলেও সচল আছে তিনটিতে। সাতকানিয়ার জন্য
২০১৩ সালের ১ মে ও চন্দনাইশের জন্য ২০১০ সালের ৮ আগস্ট অটো অ্যানালাইজার
কেনা হলেও তা থেকে কখনও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাননি মানুষ। গুরুতর অসুস্থ রোগীকে
উপজেলা থেকে শহরে আনতে অ্যাম্বুলেন্স কিনতেও হয়েছে নয়ছয়। রাঙ্গুনিয়ার জন্য
চার দফায় চারটি অ্যাম্বুলেন্স কেনা হয়। তবে সচল আছে মাত্র একটি।
