গণতন্ত্র, না কুলীনতন্ত্র?
এম হাফিজ উদ্দিন খান
প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:২৭
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিংবা সমাজ ব্যবস্থায় শক্তিশালী বিরোধী দলের
গুরুত্ব কতটা এর ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। ভারসাম্য রক্ষার
প্রয়োজনের স্বার্থেই শুধু নয়, রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের কল্যাণের জন্যও এর
প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক চিত্র কি এর বিপরীত নয়! জাতীয়
সংসদে গত কয়েক মেয়াদ ধরে বিরোধী পক্ষ হিসেবে যারা ভূমিকা পালন করছেন,
প্রকৃতার্থে বিরোধী রাজনীতিতে বিরোধী পক্ষ বলতে আমরা যা বুঝি এই অর্থে কি
তারা সংজ্ঞায়িত হতে পারেন কিনা, এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হতেই পারে। আবার মাঠ
পর্যায়ের রাজনীতিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বা ঐক্যফ্রন্ট কোণঠাসা। তাদের
নেতাকর্মীদের দমন-পীড়নের অভিযোগ নানা মহল থেকে বারবার উত্থাপিত হলেও সরকার
কিংবা সরকারদলীয় তরফে এই অভিযোগ বরাবরই প্রত্যাখ্যাত হয়ে আসছে। একাদশ জাতীয়
সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক হয়েছে ব্যাপক; কিন্তু ওই নির্বাচন সম্পন্ন করে
পূর্বতন সরকারি দলই সরকার গঠনের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা ধরে রাখে। বিরোধী
পক্ষ অর্থাৎ বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট কিংবা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনসহ
চলমান ইস্যুতে মুখে অনেক কথা বললেও প্রকৃত অর্থে কোনো আন্দোলনই গড়ে তুলতে
পারেনি তারা।
আমরা এও জানি, জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসনই হলো গণতন্ত্রের
অন্যতম পূর্বশর্ত; গণতন্ত্রের অঙ্গীকারও তাই। কিন্তু আমাদের দেশে এই বিষয়টি
বহু ক্ষেত্রেই হাস্যরসের যেমন খোরাক জোগায়, তেমনি আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে
আমাদের উদ্বিগ্নও করে সরকারি দলের কার্যকারণে। জনগণের শাসনের নামে দেশে
বিত্তবল, বাক্যবল, বাহুবলের নানারকম নেতিবাচক দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে
রয়েছে। গণতন্ত্রের চর্চা আমাদের রাষ্ট্রীয় পরিসরে ও রাজনৈতিক দলে নেই বললেই
চলে। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের এবং তৃণমূলের সম্মেলন
সম্পন্ন হয়েছে। এই সম্মেলনগুলোর মধ্য দিয়ে যেসব কমিটি ইতোমধ্যে গঠিত হয়েছে
এবং যে প্রক্রিয়ায় হয়েছে, তা কতটা গণতান্ত্রিক- এই প্রশ্ন তুললে অত্যুক্তি
হবে না। আবার এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের যে ক'টি অঙ্গ সংগঠনের কিংবা তৃণমূল
পর্যায়ে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে, এর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এখন পর্যন্ত গঠিত
হয়নি পূর্ণাঙ্গ কমিটি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হলেও তা হয়েছে শীর্ষ নেতাদের
পছন্দের ভিত্তিতে, গণতান্ত্রিক রীতিনীতি কিংবা পদ্ধতি অনুসারে নয়- এই
অভিযোগ খণ্ডানো সহজ নয়। তবে এমনটি নতুনও কিছু নয়। আর শুধু আওয়ামী লীগই-বা
কেন- বিএনপি, জাতীয় পার্টি এ দলগুলোর ক্ষেত্রেও আমাদের একই অভিজ্ঞতা।
বামধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে কখনও কখনও কিছুটা ভিন্নতা পরিলক্ষিত
হলেও সর্বাংশে তাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়।
অনেক আগে এথেন্সের খ্যাতনামা রাজনীতিবিদ পেরিক্লিস বলেছিলেন, 'আমাদের
শাসনকে গণতন্ত্র বলে চিহ্নিত করি এ জন্য যে, শাসনব্যবস্থার দায়িত্ব ন্যস্ত
রয়েছে বহুজনের ওপর। কতিপয় ব্যক্তির ওপর নয়।' একই সঙ্গে এরিস্টটল তার
পলিটিক্স গ্রন্থে লিখেছেন, 'সাধারণভাবে আমরা বলতে পারি, যে ব্যবস্থায়
প্রত্যেকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়নি, তা কুলীনতন্ত্র এবং যেখানে প্রত্যেকের
অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে, তা গণতন্ত্র।' প্রায় প্রতিনিয়ত উদ্ধৃত আব্রাহাম
লিঙ্কনের সংজ্ঞাও তো অনেকটা তেমনই। তিনি তার এক বক্তৃতায় বলেছেন, 'জনগণের
সরকার, জনগণের দ্বারা পরিচালিত সরকার এবং জনগণের স্বার্থে পরিচালিত সরকার
পৃথিবী থেকে মুছে যাবে না।' উল্লিখিত ব্যক্তিদের বক্তব্য গণতান্ত্রিক
বিশ্বে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে এখনও উচ্চারিত হয়ে থাকে। কিন্তু এর আলোকে যদি
আমাদের বিদ্যমান পরিস্থিতির ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ করি, তাহলে যেন কোনো কিনারা
খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রকৃতপক্ষে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা এমন এক সরকার
ব্যবস্থা, যেখানে জনগণ নিজেদের স্বাধীনভাবে মতামত প্রতিফলনের মাধ্যমে কিংবা
রায় দিয়ে সরকার গঠন করে শাসনব্যবস্থার পথ রচনা করে।
পেঁয়াজ,
চালসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। গোটা বাজারব্যবস্থা যেন
সিন্ডিকেটের মুঠোবন্দি। সড়ক পরিবহন আইন দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনা ও সব
পক্ষের মতামত নিয়ে প্রণয়ন করেও সরকার তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এ
রকম আরও বিষয় রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে জনগণের স্বার্থ সরাসরি সম্পৃক্ত। নানা
ক্ষেত্রে নানা ইস্যুতে জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি হলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে এসব
নিয়ে তেমন কোনো প্রতিবাদ নেই। জনস্বার্থের অনুকূলে রাজনীতিকদের দায়বদ্ধতা
যেন ক্রমেই শূন্যের কোঠায় গিয়ে ঠেকছে। জনগণ এত বিড়ম্বনা সইলেও
অফিসকেন্দ্রিক কিংবা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত
করা ছাড়া বিরোধীপক্ষের রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের যেন আর কোনো দায় নেই! এমন
প্রেক্ষাপটেই শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা বিশেষভাবে অনুভূত হয়। এই যে
পরিস্থিতি এবং এ ক্ষেত্রে রাজনীতিকদের যে ভূমিকা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা
গণতন্ত্রের সংজ্ঞাসূত্র মোতাবেক কীভাবে পর্যালোচিত হতে পারে- তাও প্রশ্নের
বিষয় বটে।
রাজনীতিতে যদি স্বচ্ছতা না থাকে, রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্তদের যদি
দায়বদ্ধতা-জবাবদিহি না থাকে, তাহলে জনকল্যাণ ও সমাজ এবং রাষ্ট্রের
শ্রীবৃদ্ধি হয় না। আইনের শাসন, ন্যায়বিচারের পথও মসৃণ হয় না। এত প্রত্যাশার
পরও আমাদের আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে এখনও চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়।
গণতন্ত্রের শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করতে আমরা এখন পর্যন্ত কতটা সক্ষম হয়েছি,
এও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। অথচ গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে আমাদের সমাজে যে চিৎকার
শোনা যায়, তা বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে অনেকের কাছেই মনে হয় অসাড়।
এই পোশাকী গণতন্ত্র তো জনগণের কোনো কল্যাণে আসছে না, রাজনীতির শ্রীবৃদ্ধি
করতে পারছে না। এই গণতন্ত্র গণতন্ত্র খেলায় আমরা নিজেদের কোথায় নিয়ে
যাচ্ছি, এর প্রতিফলন তো দেখতে পাচ্ছি জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয়
সরকার কাঠামোর বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন পর্যন্ত। আমরা কি এরিস্টটলের ভাষায়
'যে ব্যবস্থায় প্রত্যেকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়নি তা কুলীনতন্ত্র'- এই
অবস্থার মধ্যে আছি? এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন দাঁড়ায়, কোন শাসনকে গণতান্ত্রিক
শাসন বলে চিহ্নিত করি? 'সম্মতিভিত্তিক সরকার', 'জনগণের শাসন' ইত্যাদি
শব্দগুলো ব্যাখ্যা করলেও আমাদের বাস্তবতায় অসংখ্য অসঙ্গতি দৃষ্টিগ্রাহ্য
হয়ে ওঠে।
বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তা, সরকার ও সরকারি কর্মকর্তাদের কার্যধারা পর্যালোচনা
ও সমালোচনা তথা আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা গণতান্ত্রিক
ব্যবস্থায় স্বীকৃত। কিন্তু দুঃজনক হলেও সত্য, আমাদের সরকারের দায়িত্বশীলরা
গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে উচ্চকণ্ঠে কথা বলছেন বটে;
কিন্তু উপরোক্ত অধিকারের বিষয়গুলোর পথ কি এখন পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত মাত্রায়
মসৃণ করা সম্ভব হয়েছে? ভবিষ্যতে আমাদের দেশে গণতন্ত্রের অবস্থা কেমন থাকবে,
তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিশেষ করে নীতিনির্ধারকরা কীভাবে এ
ব্যাপারে ভাববেন, সিদ্ধান্ত নেবেন এর ওপর। তবে এ কথা মনে রাখা বাঞ্ছনীয়,
ভবিষ্যতে মূল প্রতিযোগিতা হবে অন্তঃকরণের, দৈহিক শক্তির নয়। প্রতিযোগিতা
হবে মেধার, পেশির নয়। আমাদের তরুণরা দেশের প্রচলিত ধারার রাজনীতির প্রতি
বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছে- এমন খবর সংবাদমাধ্যমেই জেনেছি। আমি মনে করি, এটি
আমাদের জন্য সুবার্তা আবার চিন্তারও কারণ বটে। সুবার্তা এ জন্য বলছি, আজকের
তরুণরা যারা ভবিষ্যতের কর্ণধার তাদের রাজনীতি নিয়ে যে অনুভূতির প্রকাশ
ঘটেছে, তাতে যদি আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বোধোদয় ঘটে, তবে সুফল আশা করা
যায়। আর চিন্তার কারণ এ জন্য, আজকের তরুণরা রাজনীতিবিমুখ হলে আমরা ভবিষ্যৎ
নেতৃত্ব পাব কোথায়?
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা; সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন
- বিষয় :
- রাজনীতি

