করোনা: এখনো সব শেষ হয়ে যায়নি
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ০১ মে ২০২০ | ১০:৩২ | আপডেট: ০১ মে ২০২০ | ১৩:৩৬
বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। সে হিসেবে দেশে করোনা প্রাদুর্ভাবের বয়স গত ২৩ এপ্রিল ৪৫ দিন হল। সম্ভবত এ উপলক্ষেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ওই দিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে (এখন যাকে বলা হচ্ছে স্বাস্থ্য বুলেটিন) হাজির হন।
সেখানে তিনি বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কিছু দেশের ৪৫ দিনের করোনা পরিস্থিতি তুলনা করে কিছু তথ্য দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যখন ৪৫ দিনে করোনা রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১৮৬, করোনার কারণে মৃত্যু হয়েছে ১২৭ জনের, তখন যুক্তরাষ্ট্রে একই ধরনের রোগী ছিল ১,২০,০০০, আর এর কারণে মৃত্যু হয়েছে ২৪,০০০ মানুষের। তিনি আরও বলেন, একই সময়ে ইতালিতে এ সংখ্যাগুলো ছিল যথাক্রমে ১,৩০,০০০ ও ১১,০০০এবং স্পেনে ছিল ১,০০,০০০ ও ১০,০০০।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যগুলোর সত্যতা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এমনকি, এসব তথ্যের ভিত্তিতে তিনি যে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি অন্য অনেক দেশের তুলনায় শুধু ভাল নয়, বেশ ভালো তার সাথেও দ্বিমত করা যাবে না। দ্বিমত এ কারণেও করা যাবে না যে, অনেকেই যাদের মধ্যে এমনকি মিডিয়ার কল্যাণে ইতিমধ্যে বিশেষজ্ঞ বলে পরিচিতি পাওয়া অনেক চিকিৎসকও আশঙ্কা করেছিলেন, এপ্রিলে এখানে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেবে। কেউ কেউ টি এস এলিয়টের বিখ্যাত উক্তি ‘এপ্রিল ইজ দ্য ক্রুয়েলেস্ট মান্থ’- উদ্ধৃত করে এমনও বলেছিলেন, শুধু যে রোগীর সংখ্যা ভয়াবহ হারে বাড়বে তা নয়, রাস্তায় লাশ পড়ে থাকবে কেউ ফিরেও তাকাবে না। কিন্তু বাস্তবতা হল, এখানে মার্চ মাস জুড়ে করোনার যে ‘রাইজিং কার্ভ’ দেখা যাচ্ছিল তা ইতিমধ্যেই ‘প্ল্যাটু’ বা উত্থান-পতনের চেহারা নিয়েছে, যা ডাউনওয়ার্ড ট্রেন্ড বা নিন্মমুখী প্রবণতার আগের ধাপ।
যদি চলমান সতর্কতামূলক ব্যবস্থাগুলো সামনের দিনগুলোতেও ঠিকঠাক বজায় থাকে, বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশিষ্ট ভাইরলজিস্ট প্রফেসর নজরুল ইসলাম ২৮ এপ্রিল ৭১ টিভি’র ৭১ সংযোগ অনুষ্ঠানে যেমনটা বলেছেন, এ কার্ভটি নিচের দিকেই নামতে থাকবে। অর্থাৎ দেশে করোনার উপদ্রব কমে আসবে। মনে রাখতে হবে, করোনা রোগীর ৮৭ ভাগ ঢাকা বিভাগে, বাকি মাত্র ১৩ ভাগ সাতটি বিভাগে। অর্থাৎ, প্রাণঘাতি ভাইরাসটি এখনও দেশের কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ, বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ছড়ায়নি।
ইতিবাচক সম্ভাবনা সত্ত্বেও, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথায় খুব কম লোকই আশ্বস্ত হচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। তিনি মানুষকে করোনা নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু মানুষ, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি তার কথায় ভরসা পাচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তো বটেই, এমনকি মূলধারার গণমাধ্যমের দিকে তাকালেও বিষয়টা স্পষ্ট ধরা পড়ে। সেখানে প্রাধান্য পাচ্ছে নানা রকম শঙ্কা আর হতাশার চিত্র। যারা এপ্রিলকে ‘নিষ্ঠুরতম’ মাস বলেছিলেন তারা এখন বলছেন মে মাসের কথা। অর্থাৎ এপ্রিলে করোনা তাণ্ডব চালাবে বলে তারা যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তা নাকি মে মাসে দেখা যাবে। আর এসব ভেবে ভেবে মধ্যবিত্ত একদিকে ভয়ে সিটিয়ে যাচ্ছে, আরেকদিকে কখনও সরকারকে গালাগাল দিচ্ছে কখনও গরিব মানুষকে, যারা পেটের দায়ে ঘরের বাইরে আসছে।
দেশে করোনা এখনও নিয়ন্ত্রণে থাকার পেছনে এ পর্যন্ত গৃহীত সরকারি পদক্ষেপগুলোর ভূমিকা অস্বীকার করা যাবে না। তবে এটাও স্বীকার করতে হবে যে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চে করোনা মোকাবেলায় যেসব প্রস্তুতির কথা আমাদেরকে শুনিয়েছিল তার বেশিরভাগ ওই ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। শুধু যে করোনা টেস্ট সীমিত ছিল তা নয়, করোনা চিকিৎসার জন্য ‘নিবেদিত’ হাসপাতালগুলোও ছিল অপ্রস্তুত। বাস্তবে, মার্চেও শেষ সপ্তাহে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করার পর থেকে করোনা-মোকাবেলা কার্যক্রমের উন্নতি হতে থাকে। এখনও স্বাস্থ্য অধিপ্তরের বক্তব্যের সাথে মাঠের চিত্রের বেশ ফারাক আছে। মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসেবে করোনা দুর্যোগ মোকাবেলায় নেতৃত্বদানে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই যে ব্যর্থতা তা মানুষকে শুধু হতাশ নয়, বিক্ষুব্ধ করেছে। তাই তাঁর ওই আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বানে মানুষ আস্থা রাখতে পারছে না।
এখানে আরও একটা বিষয় বলা দরকার তা হল, করোনা-সংক্রমণ প্রাথমিক পর্যায়ে রাখার অন্তত দুটো সুযোগ আমরা কাজে লাগাইনি অথবা লাগাতে পারিনি। করোনা এখানে এসেছে মূলত ইউরোপ থেকে। মার্চ মাসের শুরুর দিকে, তখন করোনার এপিসেন্টার বলে ঘোষিত, ইতালি থেকে দলে দলে প্রবাসীরা আসছিল। সিদ্ধান্ত ছিল তাদেও সবাইকে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে রাখার। কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। আমরা সবাই তখন ওই প্রবাসীদেরকে দোষ দিয়েছি বটে আশকোনার হাজীক্যাম্পে না থাকতে গোঁ ধরার জন্য। তবে পরে জানা গেছে, ওখানে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। অন্তত তেমনটা ছিল না যেমনটা আছে মার্চের শেষ দিকে লকডাউন ঘোষণার পর ওই ক্যাম্পের দায়িত্ব সেনাবাহিনী নেওয়ার পর থেকে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওই ব্যর্থতার কারণেই পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় প্রশাসনকে লিস্ট ধরে ধরে, যা অনেকাংশেই ছিল ত্রুটিপূর্ণ, প্রবাস ফেরত ব্যক্তিদেরকে হোম কোয়ারেন্টাইনে বাধ্য করতে হয়েছে। এতে করে দেখা গেছে, কোথাও প্রবাসী এসেছেন ৫০০ জন, কিন্তু কোয়ারেন্টাইনের জন্য খুঁজে পাওয়া গেছে ৭০ জনকে। বাকিরা প্রধানত ঢাকা শহরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সবার জানা আছে, বিশেষ কওে ইউরোপবাসী প্রবাসীদের মধ্যে অনেকেরই ঢাকায় বাড়ি বা ফ্লাট আছে। অনেকের পরিবার বা নিকটাত্মীয় ওইসব বাড়ি বা ফ্লাটে থাকে। আজকে যে ঢাকা এবং তার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ করোনার এপিসেন্টার হয়ে গেল, যেখান থেকে সিংহভাগ জেলায় রোগটি ছড়াল এবং যার পরিণতিতে ঢাকা বিভাগ দেশের ৮৭ ভাগ করোনা রোগীর আবাসস্থল হয়ে ওঠল, তা ওই ব্যর্থতারই ফল।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যখন প্রবাস-ফেরত প্রায় সবাইকে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠাচ্ছিল তখনই নানা মহল থেকে এর সমালোচনা হয়েছিল। কিন্তু অধিদপ্তরের কর্তাব্যক্তিরা তখন যুক্তি দিয়েছেন যে, হোম কোয়ারেন্টাইনের ধারণা সব দেশে আছে। তারা বিশেষ করে চীনের উদাহরণ দিয়েছেন। কিন্তু ঘটনাক্রম থেকে দেখা যায় যে, চীন যখন করোনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছিল তার আগেই রোগটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তা মোকাবেলায় তাদের পক্ষে ব্যাপক হারে প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন করা তখন সম্ভব ছিল না। এর চেয়েও বড় কথা হল, চীন একটা অতি রেজিমেন্টেড রাষ্ট্র। সেখানে সমাজের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ খুব শক্ত। অন্যদিকে, আমাদের রাষ্ট্র ‘ত্রুটিপূর্ণ’ হলেও গণতন্ত্র চর্চা করে; পান থেকে একটু চুন খসলেই এখানে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ঝড় বয়ে যায়।
তাছাড়া, শুধু সমাজ নয় মাঠ-প্রশাসনের ওপরও তার নিয়ন্ত্রণ বেশ শিথিল। ফলে চীনে যেভাবে সরকার নাগরিকদেরকে হোম কোয়ারেনটাইনে রেখে তাদের সবার জন্য খাবার ও অন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রি সরবরাহ করেছে, কিংবা কোথাও এমনকি দিনের পর দিন খাবার না দিলেও নাগরিকেরা চুপ থেকে তা মেনে নিয়েছে, আমাদের এখানে তা সম্ভব নয়। এ কারণেই হোম কোয়ারেন্টাইন কর্মসূচি এখানে, অনেকাংশেই, প্রহসনে পরিণত হয়েছে।
২৪ মার্চ সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর যদি সম্ভাব্য হটস্পটগুলো কড়াভাবে লকডাউন করে দেওয়া হতো তাহলেও এতদিনে করোনা কার্ভ নিন্মমুখী হয়ে যেতো বলে অনেকের ধারণা। তাদের এ ধারণা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, তখনও করোনা হটস্পট বলতে ছিল ঢাকার টোলারবাগ, বাসাবো আর নারায়ণগঞ্জ। এ এলাকাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন কাজ ছিল না। কিন্তু আর সব কাজের মতো লকডাউন বাস্তবায়নেও শৈথিল্যের কারণে এসব এলাকা থেকে করোনা খুব দ্রুত ঢাকার বিভিন্ন এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে।
যা হোক, আগের কাজগুলো ঠিকঠাক করতে পারিনি বলে যে সব শেষ হয়ে গেছে তা নয়। এটুকু তো স্পষ্ট যে, লকডাউন যতটুকু বাস্তবাযন করা গেছে করোনা কার্ভটিকে চোখা পর্বত হতে না দিয়ে সমতল পর্বতের রূপ নিতে বাধ্য করার জন্য যা খুব গুরুত্বপূর্ণ ততটুকু সুফল আমরা পেয়েছি। আবার এটাও স্পষ্ট যে, আমাদের মতো দেশে, যেখানে শ্রমশক্তির ৮৫ ভাগেরও বেশি অসংগঠিত সেক্টরে নিয়োজিত, অর্থাৎ শ্রমশক্তির বিপুল অধিকাংশকে দিন এনে দিন খেতে হয়, লম্বা সময় ধরে লকডাউন ধরে রাখা সম্ভব নয়। তাই তৈরি পোশাক শিল্পসহ কিছু কিছু ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি খুলে দিতে হয়েছে, ঝুঁকির কথা মাথায় রেখেই ভাবতে হচ্ছে কীভাবে গণপরিবহন চালু করা যায়।
আমাদেরকে এখন যেমন সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি ঢালাও লকডাউন না করে হটস্পটগুলোকে নিয়ন্ত্রিত রাখার কার্যকর পন্থা বের করতে হবে। আর ব্যাপক টেস্টের মাধ্যমে সংক্রমিত মানুষদেরকে চিহ্নিত করে তাদের যথাযথ আইসোলেশন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করার কথা তো বলাই বাহুল্য।
- বিষয় :
- সাইফুর রহমান তপন
- করোনাভাইরাস