ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

শুভ জন্মদিন মহারাজ

শুভ জন্মদিন মহারাজ
×

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ

ফয়সাল আহমেদ

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২০ | ১২:০০

ব্রিটিশ শাসকদের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া বিপ্লবী ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী। লোকে যাকে মহারাজ বলে ডাকে। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের কারণে অগ্নিযুগে যে কয়েকজন মানুষ ভারতবর্ষে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন, ব্রিটিশ শাসকদের ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী তাদের অন্যতম। বাংলার নির্যাতিত-নিপীড়িত, মুক্তিকামী মানুষের প্রিয় মহারাজের জন্ম ১৮৮৯ সালের ৫ মে তদানীন্তন ময়মনসিংহ জেলা, বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার কাপাসাটিয়া গ্রামে। এক সল্ফ্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম হয় তার।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন এক পাতানো যুদ্ধে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে ইংরেজরা ভারতবর্ষে ক্ষমতায়িত হয়। চূড়ান্তভাবে স্বাধীনতা হারায় ভারতবাসী। ছিনিয়ে নেওয়া সেই স্বাধীনতা ব্রিটিশদের কাছ থেকে ফিরিয়ে আনতে জীবনের সবটুকু সময় বিসর্জন দিয়েছেন ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী। বছরের পর বছর জেলে বন্দি থাকা থেকে শুরু করে অসহনীয়, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সইতে হয়েছে তাকে। তবু আদর্শিক অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্র সরে আসেননি। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আবার বিপুল উদ্যমে সংগঠনের কাজ করেছেন অকুতোভয় মহারাজ।

মহান এই বিপ্লবীকে সবাই পছন্দ করতেন। প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা পর্যন্ত তাকে সমীহ করতেন। উদ্দেশ্য এক হলেও অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের মধ্যে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য বিরোধ ছিল। কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ে মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল না। অসাধারণ এক ব্যক্তিত্বগুণে তিনি তা অর্জন করেছেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর মতো বিশ্ববরেণ্য নেতারা তাকে স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন। মহারাজকে শ্রদ্ধা করতেন বাংলার আরেক স্বাধীনতাকামী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী কেবল বিপ্লবী ছিলেন না। তিনি একাধারে লেখক, কবি, চিন্তাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক। তিনি যেমন কবিতা লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন গীতার ভাষ্য। লিখেছেন জেলখানার অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও সংকট নিয়ে। স্কুলের জন্য পাঠ্যবইও রচনা করেছেন। সবকিছু ছাপিয়ে 'জেলে ত্রিশ বছর ও পাক-ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম' বইটির জন্য তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। কালের বিবর্তনে গ্রন্থটি অগ্নিযুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠেছে। ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাস জানতে হলে বইটির পাঠ আবশ্যিক।

অসামান্য দেশপ্রেমিক এই মানুষটি ব্রিটিশ শাসনের সময় তিরিশ বছর জেল খেটেছেন। আত্মগোপনেও থেকেছেন পাঁচ-ছয় বছর। এর পর স্বাধীন দেশেও তাকে অত্যাচার- নির্যাতন সইতে হয়েছে। পাকিস্তান সরকার তাকে কারান্তরীণ করেছে। আজীবন অকৃতদার মহারাজ মানুষের জন্য একটি গণতান্ত্রিক সমাজ, উন্নত সমাজ নির্মাণের জন্য আমৃত্যু লড়াই করেছেন।

জীবনসায়াহ্নে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারত যান ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী। প্রথমে অসম্মতি জানালেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ তদারকিতে ভিসা দিতে সম্মত হয় পাকিস্তান সরকার। ১৯৭০ সালের ২৪ জুন যশোরের বনগাঁ সীমান্ত দিয়ে মহারাজ ভারতে প্রবেশ করেন। এ সময় সীমান্তে উপস্থিত ভক্তরা অশ্রুসজল নয়নে তাকে বিদায় জানান। ভারতে পৌঁছে নানা অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। পুরোনো বন্ধু, সহযোদ্ধা, আত্মীয়-স্বজনদের সাথে দেখা করেন। সফরে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ হয় ভারতের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সঙ্গে। সেখানে পাকিস্তানি শাসক দ্বারা নির্যাতিত পূর্ব-বাংলার মানুষের পাশে থাকার জন্য ভারতের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানান। তবে সে আহ্বান প্রকাশ্যে ছিল না। পূর্ব বাংলার স্বাধীনতাকামী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে তিনি আলোচনা করেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। তার পাশে থাকার জন্য তাদের পরামর্শ দেন মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ।

হয়তো তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আর সময় নেই, তাই সবকিছু দ্রুত চালিয়ে যান। প্রায় ৪৭ দিনের ভারত সফরের প্রতিটি দিন পার করেছেন ব্যস্ততার সঙ্গে। ভারতের পার্লামেন্টে তিনি ভাষণ দেন। মৃত্যুর তিন দিন আগে ১৯৭০ সালের ৬ আগস্ট দিল্লির পার্লামেন্টে এমপিদের সংবর্ধনার উত্তরে তিনি এই ভাষণ প্রদান করেন। মহারাজ সেদিন বাংলা ভাষাতেই ভাষণ রেখেছিলেন। এর ঠিক দুই দিন পর ভারতের স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে ৯ আগস্ট রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অনন্তের পথে পাড়ি জমান মহারাজ। মহান সেই বিপ্লবীর জন্মদিনে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক ও গবেষক
[email protected]

আরও পড়ুন

×