ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

রমজান মাস

বাজার নিয়ন্ত্রণে ভোক্তাবান্ধব নীতি চাই

বাজার নিয়ন্ত্রণে ভোক্তাবান্ধব নীতি চাই
×

এস এম নাজের হোসাইন

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২০ | ১২:০০

বৈশ্বিক করোনা মহামারি আক্রমণের মধ্য দিয়ে পবিত্র মাহে রমজান শুরু হয়েছে। পবিত্র রমজানে ব্যবহার্য সব পণ্যের বিপুল আমদানি হলেও ইতোমধ্যেই নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যর দাম বাড়িয়ে দিয়েছে ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অসাধু ব্যবসায়ী-সিন্ডিকেট রমজান শুরুর দুই-তিন মাস আগেই পরিকল্পিতভাবে রমজাননির্ভর নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। আর এতে করে রমজানে পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে এমন অভিযোগ থেকে তারা রেহাই পান। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে বাজারে প্রচলিত জেলা প্রশাসন, ডিএমপি, র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বাজার অভিযান পরিচালিত হলেও এর সুফল পাচ্ছেন না ভোক্তারা। উল্টো বেড়েই চলেছে নিত্যপণ্যের মূল্য। সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যাচ্ছে, আদা, রসুন, ডাল, ছোলা, খেজুরের দাম এখন আকাশছোঁয়া। গত বেশ কয়েক মাস ধরে পেঁয়াজের বাজার বেশ অস্থির ছিল। সব ধরনের মাছ বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। বেড়েছে চাল, চিনি, ময়দা, আটা, ছোলা ও বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম। দুই মাস ধরে এ ধারা অব্যাহত থাকলেও গত দুই সপ্তাহে বেড়েছে সবচেয়ে বেশি।

সরকারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার মনিটরিং ও বাজারদর সহনশীল রাখতে যে সমস্ত উদ্যোগ নিতে দেখা যায়, তার সবক'টিই ব্যবসায়ীনির্ভর। বাণিজ্যমন্ত্রী নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে যত সভাই করেন, সবগুলোতে ব্যবসায়ী ও গুটিকয়েক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্তা। ভোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব তো নেই, অন্য কোন শ্রেণিকেও আমন্ত্রণ জানানো হয় না। স্বাভাবিক কারণে ব্যবসায়ীদের স্বার্থহানি হয় এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত তারা নেবেন না।

উন্নত বিশ্বে ভোক্তারা পণ্যের নিয়ামক হলেও বাংলাদেশে তার পরিস্থিতি উল্টো। এখানে আমদানিকারক, খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরাই পণ্যের মূল। তারা যা বাজারজাত করবে, ভোক্তারা তাই হজম করতে বাধ্য। কারণ এখানে ভোক্তাদের পছন্দ-অপছন্দের কোনো সুযোগ নেই। প্রয়োজনীয় সচেতনতা ও শিক্ষার অভাবে বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্রেতা-ভোক্তা তাদের অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন নয়, অধিকন্তু অধিকাংশ ভোক্তা আসল-নকল চিহ্নিত করে সঠিক পণ্য পছন্দ করার যোগ্যতা অর্জনে সক্ষম হয়নি। সরকার এবং বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বাংলাদেশে ভোক্তা আন্দোলন গতি পায়নি। ফলে ভোক্তারা প্রতি পদে পদে ঠকছে। আর এ জন্য ব্যবসায় সুস্থ ধারার বিকাশ সম্ভব হচ্ছে না। সে কারণে এখানে ফটকাবাজ, মৌসুমি ব্যবসায়ী, অসৎ ধান্দাবাজ ব্যবসায়ীর আবির্ভাব ঘটেছে।

ভোক্তাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্বের অধিকার হরণ আরেকটি চরম অধিকার বঞ্চনা। বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত যে কোনো নীতিনির্ধারণী কথা এলেই সব জায়গায় অসম অংশগ্রহণ এবং সব ক্ষেত্রেই যাদের জন্য নীতি প্রণয়ন করা হচ্ছে, তাদের অংশগ্রহণ থাকে নামমাত্র। যেমন- আঞ্চলিক সড়ক পরিবহন কমিটি, বাস ভাড়া নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নে যাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব নেই। এখানে বাস মালিক, শ্রমিক ছাড়া কিছু সরকারি কর্মকর্তা প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন। সে কারণে যাত্রীদের প্রকৃত সমস্যা উদ্ঘাটনের পরিবর্তে এখানে বাস মালিকদের স্বার্থই রক্ষা করা হয়। ঠিক একইভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ, মূল্য নির্ধারণবিষয়ক যে কোনো সভায় শুধু ব্যবসায়ী ও সংশ্নিষ্ট সেক্টরের সরকারি কর্মকর্তারাই অংশ নিয়ে থাকেন। এখানে ভোক্তাদের অংশগ্রহণ নেই। এসব নীতিনির্ধারণী সভায় শুধু ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব থাকার কারণে সাধারণ ভোক্তা বা জনগণ তাদের সমস্যা ও ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরতে পারেন না। আর সে কারণেই এসব নীতিনির্ধারণী সভা অনেকটাই ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যস্ত থাকেন। ফলে জনগণের স্বার্থ ও অধিকার এখানে পুরোপুরি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। অথচ ভোক্তা সংরক্ষণ আইন ২০০৯ অনুযায়ী এফবিসিসিআই ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব করছে এবং ক্যাব ভোক্তাদের প্রতিনিধি হলেও সরকারের অধিকাংশ নীতিনির্ধারণী ফোরামে ক্যাবকে সে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না, যা ভোক্তা অধিকার আইনের লঙ্ঘন।

তাই এখন প্রয়োজন ভোক্তাদের সত্যিকার অর্থে ক্ষমতায়ন। ক্রেতা-ভোক্তা হিসেবে নিজেদের ইচ্ছামতো, আসল-নকল পরখ করে পণ্য ক্রয়ের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বাড়ানো গেলে ভোক্তা হিসেবে তাদের সচেতনতা ও পণ্যের মান সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রদান করা গেলে এ ভোগান্তির মাত্রা অনেকাংশেই লাঘব সম্ভব। কাজেই এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মাঝে বৈষম্য দূর করতে ভোক্তা সংগঠনগুলোর প্রতি সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো জরুরি। সরকার ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতো ভোক্তা সংগঠন, বিশেষ করে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও শাখাগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে প্রতিনিধিত্ব ও সমন্বয় সাধনে সক্ষমতা বাড়ানো, ভোক্তাদের মাঝে সচেতনতা ও শিক্ষা প্রদান করে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মাঝে ব্যবধান হ্রাস, নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য, সেবা সার্ভিসসহ ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণ বিষয়ে সরকারের সব নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পাশাপাশি ভোক্তা অধিকার সংগঠনের সমঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলেই ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া আধিপত্য ও প্রভাব খর্ব হবে। তখনই জনগণ তথা সাধারণ ভোক্তারাই অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হবে।

ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)
[email protected]


আরও পড়ুন

×