ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক এম শামসুল আলম

নাইকো দুর্নীতিতে জড়িতদের কাছ থেকেও ক্ষতিপূরণ আদায় করা দরকার

নাইকো দুর্নীতিতে জড়িতদের কাছ থেকেও ক্ষতিপূরণ আদায় করা দরকার
×

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : সাইফুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২০ | ১২:০০

নাইকো অর্থ স্থগিত, ক্ষতিপূরণ দাবি, সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও নাইকো চুক্তি বাতিল মামলার বাদী অধ্যাপক এম শামসুল আলম। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতকে পর্যবেক্ষণ করছেন এ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ। তিনি বর্তমানে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে কর্মরত আছেন এবং ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে বিস্টেম্ফারণের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় ব্রিটেনের বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত (ইকসিড) সম্প্রতি যে রায় ঘোষণা করেছে, সে বিষয়ে সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি

সমকাল : বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত বা ইকসিডে এক দশকের আইনি লড়াইয়ের পর নাইকো মামলায় রায় পেয়েছে বাংলাদেশ...

এম শামসুল আলম : নাইকো চুক্তি বাতিলের জন্য ২০০৬ সালে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। অনেক আন্দোলন হয়েছে। তখন উচ্চ আদালতে মামলা হয়েছে, সেই মামলা খারিজও হয়েছে। ওই সময় বলা হয়েছিল, বিদেশিদের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি অবৈধ ও দেশের স্বার্থবিরোধী হলেও এগুলো বাতিল করা যায় না। একটা সার্বভৌম সরকারের প্রতিনিধিদের থেকে এ ধরনের বক্তব্য প্রত্যাশিত ছিল না। এটা জাতীয় সক্ষমতার পরিচয় বহন করে না। সরকারের তরফ থেকে এসব বক্তব্য সক্ষম জাতি হিসেবে আমাদের জন্য বেদনাদায়ক ছিল। এক ধরনের নীতি ছিল যে, এ ধরনের চুক্তি হয়, কিন্তু বাতিল হয় না। এটাই আমাদের নিয়তি। এভাবেই আমরা মানতে বসেছিলাম। এই রায় সেই ধারণাকে বাতিল করে দিয়েছে।

সমকাল : টেংরাটিলা, ফেনী ও কামতা গ্যাসক্ষেত্রকে 'প্রান্তিক' দেখিয়ে সেখান থেকে গ্যাস তোলার জন্য নাইকো-বাপেক্স যৌথ উদ্যোগের জন্য প্রস্তাব দেয়। আসলেই কী এসব গ্যাসক্ষেত্র প্রান্তিক ছিল?

এম শামসুল আলম : প্রথমত, ছাতক গ্যাসক্ষেত্রের ইস্টে প্রায় ৪৭৪ বিসিএফ গ্যাস মজুদ ছিল। আশির দশকে ৮৫ বিসিএফ গ্যাস তোলার পর পানি ও বালু ওঠার কারণে গ্যাস উত্তোলন স্থগিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে ওই গ্যাসফিল্ডের উন্নয়ন করে গ্যাস উত্তোলন করা হয়। তাহলে সেটাকে কীভাবে পরিত্যক্ত বলা যায়? দ্বিতীয়ত, প্রথম যে খসড়া চুক্তি করা হয়েছিল সেখানে ছাতক ইস্ট ছিল না। ছাতক ওয়েস্ট ছিল। এর পাশাপাশি ছিল ফেনী ও কামতা। পরে কামতা গ্যাসক্ষেত্রকে বাদ দিয়ে ছাতক ইস্ট যুক্ত করা হয়। চুক্তির চূড়ান্ত খসড়ায় ছাতক ইস্টকে যুক্ত করা হয় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য একজন ব্যারিস্টারের ল' ফার্মের আইনি মিটিংয়ের ভিত্তিতে। ওই সময় সম্ভাবনাময় গ্যাসফিল্ডকে আইনি মারপ্যাঁচে প্রান্তিক গ্যাসফিল্ডের তালিকায় যুক্ত করে চুক্তির আওতাভুক্ত করা হয়েছিল। চুক্তির প্রথম দিকে শর্ত ছিল নাইকোর প্রস্তাবের যথার্থতা একটা মানদণ্ডে যাচাই-বাছাই করা হবে। সেখানেও জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে নাইকোকে সুবিধা দেওয়া হয়। এ ছাড়া, সুবিধাভোগী নাইকোকেই পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়েছিল এই গ্যাসক্ষেত্র প্রান্তিক কিনা। সুতরাং এগুলোকে প্রান্তিক বা পরিত্যক্ত বলা প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।

সমকাল : তার মানে, তৎকালীন সরকারই চেয়েছিল জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে?

এম শামসুল আলম : এসব চুক্তির ক্ষেত্রে একটি প্রসিডিউরের কথা বলা হয়েছিল। সেই কাজটি ২০০১ সালে তিনজন সচিবকে দিয়ে করা হয়েছিল। সেই প্রসিডিউরে কোনো কারিগরি মানদণ্ড বলে কিছু দেওয়া নেই। এই প্রসিডিউরকে জাল দলিলের সমতুল্য বলা যায়। সেই প্রসিডিউরের দোহাই দিয়ে নাইকোকে সম্ভাবনাময় তিনটি গ্যাসফিল্ড প্রদান করা হয়। এর পেছনে কোনো আইনি বা কারিগরি ভিত্তি নেই।

সমকাল : ২০১০ সালে বিস্টেম্ফারণের ঘটনায় দায়ী নয় মর্মে ঘোষণা চেয়ে ইকসিডে একটি সালিশি মোকদ্দমা দায়ের করে নাইকো। বিস্টেম্ফারণের ঘটনায় বাংলাদেশের মামলা না করার কারণ কী?

এম শামসুল আলম : এ চুক্তি অসৎ উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল তা যেমন সত্য, তেমনি নাইকোকে নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হচ্ছিল, সেটাও সত্য। নাইকোর মামলায় ২০১৫ সালে বাংলাদেশ হেরে যাওয়ার বিষয়টি এসব বিষয়ের সুস্পষ্ট প্রমাণ। সরকার সে মামলা পরিচালনায় যে আইনজ্ঞ বা কৌঁসুলি নিয়োগ করেছিল, পরে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

সমকাল : আর যারা চুক্তির সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের কী হয়েছিল?

এম শামসুল আলম : ইকসিডের রায়ে বলা হয়েছে, কূপ খননে স্ট্যান্ডার্ড ফলো না করায় বিস্টেম্ফারণ ঘটেছে। এটা দুর্ঘটনা নয়। এমনকি তাদের কূপ খননের কোনো ডিজাইন ছিল না এবং ডিজাইনের কোনো অনুমোদনও ছিল না। নাইকোর অবহেলা, অদক্ষতা ও অযোগ্যতার কারণেই বিস্টেম্ফারণ ঘটে। ফলে বিস্টেম্ফারণের দায় সম্পূর্ণভাবে নাইকোর। এ বিষয়টির সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় আমাদের তদন্ত প্রতিবেদনে। ইকসিডেও এ কথাটিই বলা হয়েছে। এমন প্রমাণ থাকার পরও নাইকোর সঙ্গে চুক্তি বহাল রেখে তাকে বিচারের ঊর্ধ্বে রাখা হয়। যারা এসব দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, ন্যায়বিচারের স্বার্থে তাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।

সমকাল : ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায়ে বাংলাদেশের করণীয় কী?

এম শামসুল আলম : ইতোমধ্যে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত মামলার আওতায় নাইকোর সব সম্পত্তি ও বিল জব্দ করে রেখেছেন। অভ্যন্তরীণ আইনিীপ্রক্রিয়ায় সেই সম্পত্তিগুলো বাজেয়াপ্ত করা যেতে পারে। এ ছাড়া পুরো অর্থ আদায়ের জন্য ইকসিডে যাওয়া যেতে পারে। আমি মনে করি, নাইকো চুক্তির সঙ্গে যারা জড়িত, যারা নাইকোকে সুরক্ষা দিয়ে বিচারের ঊর্ধ্বে রেখে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করেছেন, তাদের কাছ থেকেও ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায় করা দরকার।

সমকাল : বিস্টেম্ফারণের ঘটনায় পরিবেশসহ অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ট্রাইব্যুনালে উত্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে ইকসিড। এটি কীভাবে নিরূপণ হতে পারে?

এম শামসুল আলম : পুড়ে যাওয়া এই গ্যাস ১০-২০ বছর ধরে ব্যবহার হতো। এই গ্যাস ব্যবহার করে যে ভ্যালু অ্যাড হতো এবং গত প্রায় এক যুগে যে হারে গ্যাসের মূল্য বেড়েছে, সে বিষয়টিও মূল দামের সঙ্গে সমন্বয় করে নিতে হবে। ওই এলাকার পরিবেশগত যে ক্ষতি হয়েছে, তা নির্ধারণ করা দরকার। বিপুল পরিমাণ গ্যাস পুড়ে যাওয়ার কারণে আমরা গ্যাস সংকটে ভুগেছি, আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অন্যান্য আর্থিক কাজ ব্যাহত হওয়ায় যে ক্ষতি হয়েছে, তাও বিবেচনায় নিয়ে ক্ষতির মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।

সমকাল : ২০১৬ সালে আপনি উচ্চ আদালতে নাইকোর বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেন। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত নাইকোর সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং বাংলাদেশের কাছে নাইকোর গ্যাস বিক্রির অর্থ ২৭ মিলিয়ন ডলার না দিতে সরকারকে নির্দেশ দেন। এই প্রক্রিয়াটি ইকসিডে কোনো প্রভাব ফেলেছে কিনা?

এম শামসুল আলম : চুক্তি বাতিল না হলে বাংলাদেশের পক্ষে ইকসিডে ক্ষতিপূরণের দাবি করা এবং নাইকোকে অভিযুক্ত করা সম্ভব ছিল না। সুতরাং বিষয়টি প্রভাব নয়, বলা যেতে পারে সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ২০১৬ সালে যখন নাইকো জিতে যায়, তখন আমরা বিশ্নেষণ করে দেখতে পাই, চুক্তি বহাল থাকলে নাইকোকে বিচারের আওতায় আনা যাবে না। সুতরাং চুক্তি বাতিল করতে হবে। আমরা এও বুঝতে পারি যে, যেকোনো কারণেই হোক সরকারের পক্ষে এই চুক্তি বাতিল করা দুরূহ। তখন আমি আদালতে মামলা করি। প্রথম মামলা করি চুক্তি বাতিল ও বিস্টেম্ফারণের ক্ষতিপূরণ আদায়ের আদেশ চেয়ে। আর দ্বিতীয় মামলা করি নাইকোর সমস্ত সম্পত্তি জব্দের আদেশ চেয়ে। সেটার আওতায় চূড়ান্ত রায়ে চুক্তি বাতিল হয়। এরপর সরকার ২০১৬ সালে ইকসিডে মামলা দায়ের করে এবং জয়ী হয়।

সমকাল : ইকসিডের এ রায় কী বার্তা দেয়?

এম শামসুল আলম : এ রায় বিশ্ব দরবারে জানিয়ে দিয়েছে যে, আমরা জাতীয়ভাবে সক্ষম। জাতীয় স্বার্থবিরোধী যেকোনো তৎপরতা আমরা বন্ধ করে দিতে পারি। আমরা জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত। পরবর্তীকালে এ ধরনের কোনো তৎপরতা পরিলক্ষিত হলে দেশের মানুষ এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে এগিয়ে যাবে এবং প্রতিকার পাবে। যারা দুর্নীতি করে করে লাভবান হয়েছেন বা হচ্ছেন, তাদের জন্য এটা অশনিসংকেত।

সমকাল : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

এম শামসুল আলম : আপনাদের জন্যও শুভ কামনা।

আরও পড়ুন

×