প্রাথমিকের শিক্ষার্থী
গোড়া শুকনো রেখে আগায় জল!
ওসাকার মেয়র ইসিরো মাতসুই
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৪ মে ২০২০ | ১২:০০
করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব হয়ে পড়ছে, আমরা জানি। ব্যক্তি পর্যায়ে কিংবা বেসরকারি খাতে অনেকেরই হাত-পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই। রাষ্ট্র ও প্রশাসনেরও সাধারণ অনেক দায়িত্ব আপাত স্থগিত রেখে বড় অংশকে নিয়োজিত করা হয়েছে লকডাউন কার্যকর ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায়। কিন্তু তারপরও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কিছু কাজ জরুরি ভিত্তিতে সম্পাদন করে যেতে হয় রাষ্ট্র পরিচালনার স্বার্থেই। প্রশ্ন হতে পারে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উপবৃত্তি বিতরণ সেই জরুরি কাজের মধ্যে পড়ে কিনা। প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের যে মিডডে মিল বা মধ্যাহ্নের খাবার দেওয়া হয়, বিদ্যালয় বন্ধ থাকলে তার প্রয়োজন আছে কিনা। চলতি বছর থেকে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা উপকরণ ক্রয়ের জন্য অর্থ প্রদানের কথা ছিল। শিক্ষা কার্যক্রমই যেখানে প্রায় স্থবির, সেখানে শিক্ষা উপকরণ কতটা জরুরি?
এসব প্রশ্ন আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে সোমবার সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন। আমরা জেনে বিস্মিত হয়েছি যে, সারাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গত ছয় মাস ধরে তাদের উপবৃত্তির অর্থ পাচ্ছে না। সব শিশুকে বিদ্যালয়ে আনতে এবং তুচ্ছ কারণে তাদের ঝরে পড়া রোধ করতে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীপ্রতি সাধারণত একশ' টাকা তার যথাযথ অভিভাবকের কাছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পাঠানোর এই কর্মসূচি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। অনেক পরিবারের জন্যই এই 'সামান্য' অর্থ নিছক উৎসাহ নয়, বরং শিক্ষার্থীর পড়ার জন্য সন্ধ্যা বেলা আলোর ব্যবস্থা করার মতো অতি প্রয়োজনীয় খরচও বটে। প্রতি তিন মাস পরপর একসঙ্গে একেজন শিক্ষার্থীর জন্য তিনশ' টাকা প্রাপ্তি তাই ত্রৈমাসিক উৎসবের মতোই ছিল। করোনা পরিস্থিতিতে অনেক শিক্ষার্থীর পরিবারই যখন কর্মহীন অবস্থায় ঘরবন্দি, তখন কে জানে এই অর্থ খাদ্য কিংবা ওষুধ কেনার কাজেও ব্যবহূত হতে পারত। কিন্তু সেই অর্থই যদি বিতরণ বন্ধ থাকে, তাহলে সব তাৎপর্যই যেন ম্লান হয়ে যায়। দুঃসময়েই যদি কাজে না লাগে- নিম্নমধ্যম আয়ে উন্নীত হওয়া একটি দেশের বেশিরভাগ নাগরিকের জন্য সুসময়ে একশ' বা তিনশ' টাকা কোনো অর্থ?
অনুমান করা কঠিন নয় যে, করোনাকালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য 'জরুরি' কাজের ভিড়ে সোনামণিদের এই সামান্য প্রয়োজন হারিয়ে গেছে। আমরা আশা করি, বিলম্বে হলেও এই অর্থ অবিলম্বে শিক্ষার্থীদের পরিবারে পৌঁছানো হবে। আলোচ্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর থেকে উপবৃত্তির অর্থ ৫০ টাকা বাড়িয়ে দেড়শ' করার কথা। গত বছরের তিন মাস ছাড়াও চলতি বছরের তিন মাসের উপবৃত্তি বাকি রয়েছে। চলতি বছরের অর্থের সঙ্গে প্রতিশ্রুত বাড়তি যদি যোগ করা যায়, তা হবে সোনায় সোহাগা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে চালু হতে যাওয়া শিক্ষা উপকরণ কেনার অর্থ দেওয়ার কথা ছিল শিক্ষার্থীদের। যোগ করা হোক সেই অর্থ। আমরা জানি, যে কোনো দুর্যোগে সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে থাকে শিশু ও প্রবীণরা। তিন উপলক্ষেও অর্থ যদি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া যেতে পারে, শিশুর সূত্রে ওই অর্থ তাদের পরিস্থিতি উন্নয়নে নিশ্চয়ই ভূমিকা রাখবে।
অস্বীকারের অবকাশ নেই, করোনাভাইরাসের সময়ও শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতে যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ের জন্য সংসদ টেলিভিশনে ক্লাস সম্প্রচার তারই অংশ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও অনলাইনে চালানো হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবাসগুলোতে কীভাবে স্বাস্থ্য সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, আমরা জানি। তবে মনে রাখতে হবে, শিক্ষা ব্যবস্থার গোড়া হচ্ছে প্রাথমিক। একই দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ের পরিস্থিতিই পরবর্তী ধাপগুলোর গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করে দেয়। করোনাভাইরাস পরিস্থিতি প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য নিছক শিক্ষা নয়, খাদ্য ও পুষ্টির সংকটও তৈরি করতে পারে। ফলে সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে অন্য যে কোনো পদক্ষেপই গোড়া শুকনো রেখে আগায় জল ঢালার নামান্তর। বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় মধ্যাহ্ন ভোজের জন্য বরাদ্দ পুষ্টিকর খাবার বা বিস্কুটও তাই পৌঁছে দেওয়া হোক বাড়ি বাড়ি, অবশ্যই শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে। যখন শিশুদের খাদ্য ও পুষ্টির সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখন তাদের প্রাপ্য গুদামবন্দি রাখার মতো অবিমৃষ্যকারিতা আর কিছু হতে পারে না।
- বিষয় :
- করোনাভাইরাস
- প্রাথমিকের শিক্ষার্থী