ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

মুখোমুখি অবাধ্য সত্য

করোনা দিনে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ

করোনা দিনে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ
×

ড. জিয়া রহমান

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

করোনা লকডাউনেও বরাবরের মতোই প্রতিদিন আমার কাছে ফোন আসে, একটা বাইট চাই। সেটি অবশ্যই বিশেষভাবে করোনার সময় অপরাধ বাড়বে না কমবে, এ জাতীয়। যতটুকু পারি চেষ্টা করি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার। করোনাভাইরাস আমাদের জীবনকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে, আপনি যদি গবেষণা করতে চান তাহলে দেখবেন এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেটিকে করোনা স্পর্শ করেনি। কাজেই করোনাকালে অপরাধ নিয়ে কথা হবে না, সেটা তো হতে পারে না। বিষয়টি যে শুধু বাংলাদেশে আলোচনা হচ্ছে, তা কিন্তু নয়। সারা পৃথিবীতেই এই আলোচনা হচ্ছ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জঙ্গিবাদ, মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা, গৃহবিবাদ, পারিবারিক সহিংসতা, হত্যা, ছিনতাই, চুরি ইত্যাদি।

যে কোনো দুর্যোগ এলে সমাজে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা আসে, প্রকারান্তরে তা সমাজে একটা বড় প্রভাব ফেলে। ১৯৭৭ সালের ১৩-১৪ জুলাই নিউইয়র্ক শহরে বিদ্যুতের ব্ল্যাক আউটের ফলে শহরজুড়ে লুটতরাজের বীভৎস উৎসব চলে। একই অবস্থা আমরা ২০০৫ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের নিওরোলিন্সের হ্যারিকেন ক্যাটরিনার সময়ও প্রত্যক্ষ করি, যেখানে শুধু মানুষই মারা গেছেন ১২০০। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের এই দুঃখজনক সময়ের তিন মাসে চুরি হয় এক হাজার ৬৫২টি, বসতবাড়িতে সিঁধেল চুরি হয় ৯২১ আর বাণিজ্যিক অফিসে চুরির সংখ্যা ছিল ১০৯টি। সর্বমোট কমপ্লিন জমা পড়ে দুই হাজার ৬৮২টি। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেই যেহেতু এই অবস্থা, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তথা তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে এ ধরনের একটি সময় কী অবস্থা হতে পারে, তা সহজে অনুমেয়।

করোনাভাইরাসের এই সময় অপরাধ বাড়বে কি কমবে, তা নির্ভর করছে আমরা করোনার সঙ্গে কতদিন বসবাস করছি। একেবারে শুরুর দিকে আমি বলেছিলাম, প্রাথমিক অবস্থায় অপরাধ কমবে। তার কারণ হলো, একেবারে শুরুর দিকে সব মানুষই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে; সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় মানুষ অপরাধ নিয়ে চিন্তাও করতে পারে না। অন্যদিকে প্রাথমিক অবস্থায় সাধারণ অসহায় মানুষ নানাভাবে সিভিল সমাজ বিশেষ করে ছাত্রদের কাছ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছে, যে কারণে দরিদ্রতার কারণে কেউ অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠেনি। আমরা জানি, দরিদ্রতার সঙ্গে অপরাধের সম্পর্ক অনেক পুরোনো। আমি এও বলি, যদি করোনা লকডাউন দীর্ঘায়িত হয়, নিশ্চিতভাবেই অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাবে। এর কারণ দুটি। প্রথমত, করোনা দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দরিদ্র মানুষের পেটে চাপ পড়তে থাকবে, আর সেইসঙ্গে ত্রাণকার্যেও ভাটা পড়বে। ফলে দরিদ্র মানুষ কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে যাবে এবং স্বাভাবিকভাবেই ছোট ছোট চুরি বা এই জাতীয় অপরাধ বেড়ে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, একদিকে বিপর্যস্ত মানুষ, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর করোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে অপরাধী চক্র বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হবে। এর বাইরে যেমন করোনার সুযোগ নিয়ে পুরাতন দ্বন্দ্ব মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে, ফলে নতুন অপরাধ বেড়ে যেতে পারে। আরেকটি বিষয়, যেটি নিয়ে আমরা বোধ করি তেমন চিন্তা করছি না। তা হলো সাইবার ক্রাইম। সারা পৃথিবী যেহেতু লকডাউনের কারণে অনলাইন কার্যক্রমের ওপর ক্রমেই ঝুঁকে পড়ছে, সে কারণে যারা সংঘবদ্ধ ক্রাইমের সঙ্গে জড়িত, তারা একটা নতুন পথের সন্ধান করতে পারে। এমনিতেই পৃথিবীতে সাইবার ক্রাইম ঊর্ধ্বমুখী। বাংলাদেশেও এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা অনেক বেড়েছে। এর অর্থ হলো অনলাইন কার্যক্রম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এক শ্রেণির অপরাধীরা সুযোগের সদ্ব্যবহার করবে, যা কিনা রুটিন অ্যাক্টিভিটি তত্ত্বের মূলকথা।

করোনাকালীন যে দুটি অপরাধ নিয়ে সারা পৃথিবীতে সমাজবিজ্ঞানী এবং ক্রিমিনোলজিস্টদের উদ্বিগ্ন করছে তা হলো- পারিবারিক সহিংসতা ও জঙ্গিবাদের উত্থান আশঙ্কা। পৃথিবীর পরিসংখ্যান বলছে, পারিবারিক সহিংসতা বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। ইংল্যান্ডে এপ্রিল পরিসংখ্যান বলছে, পারিবারিক অত্যাচারে মৃতের সংখ্যা বেড়েছে ১৬০ গুন। পৃথিবীর সব জায়গায় একই ধরনের অবস্থা দৃশ্যমান। মূলত বিচ্ছিন্ন থাকা এবং বাইরে মিথস্ট্ক্রিয়া না থাকার কারণে যে মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা দেখা দিয়েছে, সেটি যেমন সত্য, তেমনি অতি মাত্রায় মিথস্ট্ক্রিয়ার কারণেও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে কিনা, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন। কোনো ধরনের গবেষণা ছাড়া কোনো কারণ আবিস্কার করাটা প্রিম্যাচিউর বলেই মনে করি। অন্যদিকে করোনাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে জঙ্গিবাদীদের সক্রিয় হওয়ার খবর আসছে বিভিন্নভাবে। এ বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংঘের বারবার সতর্কতার বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য। এর বাইরে পৃথিবীর প্রধান প্রধান নিরাপত্তা সংস্থা এ বিষয়ে ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে।

গেল দুই সপ্তাহে স্পেন থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা জঙ্গি সংশ্নিষ্ট দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে একজন ছিল ব্রিটেনের মোস্ট ওয়ান্টেড পলাতক আসামি আব্দেল মাজেদ আব্দেল বারি। গোয়েন্দা সংস্থা বলছে, বারি ছিল ব্রিটেনের মৃত এক আইএস জিহাদির ঘনিষ্ঠ সহযোগী। গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা, বারি বোটে করে নৌপথে আলজেরিয়া থেকে স্পেনে ঢুকেছে। একই সঙ্গে বার্সেলোনা থেকে পুলিশ এ সপ্তাহে এক মরক্কানকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের মতে, একটি 'লোন উলফ' আক্রমণের অপেক্ষায় ছিল সে। স্পেনের গোয়েন্দাদের মতে, করোনাকালীন আইএস ইউরোপে আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর বাইরে করোনাকালীন সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক, ইয়েমেন, তুরস্ক প্রভৃতি দেশে আইএস যোদ্ধাদের সরব উপস্থিতি এটাই প্রমাণ করে যে, তারা হয়তো নতুনভাবে আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, পৃথিবী আসলে কোনো একটি অরাজনৈতিক প্রপঞ্চ নয়। আর নয় বলেই আমরা জাতিতে জাতিতে যুদ্ধ, উপনিবেশবাদ, এথনিক দ্বন্দ্ব, বর্ণবাদ, স্নায়ুযুদ্ধ, নয়া উপনিবেশবাদ প্রভৃতি শব্দের সঙ্গে পরিচিত। এর অর্থ হচ্ছে, অন্য সব প্রপঞ্চের মতো জঙ্গিবাদ শব্দের পেছনেও রয়েছে রাজনীতি। করোনার মতো ভয়ংকর বিষয় নিয়েও যেখানে বিশ্বরাজনীতি হচ্ছে, সেখানে করোনাকালীন জঙ্গিবাদ নিয়ে রাজনীতি হবে না, এটা মনে করা অমূলক।

একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে করোনার মতো ভয়াবহ বিপর্যয় আমাদের কতদিন গ্রাস করবে, তা এখনও বলা যাচ্ছে না। কাজেই অন্য সব বিষয়ের মতোই অপরাধকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে সামনে এগোতে হবে। করোনাভাইরাসের করালগ্রাসে নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের অন্যদিকে ব্যস্ত থাকার কারণে অপরাধী চক্র তাদের থাবা প্রসারিত করবে- এটাই স্বাভাবিক। আমরা জানতে পেরেছি যে, সরকারের জিরো টলারেন্সের মধ্যেও এই করোনাকালীন আপদে মাদক ব্যবসায়ীরা সক্রিয় আছে। বিষয় সহজ, কারণ সমাজে মাদকের চাহিদা এখনও বেশ আছে। অন্যদিকে মাদক ব্যবসায়ী-পুলিশ এই অশুভ আঁতাত সমাজের মধ্যে এখনও দৃশ্যমান। বাংলাদেশের মতো একটি অতি সমস্যাসংকুল দেশে রাতারাতি যে কোনো সমাধান আসবে, সেটা মনে করছি না। এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং চোখ কান খোলা রাখা। কাজেই করোনাযুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশও অপরাধ দমনে প্রতিরোধের নীতি গ্রহণ করবে একজন ক্রিমিনোলজিস্ট হিসেবে, এটাই প্রত্যাশা।

সমাজবিজ্ঞানী; অধ্যাপক ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ক্রিমিনালজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]


আরও পড়ুন

×