পাহাড়ধসের শঙ্কা
সময় থাকতে ব্যবস্থা নিন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৮ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
চট্টগ্রাম নগরীতে পাহাড়ধসের শঙ্কা নিয়ে সোমবারের সমকালে যে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে, তা আমাদের সেই পুরোনো বাংলা প্রবাদ মনে করিয়ে দিয়েছে- সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়। আমরা জানি, বর্ষাকাল এলেই পাহাড়, সমুদ্র ও নদীঘেরা চট্টগ্রাম অঞ্চল কেবল আরও সবুজ হয়ে ওঠে না; পাহাড়ধসে হতাহতদের বেদনায় নীলও হয়ে থাকে প্রায় প্রতিবছর। বস্তুত কেবল পাহাড়ধস নয়, এ সংক্রান্ত দায়িত্ব ও দায়িত্বে অবহেলাও যেন হয়ে উঠেছে বর্ষার মতোই মৌসুমি। আমরা দেখছি, প্রতিবছরই ফেব্রুয়ারির দিকে পাহাড়ধস রোধে 'করণীয়' নির্ধারণ করতে বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে সভা হয়, ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের তালিকা হালনাগাদ হয়, আরও কিছুদিন পর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সতর্কতামূলক মাইকিং হয়। কিন্তু প্রায় প্রতিবছরই পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী খুব কম মানুষই এসবে কান দেয়। পরিণতিতে হারাতে হয় মূল্যবান প্রাণ। এ নিয়ে কয়েকদিন সংবাদমাধ্যমে তোলপাড় চলে, প্রশাসনের পক্ষে তদন্ত কমিটি হয়, ত্রাণ তৎপরতা চলে। চলে উচ্ছেদ অভিযান। তারপর মৃত মানুষগুলো নিছক সংখ্যায় পরিণত হয়। ধীরে ধীরে ফের ফিরে আসে পাহাড়ের বেআইনি বাসিন্দারা। চোখের সামনেই নতুন করে বসতি হয়, পাহাড় কাটা চলে, চলে বিসবুজীকরণ। কিন্তু আরেকটি বর্ষাকাল যখন আসি আসি করে, তার আগে প্রশাসনের ঘুম ভাঙে না। এবার অবশ্য পরিস্থিতি আরও গুরুতর। করোনা সংকটের কারণে পাহাড়ধস বিষয়ে ফেব্রুয়ারিতে একটি মাত্র সভা হয়েছে বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে। তারপর আর কোনো সাড়াশব্দ নেই। আমাদের প্রশ্ন, বছরের পর বছর প্রাণঘাতী এই চক্র চলতেই থাকবে?
সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনে প্রকাশিত শঙ্কা সঙ্গত যে, করোনার কারণে বেশিরভাগ মানুষ এখন ঘরের ভেতর অবস্থান করছে। ফলে পাহাড়ধসের মতো দুর্যোগে প্রাণহানি বেড়ে যাবে। কেবল প্রাণহানি নয়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির থাকায় এই ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলা এবং সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোও হয়ে পড়বে কঠিন। ফলে নিশ্চয়ই উচিত ছিল সময় থাকতে অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, উচ্ছেদই কি একমাত্র সমাধান? আমরা মনে করি, নজর দিতে হবে- বসতি স্থাপন হয় কীভাবে? এটা স্পষ্ট যে, এসব বসতির পেছনে থাকেন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবশালীরা। তারাই কখনো মাসোহারা তোলার জন্য বা কখনও প্রাথমিক দখল সম্পন্ন করতে ছিন্নমূল মানুষকে এনে বসতি গড়ে দেয়। নেপথ্যের এই খলনায়কদের যদি বিচারের আওতায় আনা না যায়, তাহলে বছর বছর উচ্ছেদ অভিযান কেবল উপরিকাঠামো মাজা-ঘষার নামান্তরই হবে। এমনও নয় যে, দখলের নেপথ্য খলনায়করা অচিহ্নিত। আমরা দেখেছি, বিভিন্ন সময়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে তাদের সবার নাম ধাম উল্লেখ করা হয়েছে। তার পরও কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, বিলম্বে হলেও সেই প্রশ্ন তুলতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, প্রশাসন আন্তরিক ও সক্রিয় হলে দখলদারদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা কঠিন হবে না। দেশের প্রধান নির্বাহী যেখানে পরিবেশ ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে বারংবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন, সেখানে স্থানীয় দখলদারদের খুঁটির জোর খুব বেশি হওয়ার কথা নয়।
আমরা দেখতে চাই, বিলম্বে হলেও চট্টগ্রাম নগরীর ২৮টি পাহাড় থেকে অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করা হয়েছে। আইনের আওতায় আনা হয়েছে তাদের নেপথ্য শক্তিকেও। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, উচ্ছেদই শেষ কথা হতে পারে না। করোনা পরিস্থিতিতে যেখানে দৈনন্দিন খাবার জোগাড় কঠিন হয়ে পড়েছে, সেখানে উচ্ছেদকৃত মানুষেরা খাদ্য ও বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থাও প্রশাসনকে করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে করতে হবে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও। সবচেয়ে জরুরি পাহাড়ে পুনঃবসতি রোধ করা। অন্যথায় সকলই গরল ভেল! এও মনে রাখতে হবে, পাহাড়ধসের পেছনে পাহাড় কাটা এবং নির্বিচার বৃক্ষনিধনও দায়ী। প্রতিবেশবিনাশী এই অপকর্ম বন্ধ করা না গেলে, কেবল মানুষ সরিয়ে প্রাণহানি কমানো গেলেও পাহাড়হানি ঠেকানো যাবে না। এও ভুলে যাওয়া চলবে না, পাহাড় ধসের সংকট চট্টগ্রাম নগরীর বাইরেও গোটা পার্বত্য এলাকায় প্রকট হয়ে উঠছে। কিন্তু এ ব্যাপারে নগরীতে যতখানি মনোযোগ দেওয়া হয়, প্রত্যন্ত জেলাগুলোতে যেন তা ততখানিই কম। আমরা চাই গোটা অঞ্চলেই নেওয়া হবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। এক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও সদিচ্ছা ও সক্রিয়তা দেখতে চাই আমরা। পাহাড় ধস রোধ না করে নয়নাভিরাম চট্টগ্রাম নগরী রক্ষায় বড় বড় কথা কেবল উপহাসই হয়ে থাকবে।