ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

ঘরের কাজ ও গৃহ-সহিংসতা

ঘরের কাজ ও গৃহ-সহিংসতা
×

মাইকেল জোসেফ মার্টিন

সাবিরা নূপুর

প্রকাশ: ২০ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

যে কোনো দুর্যোগে সেটি প্রাকৃতিক হতে পারে, আবার মানুষের তৈরিও হতে পারে; নারী ও শিশুরা বিশেষ করে মেয়েশিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশি। দুর্যোগকালীন নারী এবং মেয়ে শিশুরা শারীরিক, মানসিক এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। করোনাকালেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। পাশাপাশি রয়েছে অনুৎপাদনশীল কাজের চাপ। সংসারের সব কাজের দায়িত্ব নারী ও পরিবারের কন্যাশিশুর ওপর পড়ে।
নিজের কথা বলি- ঘরে অবস্থান ৬০ দিন পার হয়েছে। এই সময় আমাকে ঘরের পাশাপাশি অফিসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। ঘরের কাজে আমাদের পরিবারের সবাই ভূমিকা রেখেছে; কিন্তু তারা সেটি করছে পরিবারে তাদের দায়িত্ব মনে না করে। তারা ভাবছে আমার কাজে তারা সহযোগিতা করছে। ঘরে অবস্থানকালে অনেক নারীর সঙ্গে কথা হয়েছে। তার মধ্যে পরিবারের সদস্য আছেন, আত্মীয় আছেন, নারী সহকর্মী আছেন। বেশিরভাগই বলেছেন, বাড়িতে পুরুষ সদস্যদের পর্যাপ্ত সহযোগিতা তারা পাচ্ছেন না। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনও আছে।
পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যই মনে করেন ঘরের কাজ মানে 'বউ' করবে। অতএব তাকে ঘর পরিস্কার থেকে পরিবারের বাকি সদস্যদের শারীরিক (যদি অসুস্থ কেউ থাকে) ও মানসিক সেবা প্রদান করতে হবে। হাস্যকর এবং একই সঙ্গে ক্লান্তিকর। বলতে চাই ঘরের কাজ শুধু বউয়ের কাজ নয়: ঘরে বসবাসরত সব সদস্যের কাজ।
কয়েকদিন আগে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন দ্বারা পরিচালিত এক জরিপ দেখছিলাম- গত এপ্রিলেই চার হাজার ২৪৯ নারী গৃহ-সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে এক হাজার ৬৭২ নারী এই লকডাউনের সময়ে প্রথমবারের মতো সহিংসতার শিকার হয়েছেন। কিন্তু এর বাইরেও অনেক নারী ও মেয়ে শিশু আছে যারা রিপোর্ট করতে পারছে না বা জানে না কোথায় কীভাবে গৃহ-সহিংসতার রিপোর্ট করতে হয় বা হবে। এই লকডাউনে সেইসব নারী বা মেয়েশিশুর জন্য বিভীষিকা হয়ে এসেছে তাদের পরিবারের পুরুষ সদস্যরা, যারা অফিস বা ব্যবসার কাজে বাইরে থাকাকালীন সময়টুকু তারা নিঃশ্বাস নিতে পারতেন। কিন্তু এখন তাদের সেইসব পুরুষ সঙ্গীর সঙ্গে ২৪ ঘণ্টায় বসবাস করতে হচ্ছে। এই নতুন স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত হতে সময় লাগার কারণে অনেকেই মানসিকভাবে অস্থির হয়ে উঠছেন। অনেকেই কাজ হারিয়েছেন। দিন আনা দিন খাওয়া মানুষের পরিবারে খাদ্যাভাবের কারণেও সেইসব পরিবারের নারী এবং শিশুরা গৃহ-সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। যেটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সামাজিক মাধ্যমগুলোতে গত কয়েকদিন দেখছিলাম অনেক পরিবারের পুরুষ সদস্য গৃহে অবস্থানকালে তাদের নারী সঙ্গী বা নারীদের নিয়ে বিভিন্ন হাস্যরসাত্মক ব্যঙ্গ করছেন। যা নারীর জন্য অসম্মানজনক। এর একটি- 'ইতিহাস সাক্ষী থাকবে ২০২০ সালে বিবাহিত পুরুষেরা ঘরে বসে একলাই দু-দুটো ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করছে। এক করোনা দুই ললনা।'
কোনো নারীরকে দেখিনি পুরুষ সঙ্গীদের উদ্দেশে ব্যঙ্গাত্মক কথা সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন। কভিডকালে ও পরেও নারী ও মেয়েশিশুর প্রতি সকল প্রকার সহিংসতা বন্ধে বাংলাদেশ সরকারসহ বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন, প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এর মধ্য রয়েছে- নারী ও মেয়েশিশুর সুরক্ষার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং তাদের সুক্ষার বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ের প্রশাসনিক ও স্থানীয় সরকার যৌথভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন। নারী ও শিশুবান্ধব রিপোর্টিং ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করতে হবে। প্রয়োজনে ১০৯ এবং ১০৯৮ এর আরও প্রচার বৃদ্ধি করতে হবে এবং এর সেবা আরও দ্রুত করতে হবে; যাতে করে সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত নারী ও মেয়েশিশু এর সেবা পেতে পারেন।
স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায়ে নারী ও মেয়েশিশুর জন্য মনোসামাজিক পরামর্শ গ্রহণ আরও সহজলভ্য করতে হবে, যাতে করে তারা মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে। সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত নারী ও মেয়েশিশুর জন্য সরকারের সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনী আরও শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত নারী ও মেয়েশিশুর পরিবারের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা এবং দৈনন্দিন আয়ের পথ নিশ্চিত করা জরুরি
নারী ও মেয়ে শিশুর প্রতি সহিংসতা ও পরিবারের কাজ শুধু নারী বা মেয়েশিশুর কাজ নয়, পরিবারের সবার কাজ- এই বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি উন্নয়ন সংগঠন ও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রচার আরও জোরদার করা জরুরি।
উন্নয়নকর্মী
[email protected]

আরও পড়ুন

×