আম্পান-পরবর্তী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
ড. মাহবুবা নাসরীন
প্রকাশ: ২০ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
বুধবার সন্ধ্যায় যখন এই লেখা লিখছি, তখন সুপার সাইক্লোন 'আম্পান' পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম করেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরকে উদ্ৃব্দত করে সমকাল অনলাইনের তথ্যমতে, আঘাত হানার সময় সাগরের তুলনায় ঝড় খানিকটা দুর্বল ছিল। কিন্তু তাতে করে ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কার্যক্রমে উনিশ-বিশ হওয়ার সুযোগ নেই।
কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের সময় ঘূর্ণিঝড় আম্পান মোকাবিলায় বেগ পেতে হবে, তা অনুমান করা যায়। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ঘূর্ণিঝড় সবচেয়ে পুরোনো ও পরিচিত দুর্যোগ। এদেশের মানুষ বিশেষত উপকূলবাসী ১৬শ' শতক থেকে ঘূর্ণিঝড়ের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বসবাস করে আসছে। প্রতিবছরই তারা একাধিকবার ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বিভিন্ন প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন। বিগত সময়ে ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলের বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গত তিন দশকেও আমরা বেশ কয়েকটি বড় বড় ঘূর্ণিঝড় দেখেছি। তবে, ১৯৯১ সালের পরবর্তী সময়ে আসা দুর্যোগগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায় দুর্যোগে মৃত্যুহার ও ক্ষয়ক্ষতির হার কম ছিল।
আমাদের দেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সুদূরপ্রসারী বেশ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যার কারণে মূলত ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম হচ্ছে। দুর্যোগের আগে, দুর্যোগের সময় এবং দুর্যোগের পরে কী করতে হবে- সেই সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এদেশে গড়ে উঠেছে। আমরা দুর্যোগ আসার আগেই সতর্কবার্তা পেয়ে প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ পাই। বাংলাদেশে ক্রমেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আধুনিক হচ্ছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে গবেষণাও বাড়ছে। ১৯৯৭ সালে আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত স্থায়ী আদেশাবলি (স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন ডিজাস্টার) প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তীকালে তা কয়েকবার সংশোধন করা হয়। আমি আশা করি করোনা পরবর্তী সময়ে আবারও সংশোধন হবে।
সাধারণত বছরের এপ্রিল-মে মাসে একটি এবং নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে আরেকটি ঘূর্ণিঝড় হয়। এ বছরও মে মাসেই আম্পান আঘাত হানে। স্বাভাবিকভাবে আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর দুর্যোগের আগে বিভিন্ন প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। বিশেষ করে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো আগেই মেরামত করা হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির (সিপিপি) উদ্বোধন করেছিলেন। সিপিপি এখনও সরকারের সঙ্গে কাজ করছে। সিপিপির কর্মসূচি সারাবছর অব্যাহত থাকে এবং ঘূর্ণিঝড়ের সময় তারা স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করে। আম্পান মোকাবিলায় তারা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিলও সার্বক্ষণিক ঘূর্ণিঝড় পরিস্থিতি মনিটরিং করছে।
বিগত সময়ের দুর্যোগগুলোর সঙ্গে কভিড-১৯ কালের দুর্যোগের পার্থক্য রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের সময় প্রায় শতভাগ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের এই মহামারিকালীন মানুষকে বুঝিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে নেওয়া কিছুটা কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা জানি যে, দেশে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা অনেক বেড়েছে এবং সেগুলোর আধুনিকায়ন করা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে নারীবান্ধব, শিশুবান্ধব ও প্রতিবন্ধীবান্ধব করা হয়েছে। অনেক এলাকায় 'মুজিব কেল্লা' তৈরি হয়েছে। কভিড-১৯ এর কারণে এবার উপকূলীয় বন্ধ থাকা স্কুলের প্রায় সবগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্র করা হয়েছে। যাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে এক হাজারের বদলে অর্ধেক করে মানুষ আশ্রয় নিতে পারে একটি কেন্দ্রে। 
অতীতে মানুষ যেভাবে স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে আশ্রয় কেন্দ্রে যেত, এবার সেভাবে যেতে চায়নি। তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে আনতে সংশ্নিষ্টদের বেগ পেতে হয়েছে। কারণ উপকূলবাসী অনেকের মধ্যে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সংশয় ছিল। এই সংশয় অমূলক নয়। সেক্ষেত্রে আশ্রয়কেন্দ্রে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলাফেরার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছিল, আশা রাখি। একইসঙ্গে মাস্ক পরিধান করা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধির দিকেও নিশ্চয়ই নজর দেওয়া হয়েছিল। আশ্রয় কেন্দ্রে পর্যাপ্ত খাবার, পানি ও ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে ইতোমধ্যেই পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গ্রহণের বিষয়ে আমরা অবগত হয়েছি।
বিগত সময়ে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতিতে তরুণ সমাজ ঝাঁপিয়ে পড়ত। মানুষকে ঘূর্ণিঝড়ের তথ্য জানানো, সচেতন করা, আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসা, গবাদি পশু সংরক্ষণ, ঘূর্ণিঝড়ের পরে মানুষদের নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া, ত্রাণ বিতরণ, রাস্তাঘাট পরিস্কার করাসহ সব ধরনের কাজে তরুণদের স্বতঃস্ম্ফূর্ত অংশগ্রহণ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে সহজ করেছিল। এ বছর করোনাভাইরাসের কারণে তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা বৃহৎ পরিসরে ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে জনবলের কিছুটা ঘাটতি দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। ঘূর্ণিঝড় একটা দমকা হাওয়া বা জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি করে চলে যায়। তখন পরবর্তী ব্যবস্থাপনাগুলো ভালোভাবে সম্পন্ন করতে হবে।
উপকূলীয় অঞ্চলে আমাদের সবুজ বেষ্টনী হয়ে সুন্দরবন এখনও দাঁড়িয়ে আছে। ২০০৭ সালে সিডর আঘাত হানার পর আমরা সুন্দরবনের ভূমিকা ও গুরুত্ব ভালোভাবে অনুধাবন করি। এরপর সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন আরও জোরদার হয়েছে। আমরা জানি যে, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ক্ষেত্রেও সুন্দরবনের আমাদের বড় ভরসা। এই ম্যানগ্রোভই আমাদের অনেকাংশে রক্ষা করবে। জানমালের ক্ষতিও কম হবে। যেমনটি আমরা দেখেছিলাম সিডরের সময়, বুক পেতে দিয়ে উপকূলবাসীকে রক্ষা করেছিল সুন্দরবন।
আম্পানের আগে আশ্রয়কেন্দ্রে যারা এসেছে, আমি মনে করি তারা মোটামুটি নিরাপদ। এর পরও কিছু ক্ষতি হতে পারে। অনেক এলাকায় গাছপালা ভেঙে রাস্তাঘাট বন্ধ হতে পারে, বাড়িঘরের ক্ষতি হতে পারে। যোগাযোগ ব্যবস্থার বিঘ্ন ঘটলে অতিদ্রুত তা সচল করতে হবে। এ জন্য জনবল প্রস্তুত রাখতে হবে। কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল না থাকলে অন্য ব্যবস্থাপনাগুলো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এ ছাড়া, গবাদি পশুর ক্ষতি হতে পারে।
আমরা ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি ক্রমান্বয়ে সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতেও শূন্য প্রাণহানি প্রত্যাশা করছি। যে কোনো পরিস্থিতিতেই পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী ব্যবস্থাপনা শুররু করতে হবে। আশ্রয়গ্রস্ত মানুষের ঘরে ফেরা যথাসম্ভব নির্বিঘ্ন করতে হবে। বুধবারই খবর পেয়েছি, বাগেরহাটের পদ্মপুকুর, গাবুরার বেড়ি বাঁধ ভেঙে গেছে। পানি নেমে গেলে এ রকম দুর্বল বাঁধগুলো আগে মেরামত করতে হবে। যদিও ঘূর্ণিঝড়ের আগেই এগুলো মেরামত করার কথা ছিল।
মনে রাখতে হবে, আগাম নানা ব্যবস্থা নেওয়া সত্ত্বেও ফসলের ক্ষতি হবে ব্যাপক। যতটুকু রক্ষা করা যায় তার চেষ্টা করতে হবে আজ, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার থেকেই। চাহিদা, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ দ্রুততার সঙ্গে করে তালিকা অনুযায়ী সহায়তা করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে কৃষিতে ভর্তুকি, বীজ ও গবাদি পশুর ব্যবস্থা, ঋণ মওকুফ, শস্য বীমা, পল্লী রেশনিং, লবণাক্ত জলাবদ্ধতা দূর করা ইত্যাদি ব্যবস্থা ব্যবস্থা নিতে হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পুরো প্রক্রিয়া প্রধানমন্ত্রী মনিটর করে থাকেন। আম্পানের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। এ ছাড়া, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরাও কাজ করছেন, পরামর্শ দিচ্ছেন। বিগত সময়ে আমাদের সংবাদমাধ্যম, স্বাস্থ্য খাত, স্থানীয় সরকার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ দুর্যোগ মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করেছে। আম্পান পরবর্তী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাতেও যদি একইভাবে কাজ করি, উপকূলীয় বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে না।
পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়