অর্থনীতি
মূল্যম্ফীতির সিঁদুরে মেঘ
×
ফাইল ছবি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২০ | ১২:০০
সদ্য সমাপ্ত অর্থবছর শেষে গড় মূল্যস্টম্ফীতি আগের অর্থবছরের তুলনায় বেড়েছে- সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এ তথ্য সতর্কতা সংকেত না বাজিয়ে পারে না। সোমবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভা শেষে খোদ পরিকল্পনামন্ত্রী পরিসংখ্যান ব্যুরোকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছেন যে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে মূল্যস্টম্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ। আমাদের মনে আছে, ৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ গড় মূল্যস্টম্ফীতি নিয়ে তার আগের অর্থবছর শেষ হয়েছিল। এই মূল্যস্টম্ফীতি যাতে সাড়ে পাঁচ শতাংশ না ছাড়ায়, সদ্যবিদায়ী অর্থবছরের শুরুতে সেই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার। দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরাও তখন এ ব্যাপারে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছিলেন। সমকালেও আমরা প্রকাশ করেছিলাম একাধিক অভিমত। এখন দেখা যাচ্ছে, মূল্যস্টম্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। আরও উৎকণ্ঠার বিষয়, মে মাসের তুলনায় তো বটেই, গত বছরের জুন মাসের তুলনায়ও বিদায়ী জুন মাসে মূল্যস্টম্ফীতি বেড়েছে। অস্বীকার করা যাবে না যে, মূল্যস্টম্ফীতি বৃদ্ধির এই হার এক শতাংশেরও নিচে, শূন্য দশমিক দিয়ে প্রকাশ করতে হচ্ছে। কিন্তু সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য তা সিঁদুরে মেঘ। কারণ মূল্যস্টম্ফীতি অর্থনীতির 'নীরব ঘাতক' হিসেবে অভিহিত। পরিসংখ্যান বা সূচকে সামান্য হেরফের বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার জন্য অসামান্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষত করোনা সংকটে কর্মহীন জনগোষ্ঠীর জন্য মূল্যস্টম্ফীতি হতে পারে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। বতর্মান পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বহুলাংশে স্থবির থাকায় দেশের নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে। অনেকে ঋণ করে বা স্বল্প আয় দিয়ে কোনোরকমে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। করোনা পরিস্থিতির শুরুতে যে ত্রাণ তৎপরতা দেখা গিয়েছিল, সংকট প্রলম্বিত হওয়ায় তাতেও স্বাভাবিকভাবেই ভাটা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্টম্ফীতি যে আগুনে ঘি ঢালার সমতুল্য, তাতে সন্দেহ নেই। মন্দের ভালো যে, মূল্যস্টম্ফীতি বৃদ্ধির বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে খোদ পরিকল্পনামন্ত্রী দৃশ্যত সতর্ক। যদিও তিনি বলেছেন যে, এই স্টম্ফীতির কারণ চলমান বন্যা পরস্থিতি। ফসল বিশেষ করে সবজির ক্ষতি হওয়ায় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার সংকটে পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ শেকল বিঘ্নিত হওয়ায় মূল্যস্টম্ফীতি দেখা দিয়েছে। আমরা তার সঙ্গে বহুলাংশে একমত হয়েও বলতে চাই যে- প্রকৃতির কাঁধে দায় চাপিয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার অবকাশ নেই। মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশে মূল্যস্টম্ফীতির প্রধানতম অনুঘটক চালের বাজার, সবজির সরবরাহ নয়। দেশের অধিকাংশ ন্নি ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির উপার্জনের বড় অংশ ব্যয় হয় চাল ক্রয়ে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির শুরু থেকেই চালের দাম সামান্য হলেও বেড়েছে। একটি মহল যে চালের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চায়, সেই আশঙ্কাও উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমে। আমরা দেখতে চাইব, যে কোনো মূল্যে চালের বাজার স্থিতিশীল রাখা হয়েছে। পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ শেকল স্বাভাবিক রাখতেও নেওয়া হয়েছে সম্ভাব্য সবরকম ব্যবস্থা। এক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের বিকল্প নেই। করোনা সংক্রমণ, ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বন্যার কারণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী রয়েছে সবচেয়ে সংকটে। তাৎক্ষণিক ত্রাণ ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী থেকে তারা যাতে কোনোভাবেই বঞ্চিত না হন, সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিশ্চিত করতে হবে। এতে করে সার্বিক মূল্য পরিস্থিতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ভুলে যাওয়া চলবে না, মূল্যস্টম্ফীতি নিছক আর্থ-সামাজিক বিষয় নয়। রাজনৈতিকভাবেও অর্থনৈতিক এই সূচকের স্পর্শকাতরতা সবচেয়ে বেশি। মূল্যস্টম্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রার মান নেমে গেলে রাজনৈতিক অসন্তোষের পারদ বেড়ে যেতে পারে বৈকি। করোনা পরিস্থিতিতে তার ফল হবে বহুমাত্রিক। আমরা জানি, ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরও মূল্যস্টম্ফীতি নিয়ে রয়েছে তিক্ত অভিজ্ঞতা। এর পুনরাবৃত্তি কারও জন্যই কল্যাণকর হবে না। মূল্যস্টম্ফীতির বর্তমান হার যে কোনো বিবেচনাতেই অস্বাভাবিক ও ঊর্ধ্বমুখী। একে বৈশ্বিকভাবেই স্বাভাবিক বিবেচিত পাঁচ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে হবে যে কোনো মূল্যে।
- বিষয় :
- অর্থনীতি