ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

বিজয়ের মাস

স্বাধীনতা সংগ্রামে সোভিয়েত ইউনিয়ন

স্বাধীনতা সংগ্রামে সোভিয়েত ইউনিয়ন
×

সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ

প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৫:২৫

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের অবদান অনন্য, তা আমরা প্রতিনিয়ত স্মরণ করছি। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। একটি রাষ্ট্রের অবদানের গভীরতা অনেক। কিন্তু যে রাষ্ট্রটির নাম আমরা ভুলতে বসেছি, সেটি তৎকালীন ইউএসএসআর অর্থাৎ ইউনিয়ন অব সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক যা সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে পরিচিত। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন নামটি বিশ্ব তালিকা থেকে মুছে যায়। বিশ শতকের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন।

বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানিরা গ্রেপ্তার করার পর বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট মি. পদগর্নি পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধুর জীবন বিপন্ন- এ ধরনের সংশয় প্রকাশ করেন। তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়ার কাছে খুব সম্ভবত ১৯৭১ সালের এপ্রিলে এ সংশয় প্রকাশ করেন। '৭১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের উন্নত সংস্করণ রিচার্ড নিক্সন। জেনারেল ইয়াহিয়া তার বন্ধু ছিলেন। তাই তিনি সব সময় ইয়াহিয়াকে সমর্থন দিয়ে এসেছিলেন। ৩ ডিসেম্বর '৭১-এ যখন পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সরাসরি যুদ্ধ বেধে গেল, তখন ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বাহিনী গঠন করে ঘোষণা দেওয়া হলো। পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনা হলো। কিন্তু সেখানে বাংলাদেশের নাম নেই। পক্ষ-বিপক্ষ হলো ভারত ও পাকিস্তান। অথচ সংঘর্ষের মূল ইস্যু ছিল বাংলাদেশ। ৭ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভোটাভুটি হলো। তাতে বস্তুত ভারত বিশ্ব কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হলো। প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়ল ১০৪ এবং বিপক্ষে মাত্র ১১। এ সময় জাতিসংঘে মার্কিন প্রতিনিধি ছিলেন সিনিয়র জর্জ বুশ (মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন ১৯৮৯-৯৩)। মি. নিক্সন এবং বুশের আনন্দ-উল্লাস দেখার মতো ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটোতে এ প্রস্তাব ভেস্তে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নকে তিনবার ভেটো প্রয়োগ করতে হয়েছিল মার্কিন চক্রান্ত ঠেকাবার জন্য।

ভারত-পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধবিরতি হলে পরিস্থিতিটা কী হতো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চক্রান্ত সফল হলে আমাদের হয়তো আরও কয়েক যুগ লড়তে হতো। এখানে আরও একটি বিষয়ের উলেল্গখ করা প্রয়োজন। ১৯৬২ সালে চীনের সেনাবাহিনীর কাছে ভারতের সৈন্য ভীষণভাবে পর্যুদস্ত হয়। এর ফলে অনেকের বিশেষ করে মি. নিক্সনের ধারণা যে, ভারতের চীন ফোবিয়া রয়েছে। ইতোমধ্যে ভারত-সোভিয়েত বন্ধুত্ব বেশ গভীর হয় এবং ১৯৭১ সালের আগস্টে ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর হয়। যে চীনকে ২০ বছরের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘে ঢুকতে দেয়নি, তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করার জন্য অস্থির হয়ে গেল। এখানে একটি ঘটনার উলেল্গখ করতে হয়- ডোনাল্ড ট্রাম্প যে শিষ্টাচার ভেঙে মার্কিন পরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে হাত মেলাননি, এটা নতুন নয়, মার্কিন ঐতিহ্যে রয়েছে। ১৯৫৪ সালে জেনেভায় ইন্দোচীন নিয়ে বৈঠক চলছিল, যেখানে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, আমেরিকা রাশিয়া, চীন সবাই যোগ দিয়েছে। সভাস্থলে করিডোরে চীনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চৌএনলাই দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ইতোমধ্যে সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন ফস্টার ডালেস। চৌএনলাই হাত মেলানোর জন্য তার দিকে হাত বাড়িয়ে ছিলেন। মি. ডালেস সকল শিষ্টাচার ভঙ্গ করে হাত না মিলিয়ে চলে গেলেন। যা হোক ১৯৭১-এর নভেম্বরে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের দল চীন গিয়েছিল চীনের কাছ থেকে কী ধরনের সহযোগিতা পাওয়া যাবে তা জানার জন্য। কেননা চীন যদি ভারতের উত্তর সীমান্তে কিছুটা নড়াচড়া করে, তাহলে ভারত দুর্বল হয়ে পড়বে, এ ধারণা তারা পোষণ করতেন। সেই টিমকে চীন অত্যন্ত পরিস্কারভাবে বলে দিয়েছিল যে, পাকিস্তান যেন পরিস্থিতিটা যুদ্ধ পর্যায়ে না নিয়ে যায়। যেহেতু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের সঙ্গে রয়েছে তাই চীন সেখানে নিজেকে জড়িয়ে ফেলবে না। কেননা এর পূর্বে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে চীন এক সংঘর্ষে কিছুটা বিপর্যস্ত হয়েছিল। এ তথ্যের উলেল্গখ রয়েছে পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার রফিরাজার লেখা বইতে। রফিরাজা ভুট্টোর ব্যক্তিগত বন্ধু এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন।

ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য স্বয়ং এবং মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়েছিলেন। কিন্তু জাতিসংঘে ভোটাভুটিতে দেখা গেল যে, সাধারণ পরিষদে ১০৪ ভোটের বিপরীতে ১১ ভোট এবং নিরাপত্তা পরিষদে ১১ ভোটের বিপরীতে দুই ভোট পেয়েছেন তিনি। তার প্রজ্ঞার পরিচয় হলো, তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। সেখানে একটা শর্ত ছিল যে, একজন কোনো আগ্রাসনের শিকার হলে অপরজন তার সাহায্যে এগিয়ে আসবে। যার ফলে সোভিয়েতের তিন ভেটো এবং চীনের পাকিস্তানের পক্ষে এগিয়ে না আসায় ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বাহিনী দ্রুত সাফল্য অর্জন করে। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বিশ্ব তালিকা থেকে মুছে যাওয়া রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের নাম মুছে যাবে না, যেতে পারে না।

এখানে একটি কথা উলেল্গখ করা প্রয়োজন, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে বের হয়ে লন্ডনে যাওয়ার পর সেখানকার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, তখনও ইংল্যান্ড বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। তাই আমরা হিথের এই উদারতায় খুব বাহবা দিই। কিন্তু এটুকু ভুলে যাই যে, জনগণের দ্বারা নির্বাচিত অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করার পর বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানিরা যে নির্যাতন চালায়, তা নিয়ে ব্রিটিশ সরকার তেমন উচ্চবাচ্য করেনি। এমনকি বাংলাদেশের অনুকূলে জাতিসংঘের ভোটটিও দেয়নি।

মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তা

আরও পড়ুন

×