ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

রাজনীতি

আইনশৃঙ্খলার এই দুরবস্থা কেন?

আইনশৃঙ্খলার এই দুরবস্থা কেন?
×

খায়রুল কবীর খোকন

প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৬ মার্চ ২০২২ | ১৪:৩২

আওয়ামী লীগ টানা ১৩ বছরের বেশি সময় ধরে সরকার পরিচালনা করে যাচ্ছে। এই সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাবনতি দৃষ্টিকটুভাবেই লক্ষণীয়। দেশে চুরি-ডাকাতি, দস্যুতা, খুন-অপহরণ, ধর্ষণ, কিশোরী-তরুণীদের রাস্তাঘাটে উত্ত্যক্ত করা, হামলা করা, শিশু-কিশোরদের বলাৎকারের মতো অপরাধ বেড়েই চলেছে। যে কোনো অজুহাতে মারামারি, কারণে-অকারণে হামলা-পাল্টা হামলা, সড়ক দুর্ঘটনা ও যোগাযোগ ব্যবস্থাপনায় নৈরাজ্য থেমে নেই।

রাষ্ট্রীয় সম্পদ-সম্পত্তি দখলবাজি, নদী ও বনভূমি দখল, শিল্প-বর্জ্য পরিশোধন না করে অপসারণ ও নৈরাজ্যময় ব্যবস্থাপনায় পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড দেদার চলমান। অন্তত ৭০ থেকে ৮০ লাখ তরুণ-যুবা এবং বিভিন্ন বয়সী মানুষকে মাদকাসক্তির আগ্রাসনে ধ্বংস করে দেওয়া; মাদক-চোরকারবারের রমরমা বাণিজ্য, পর্নোগ্রাফির আগ্রাসন, তরুণ সমাজের মধ্যে স্বার্থ-দ্বন্দ্বে হানাহানির প্রবণতা, সরকারি ছাত্র সংগঠনের সন্ত্রাসী আচরণ ও নিয়মিত ক্লাস, টিউটোরিয়াল ও পরীক্ষা সম্পাদন ইত্যাদির বিঘ্ন ঘটিয়ে শিক্ষাঙ্গনে নৈরাজ্য সৃষ্টি থেমে নেই। দেশব্যাপী চাঁদাবাজি, ঘুষ-বাণিজ্য, জাল মুদ্রা তৈরি, বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে অবৈধ কারবার, এমনকি ইন্টারনেটে হ্যাকিং অবধি নতুন নতুন সাইবার অপরাধ, ধর্মীয়-জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতাদুষ্ট অপরাধসহ বিচিত্র সব অপরাধপ্রবণতা বেড়েই চলেছে।

একটি অনলাইন পত্রিকা বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপপরিষদের জরিপের বরাতে জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারি মাসে ২৮ দিনে সরকারি রেকর্ড অনুসারে ২৬৫ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে; ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৮৮ জন। এদের মধ্যে ৪৬ জন কন্যাশিশুসহ ৭৫ জন ধর্ষণের শিকার; তিনটি কন্যাশিশুসহ ১২ জন নারী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে; এক কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। একই সময়ে এর বাইরে ছয় কন্যাশিশুসহ আটজনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। এক কন্যাশিশুসহ তিনজন নারী যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। দুর্বৃত্তের অ্যাসিড হামলায় দগ্ধ হয়েছে একজন নারী। পাঁচ কন্যাশিশুসহ আটজন নারীকে উত্ত্যক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দু'জন আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। এটা কিন্তু আংশিক চিত্র। ধর্ষিত নারীদের একটা বড় অংশ বিচার না পাওয়ার আতঙ্কে এবং উল্টো নিজের ও পরিবারের সামাজিক লাঞ্ছনার ভয়ে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পরও থানা পুলিশ করতে সাহসী হয় না। তাই অভিযোগ করে না, বিচারপ্রার্থী হয় না। একই কারণে পত্রিকায় সব রিপোর্টও আসে না।

রাজধানী নগরীর প্রায় কেন্দ্রস্থল লালবাগে তরুণী অপহরণের পর দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন কয়েক দিন আগে। এর পরই গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর আগে সিলেটে সরকারি কলেজ ছাত্র হোস্টেলের ছাত্র নামধারী গুন্ডা চক্রের দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার নারীর ঘটনা এখনও আমাদের স্মৃতিতে রয়েছে। সারাদেশে অসংখ্য ধর্ষণের ঘটনা ঘটে চলেছে, কিন্তু পুলিশের মধ্যে হেলদোল নেই। তাদের রুটিন ওয়ার্ক চলছে। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে তারা 'তথাকথিত তদন্তে' নামে।

এর মধ্যে ক'টি ঘটনায় পুলিশ অপরাধীদের ধাওয়া করে অপরাধের শিকার নারীদের রক্ষায় এগিয়ে গেছে? একটা ঘটনার নজিরও তো পুলিশ দেখাতে পারবে না। কীভাবে এসব ঘটনা একের পর এক ঘটে চলেছে? পুলিশের টহল টিম কী পাহারা দেয়, কোথায় থাকে তারা? পুলিশ তো অপরাধীদের আখড়াগুলোও চেনে। আর না চেনারও তো কারণ নেই! একেকটা থানা এলাকার অপরাধী আখড়াগুলো চেনানোর যথেষ্ট সংখ্যক সোর্সও তো রয়েছে তাদের। সাধারণ নাগরিকরাও তো তথ্য দিয়ে সহায়তা করে থাকেন, যখন প্রকৃত অপরাধীদের ধরার চেষ্টায় পুলিশ আন্তরিক ও সৎ হয়। তারপরও অপরাধীরা নিয়মিত এসব অপরাধ করে পার পাচ্ছে কীভাবে? যেসব এলাকায় নারী ধর্ষণ বা শ্নীলতাহানি, এমনকি যৌন হয়রানির শিকার হতে পারে, সেগুলো তো পুলিশের চোখের সামনেই সুস্পষ্ট থাকে; দৃষ্টির বাইরের কোনো বিষয় নয় সেসব। পুলিশ এসব অপরাধীর শতভাগ না হলেও ৯০ ভাগকে চেনে। এ অপরাধী চক্রের মাথার ওপরে ছাতা ধরে রয়েছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই  ক্ষমতাসীন দলের  স্থানীয় নেতাকর্মী বা অন্যসব সমাজ নেতা।

এরই মধ্যে কয়েক দিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মানবাধিকার সংগঠন সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছে, বিগত পাঁচ মাসে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৮ শিক্ষার্থী ক্ষমতাসীন ছাত্রনেতাদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন। একই সময়ে ক্যাম্পাসে পাঁচজন সাংবাদিক দায়িত্ব পালনকালে তাদের হাতে লাঞ্ছনা ও পীড়নের শিকার হয়েছেন। ক্ষমতাধর ছাত্রনেতাদের দ্বারা বুয়েটের আবরার হত্যার স্মৃতি সবারই মনে আছে। আরও কত ঘটনা ক্যাম্পাসগুলোতে ঘটছে, কিন্তু সরকারি দল সমর্থক উপাচার্য, হল-প্রভোস্ট, প্রক্টর, কলেজ-অধ্যক্ষ ও অন্যান্য কর্তাব্যক্তির ক্ষমতাবান ছাত্র সংগঠনের গুন্ডা-গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার মুরোদ নেই। কেন নেই?

আওয়ামী লীগ সরকার চালাচ্ছে ১৩ বছর পেরিয়ে ১৪ বছর চলছে। ব্যাপক উন্নয়ন কাজ হচ্ছে- তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সেই সঙ্গে এক টাকার মাল পাঁচ টাকায় কেনা হচ্ছে কোষাগারের টাকায়। পাঁচ গুণ কী বলছি, কুড়ি গুণ দামে সরকারি ঠিকাদারি কাজের জিনিসপত্র কেনার নজির তো অসংখ্য। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের ছড়াছড়ি। কাজের কোনটা, সেটা বিবেচনার চেয়ে কোথা থেকে কত কমিশন খাওয়া যাবে, সেটাই প্রধান বিবেচ্য কর্তাব্যক্তিদের কাছে। এসব আসল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হতে পারে না। এক সময় অপকর্মগুলোর সবকিছু বেরিয়ে আসবে, তখন আফসোস করে লাভ হবে না। সর্বোপরি উন্নয়ন কাজ যতই হোক না কেন, মানুষ যদি অপরাধীদের ধাওয়ায় শান্তিতে একটু ঘুমোতে না পারে, তাহলে এসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অর্থহীন হয়ে পড়ে- সেটা যেন আমরা ভুলে না যাই।

খায়রুল কবীর খোকন: বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব, সাবেক সংসদ সদস্য ও ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক

আরও পড়ুন

×