ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

বাজার

মুনাফাখোর না শোনে কাকুতি-মিনতি

মুনাফাখোর না শোনে কাকুতি-মিনতি
×

খায়রুল কবীর খোকন

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২২ | ১২:০০

দেশে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের নাভিশ্বাস চলছে অযৌক্তিক দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বতিতে। এই শ্রেণির মানুষের নিয়মিত আয় বা বাড়তি পরিশ্রমের আয়, অতিকষ্টের সঞ্চয়ের অর্থ সবকিছু খেয়ে ফেলছে কালোবাজারি, মুনাফাখোর আর মজুতদারদের সিন্ডিকেট। প্রতিকারহীন দশায় ক্ষমতাবানরা কেবল মিথ্যা আশ্বাসে ভুলিয়ে রাখার অপচেষ্টার মধ্যে সান্ত্বনা খুঁজছেন।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সংকট এ দেশে সব সময়ই ছিল। মাঝেমধ্যে শাকসবজি বা পেঁয়াজ-রসুন-আদা, হলুদ-মরিচ ইত্যাদির কখনওবা চাল-গমের দাম দেশি কৃষকদের ক্ষেতের উৎপাদনের নতুন ফসল ঘরে ওঠার সময়কালে দু-তিন মাস সাময়িকভাবে কমে আসে। কিন্তু অচিরেই তা আবার বেড়ে যায়।
দরিদ্র, হতদরিদ্র, মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্তের এই জীবন-মরণ সংকট নিয়ে কোটি কোটি কথা খরচ হয়। প্রতিটি সরকারই কিছু না কিছু প্রতিরোধমূলক প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু ফলাফল শূন্য। টিসিবির পণ্য সরবরাহ যা চলে তা জোটে খুবই স্বল্পসংখ্যক নিম্ন আয়ের মানুষের; ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে। চাহিদার তুলনায় ১০ শতাংশ সরবরাহও কায়েম করতে পারছে না টিসিবি। কোটি কোটি দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষের সামান্য দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে না পেরে দেশব্যাপী কান্নাকাটি, আহাজারি, চিৎকার সবকিছুই দাঁড়ায়- 'মরি অসম্ভবের পায়ে মাথা কুটে'।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বছরগুলোতে ব্যবসায়ীদের মুনাফাখোরি সিন্ডিকেট সব সময়ই সক্রিয় ছিল। মাঝেমধ্যে কোনো কোনো সরকারের আমলে তারা নিজেরাই সাময়িকভাবে একটু লাগাম টেনে ধরে দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়াকে একটু সামলে রাখত নিজেদের কৌশলগত নিরাপত্তার স্বার্থেই। আসল সমস্যা হচ্ছে আমাদের ব্যবসায়ীদের মনস্তাত্ত্বিক সংকট- পুরো ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত সমগ্র জনগোষ্ঠীর মানসিক সমস্যা। তারা ধরে নিয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য তারা করেন নিজেদের পুঁজি ও শ্রম বিনিয়োগ করে, যথেষ্ট ঝুঁকি মাথায় নিয়ে। তাই তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য করে অবাধ মুনাফা অর্জনের সুযোগ পেতেই হবে। মুনাফার মাত্রাটা কী হবে; কী হলে কতটা যৌক্তিক ও সাধু-পন্থার বলে বিবেচিত হতে পারে, সে বিষয়টি তারা যুক্তি দিয়ে মানতে নারাজ। বিশ্বব্যাপী একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা-সংস্কৃতি হচ্ছে- মূল পুঁজি বিনিয়োগের পরে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার যৌক্তিক সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ মুনাফা অর্জন বিধিসংগত। কিন্তু আমাদের দেশের মজুতদার, মুনাফাখোর ও কালোবাজারি সিন্ডিকেট মনে করে, এই মুনাফা যদি ১০০ শতাংশ বা আরও বেশি মাত্রার হয়, তা যুক্তিসংগত।
সাধারণ ভোক্তা জনসাধারণ অসংগঠিত। তাদের প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষমতা নেই। আর ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের ব্ল্যাকমেইলিং প্রক্রিয়াও এমন কঠিন যে, তাদের শাস্তিদানের মাধ্যমে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা একেবারেই অসম্ভব। ব্যবসায়ীদের কাউকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অতি মুনাফাখোরির শাস্তিদানের লক্ষ্যে জেল-জরিমানা করতে গেলে অথবা আদালতে নিয়ে বিচারের লক্ষ্যে গ্রেপ্তার করতে গেলে তারা অসাধু সিন্ডিকেট সক্রিয় করে সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও বেশি নৈরাজ্য সৃষ্টির চক্রান্ত করে ফেলে। ফলে কৃত্রিম সংকট বেড়ে গিয়ে বাজার পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে। এমনকি চাল-ডালের সরবরাহ একেবারে বন্ধ করে দিয়ে দুর্ভিক্ষাবস্থা অবধি সংকট বিস্তৃত করতে পারে এই মুনাফাখোর সিন্ডিকেট- সেই আতঙ্ক সরকার-প্রশাসনের মধ্যে সদা ভীতি সৃষ্টি করে রাখে।
ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন চেম্বার প্রতিষ্ঠান প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে এই সিন্ডিকেটের পক্ষেই কাজ করে; করতে বাধ্য হয়। চেম্বারগুলোতে এমনকি ফেডারেশন-বডিতে অল্পকিছু ভালোমানুষ রয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই শিল্পোদ্যোক্তা। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। তারা কিছুটা হলেও এসব কালোবাজারি, মুনাফাখোর সিন্ডিকেটের বাইরের লোক। কিন্তু পরবর্তী নির্বাচনে বিভিন্ন চেম্বার সদস্যদের ভোট হারানোর আশঙ্কার কথা ভেবে অনেকেই এসব সংকটের সময়ে দায়ী অপরাধী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সপক্ষে জোরালো অবস্থান নিতে ভয় পান। আর বিভিন্ন দলীয় রাজনৈতিক সরকারের আমলে তাদের কোনো ব্যবসায়ী নেতার স্বার্থে এমনকি কখনওবা বিশাল চাঁদা পাওয়ার স্বার্থেও এই বাজার-অনাচার বেড়ে যায়।
এমন পরিস্থিতিতে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি কয়েক দিন আগে এক জনসমাবেশে বলেছেন, যদি অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট সক্রিয় না হয় তাহলে দ্রব্যমূল্য অচিরেই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে আসবে। মন্ত্রীর আশ্বাসের নমুনা দেখে সেই পুরান ঢাকার রসিক-ঘোড়াগাড়িচালকের সরস-বিদ্রুপের উক্তিটি মনে আসবে সবার- 'সাব, আস্তে কন; হুনলে ঘোড়ায় ভি হাসবো।' আমাদের বিত্তবান ও ব্যবসায়ী বাণিজ্যমন্ত্রীর এহেন সান্ত্বনা বাণীর পরে যে কেউই এ কথা বলে বসতে পারেন!
এ দেশে মজুতদার, মুনাফাখোর সিন্ডিকেট সক্রিয় আবার কবে না ছিল? কবে তারা নিষ্ফ্ক্রিয় ছিল? মন্ত্রী-আমলাদের হাতজোড় করা কাকুতি-মিনতি কি শোনার সময় আছে মুনাফাখোরদের!
খায়রুল কবীর খোকন: বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব; সাবেক সংসদ সদস্য ও ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক

আরও পড়ুন

×