রাষ্ট্রচিন্তা
জাতীয়তাবাদ সর্বজনীন হলো না
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৮ এপ্রিল ২০২২ | ১৪:৪৭
জাতি সমস্যার মীমাংসা দেশভাগের মধ্য দিয়ে করার উপায় ছিল না। সাতচল্লিশের পরে ভারতের দেশি শাসককর্তারা অঙ্গীকার করেছিলেন, দেশে তারা একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়ে তুলবেন। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে তারা বুঝিয়েছেন সব ধর্মকে সমান মর্যাদা দান; যার অর্থ গিয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্ম চর্চাকে উৎসাহিত করা। মহাত্মা গান্ধী অসাম্প্রদায়িক ছিলেন, কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন না। তার অসাম্প্রদায়িকতাকে কট্টরপন্থি হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা সহ্য করতে পারেনি। তারা তাকে হত্যা করেছে। আর ওই হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত ছিল, তাদের উত্তরাধিকারীরা শেষ পর্যন্ত স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতা করতলগত করতে সমর্থ হয়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছেন যে মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ, মনে মনে তিনি হয়তো আশা করেছিলেন, পাকিস্তানে একটি ধর্মনিরপেক্ষ পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ গড়ে তুলবেন। কিন্তু কাজটা ছিল ঠিক ততটাই অবাস্তবিক, যতটা অবাস্তবিক ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রকে স্থায়ী করে রাখার স্বপ্টম্ন। কারণ পাকিস্তান কোনো একটি জাতির দেশ ছিল না। যেখানে বাঙালি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পাঠান ও বালুচ- এই পাঁচটি বসবাস জাতি ছিল, যাদের ভাষা এক নয়, স্বতন্ত্র বটে। জিন্নাহ এবং তার অনুসারীরা ভেবেছিলেন উর্দু ভাষাকে কেন্দ্রে রেখে তার সাহায্যে নতুন একটি জাতির প্রতিষ্ঠা ঘটাবেন। কিন্তু অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা সে প্রস্তাবটিকে উত্থাপনের সঙ্গে সঙ্গেই নাকচ করে দিয়েছেন।
বাঙালি ভেবেছিল, পাকিস্তান তাদের মুক্তি দেবে। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই তারা টের পেয়েছে, ওই আশা মরীচিকা মাত্র। তখন তারা ভাষাভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের পতাকাতলে একত্র হয়েছে এবং আন্দোলন করেছে। যার ফল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাঙালিদের শ্রেণি সমস্যার সমাধান করেনি। বাঙালি জাতীয়তাবাদের অনুভূতিটা ছিল মূলত মধ্যবিত্তের। তাদের দ্বারা বিকশিত এবং তাদের স্বার্থসংবলিত; তাতে মেহনতি মানুষকে নামে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও তাদের স্বার্থ কার্যত সংরক্ষণ সম্ভব ছিল না। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ফলেই বাংলাদেশের অভ্যুদয়, কিন্তু ওই জাতীয়তাবাদী সাফল্যে শ্রেণিভেদের অবসান ঘটেনি। সেটা বরং বৃদ্ধিই পেয়েছে। বাংলাদেশে উন্নতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এবং বলা যায়, তাকে পেছনে ফেলেই বৈষম্যের বৃদ্ধি ঘটেছে। এমন আগে কিন্তু ছিল না। বৈষম্য বৃদ্ধির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও স্থির প্রমাণ হচ্ছে তিন ধারার শিক্ষা। আর বৈষম্য বৃদ্ধির কারণ হলো, এটা যে উন্নতির গৃহীত দর্শন ও ধরন দুটোই দাঁড়িয়েছে পুঁজিবাদী।
বাংলাদেশের জন্য আসলে যেটা প্রয়োজন ছিল, জাতীয়তাবাদের অর্জনকে সমাজতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাওয়া। বলা বাহুল্য, সে কাজটা জাতীয়তাবাদীদের কাছ থেকে মোটেই প্রত্যাশিত নয়। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সামাজিক বিপ্লব আবশ্যক। সে বিপ্লব এ দেশে ঘটেনি। বড় রাষ্ট্র ভেঙে ছোট রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘটেছে, কিন্তু মানুষের মুক্তির জন্য যে সামাজিক বিপ্লব আবশ্যক ছিল, সেটা ঘটানো সম্ভব হয়নি। বরং দেখা গেছে, নতুন রাষ্ট্র পুরোনো রাষ্ট্রের চাইতে অধিকতর তীব্রতার সঙ্গে সামাজিক বিপ্লবকে প্রতিহত করার দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামলে, ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে যে সামাজিক সম্পর্ককে স্থায়ী করার চেষ্টা হয়েছিল, সেটাই বহাল রয়েছে। সুযোগপ্রাপ্ত ও সুযোগবঞ্চিতদের মধ্যকার সম্পর্কটা তখন দাঁড়িয়েছিল জমিদার ও প্রজার; সে সম্পর্ক সর্বত্র পুনরুৎপাদিত হচ্ছে, বিরামহীন গতিতে। সামাজিক বিপ্লব সম্পন্ন করার দায়িত্ব জাতীয়তাবাদীদের নেওয়ার কথা নয়। তাদের ভেতর যারা দক্ষিণপন্থি তারা তো পুরো মাত্রাতেই বিপ্লববিরোধী। উদারপন্থিরা কিছুটা ছাড় দিতে প্রস্তুত; কিন্তু সমাজতন্ত্রের ব্যাপারে তাদের রয়েছে অন্তর্গত অনীহা। উদারনীতিরা যতই উদার হোন না কেন, সমাজতন্ত্রী হওয়ার জন্য যে দুয়ারটা পার হওয়ার দরকার, সেখানে এসে থেমে যান, সংশয়ে। মানুষের কল্যাণের চিন্তায় যাদের হৃদয় আর্দ্র হয়, তারাও যে সরাসরি সমাজতন্ত্রী হবেন এমনটা সহজ কাজ নয়, বিশেষভাবে কঠিন তাদের জন্য যারা আর্থিক সাফল্য অর্জন করেছেন- পুঁজিবাদী কায়দায় লুণ্ঠন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কিছু পরিমাণে শিল্পোদ্যোগের ভেতর দিয়ে। পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে কিন্তু সমাজতন্ত্রীরা আগাগোড়াই সক্রিয় ছিলেন। শুধু সক্রিয় ছিলেন কেন বলছি, তাদের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্টের বিজয়, ঊনসত্তরে আইয়ুববিরোধী অভ্যুত্থান- সবখানেই সমাজতন্ত্রীরা ছিলেন চালিকাশক্তি। একাত্তরের যুদ্ধেও তারা শুধু যে লড়াই করেছেন তাই নয়, লড়েছেন তারা দেশের ভেতরে থেকেই, জাতীয়তাবাদীদের অধিকাংশই যেটা করেননি। সমাজতন্ত্রীদের বড় ব্যর্থতাটা এইখানে, মুক্তির ওই আন্দোলনে তারা নেতৃত্ব দিতে পারেননি। প্রধান কারণ রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন। রাষ্ট্র কমিউনিস্টদের এক নম্বর শত্রু মনে করেছে। সরকার বদলেছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনড় রয়ে গেছে। দ্বিতীয় কারণ বুর্জোয়াদের বিদ্বেষ। সবচেয়ে বড় কারণ অবশ্য নিজেদের অনৈক্য ও তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি। রুশ-চীন বিভাজন কমিউনিস্টদের পরস্পরবিরোধী দুই ভাগে ভাগ করে দিল। ফলে পুঁজিবাদীদের বিরুদ্ধে তাদের লড়াইটার যে ক্ষতি হলো, তা অপূরণীয় ও আত্মবিনাশী।

বস্তুত খাঁটি বাঙালি জাতীয়তাবাদী কিন্তু এই সাধারণ মানুষরাই। বিশেষ করে মেহনতিরা, যাদের এই দেশের মাটিতেই জন্ম এবং যারা দেশের বাইরে অন্য কোথাও স্থান পাবে না বলে জানে, পাওয়ার কথা ভাবেও না এবং যারা বাংলা ভাষা ভিন্ন অন্য কোনো ভাষা ব্যবহার করে না। জাতীয়তাবাদ গরিব মানুষকে তো নয়ই, ধনীদেরও মুক্তি দিতে পারল না। কারণ জাতীয়তাবাদ সর্বজনীন হলো না; শ্রেণি বিভাজন ভাঙতে পারল না। পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ সুবিধা করে দিয়েছে ধনীদের, বাঙালি জাতীয়তাবাদও সেই দায়িত্ব পালন থেকে অব্যাহতি পায়নি। ভেতরের কারণটা হলো পুঁজিবাদের তৎপরতা। জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের ধারণা তারা একটি জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। জাতি রাষ্ট্র নয়, প্রতিষ্ঠা করার কথা ছিল কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের; যেখানে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটবে এবং ধর্ম, বর্ণ ও লিঙ্গ নির্বিশেষে সব নাগরিকের থাকবে সমান অধিকার ও সুযোগ। পাকিস্তান ছিল একটি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র, সব ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল রাজধানীতে, প্রথমে করাচিতে, পরে ইসলামাবাদে; বাংলাদেশেও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত রয়ে গেছে রাজধানী ঢাকাতেই। পাকিস্তান শাসন করত আমলা ও ব্যবসায়ীরা; বাংলাদেশের অবস্থাটাও ওই একই রকমের। জাতিরাষ্ট্রের বাঙালি জাতীয়তাবাদী ধারণাটা ভ্রান্ত এদিক থেকেও যে, সংখ্যার দিক থেকে যত ক্ষুদ্রই হোক এখানে এমন কয়েকটি জাতিসত্তা আছে যারা বাঙালি নয়; তাদের বাঙালি বানাতে চাওয়াটা জাতিগত হবে নিপীড়নেরই নামান্তর। তা ছাড়া এটা তো একটা স্বীকৃত সত্য যে, এ যুগে এক জাতি এক রাষ্ট্র এমন ব্যবস্থা আর সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের ভেতর একটি জাতির প্রাধান্য থাকবে ঠিকই, কিন্তু অন্য জাতির মানুষরা যে বিদায় হয়ে যাবে, এমনটি ঘটবার উপায় নেই।
বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রত্যয়টি নিয়ে যারা অস্বস্তিতে পড়েছিলেন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণাটিকে সামনে এনে তারা স্বস্তির দেখা পেয়েছিলেন। তাদের ভাবখানা ছিল এই রকমের, বাংলাদেশে যেহেতু কেবল বাঙালিরা নেই, অন্যরাও আছে, তাই এ দেশের জাতীয়তাবাদ বাঙালি হতে পারে না, তাকে হতে হবে বাংলাদেশি। যেন তারা খুবই অসাম্প্রদায়িক, অত্যন্ত উদার। কিন্তু আসলে তারা যা চাচ্ছিলেন তা হলো, বাঙালি পরিচয়টাকে কিছুটা হলেও খাটো করতে, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের থেকে আমরা যে আলাদা, সেই পরিচয়টা তুলে ধরতে। তাদের বক্তব্য ছিল এ রকমের, ভাগ্যিস পাকিস্তান হয়েছিল, তা না হলে তো বাংলাদেশ হতো না। কিন্তু তাদের চেষ্টা সত্ত্বেও বাঙালিকে বাংলাদেশি করে তোলা সম্ভব হয়নি; বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ যে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের মতোই অবাস্তব একটি প্রকল্প, অচিরেই তা প্রমাণ হয়ে গেছে। বাঙালি বনাম বাংলাদেশি প্রশ্নের সমাধানটা ছিল স্বাভাবিক এবং সেটাই ঘটেছে। সমাধানটি হলো এ রকমের :বাঙালিরা একটি স্বতন্ত্র জাতি, যাদের ভাষা বাংলা; কিন্তু যে বাঙালিরা বাংলাদেশে বসবাস করে, রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে তারা বাংলাদেশি বটে। রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও জাতীয়তা যে এক ব্যাপার নয়, তা এখন সারাবিশ্বই মেনে নিয়েছে। বাঙালিদের পক্ষে বাংলাদেশি হতে কোনো অসুবিধা নেই। তবে সেটা তাদের রাষ্ট্রীয় পরিচয়, জাতীয় পরিচয় নয়। একইভাবে বাংলাদেশে যে অবাঙালিরা বসবাস করে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে তারা বাংলাদেশি, কিন্তু জাতীয় পরিচয়ে বাঙালি নয়। সবকিছু মিলিয়ে জাতীয়তাবাদের উদ্বেগ যে কান্নায় পরিণত হওয়ার পথে রয়েছে তাতে সন্দেহ কী! কান্না থামাবার উপযুক্ত পথ হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সৃষ্টির লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলা, অন্যকিছু নয়।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
