ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জনপ্রশাসন

আমলারা কেন রাজনৈতিক খেলার পুতুল?

আমলারা কেন রাজনৈতিক খেলার পুতুল?
×

মোশতাক আহমেদ

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০

তথ্য সচিব মো. মকবুল হোসেনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। আচমকা এ সিদ্ধান্তে স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মাঝে এক ধরনের অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়েছে বলে অনুভূত হচ্ছে। পরিস্থিতি তুলে ধরতে সমকালের শিরোনামটিই যথেষ্ট- 'থমথমে প্রশাসনে ফিসফাস'। (১৮ অক্টোবর, ২০২২)। সব জায়গাতেই এ নিয়ে আলোচনা- কেন এমন হলো! এই 'কেন' খুঁজতে গিয়ে অনিবার্যভাবেই ছড়াচ্ছে গুজবের ডালপালা। এমনও শোনা যাচ্ছে, জনপ্রশাসনের আরও অন্তত ১০ জন সিনিয়র কর্মকর্তা নাকি মকবুল হোসেনের ভাগ্য বরণের অপেক্ষায়।
মকবুল হোসেনের মতো সচিব পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তার এমনতর বাধ্যতামূলক অবসরবরণের নজির নিকট অতীতে আছে বলে আমার জানা নেই। কয়েক বছর আগে, খুব সম্ভবত ২০১২ সালে চারজন সচিবকে ইস্তফা দানে বাধ্য করা হয়েছিল। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল। আশা করা হয়েছিল, সরকার তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে। তা না করে তাঁদেরকে সসম্মানে বিদায়ের নিমিত্তে ইস্তফা দিতে বলা হয়েছিল এবং তাঁরা জালিয়াতির অভিযোগ নিয়েও সম্মানের সঙ্গে বিদায় নিয়েছিলেন। কিন্তু মকবুল হোসেনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগের কথা এখনও শোনা যায়নি।
যখন কোনো অভিযোগ ছাড়াই কাউকে এভাবে বিদায় নিতে হয়; স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া হয়, তাঁর বিরুদ্ধে অধিকতর গুরুতর কোনো অভিযোগ আছে। সেই অধিকতর গুরুতর অভিযোগটা যে রাজনৈতিক, তা ভাবা যায়। মকবুল হোসেনের বিরুদ্ধে যেহেতু প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড-সংশ্নিষ্ট কোনো অভিযোগের কথা এখনও শোনা যায়নি; ধরে নেওয়া যায়, তাঁর বিষয়টিও রাজনৈতিক। আতঙ্কের কারণটা ওখানেই।
পত্রিকান্তরে যেসব খবর বেরিয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, মাঠ প্রশাসন থেকে সচিবালয়; সব জায়গাতেই জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা অনেকের মধ্যেই গত কয়েক দিনে এই বাধ্যতামূলক অবসরের আশঙ্কা সংক্রমিত হয়েছে। এই নিবন্ধ যেদিন লিখছি, সেদিনও খবর প্রকাশ হয়েছে- পুলিশ সুপার পদমর্যাদার তিন কর্মকর্তাকেও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। খবরের শিরোনাম- এবার 'জনস্বার্থে' অবসর তিন পুলিশ কর্মকর্তার। (সমকাল, ১৯ অক্টোবর, ২০২২)।
এটি যে সার্বিকভাবে প্রশাসনের জন্য মঙ্গলবার্তা নয়, তা বলা বাহুল্য। বিশেষ করে যখন নির্বাচন কমিশন ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী ২০২৪-এর জানুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, এ সময়ে সরকারের এমনতর সিদ্ধান্ত জনমনে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
অনেকেই মনে করছেন, আগামী নির্বাচন নিয়ে সর্বস্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের একটা বার্তা দিতে চেয়েছে সরকার। বার্তাটা এমন- সোজাসাপ্টা কথা, আমাদের কথামতো কাজ; নইলে মকবুলের ভাগ্য বরণ করতে হবে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, আমাদের জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে কারও কারও এমন ভাগ্য বরণের আশঙ্কা তত বাড়তে থাকবে। এ ধরনের আশঙ্কা বিরাজ করতে থাকলে আমলাতন্ত্রে কাজের গতি যে কমে যাবে, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা হচ্ছে, সব দল-সরকারই নির্বাচনের আগে নিজের মতো করে মাঠ সাজিয়ে নিতে চায়। এর অংশ হিসেবে প্রথমেই নজর দেয় প্রশাসনের দিকে। কাকে কোথায় বসাতে হবে, কাকে দিয়ে কী কাজ হবে; শুরু হয় এ চিন্তাভাবনা।
মনে পড়ে, ২০০১ সালে লতিফুর রহমান যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন; প্রথম রাতেই ১০-১১ জন সচিবকে বদলির নথিতে স্বাক্ষর করেন। এ নিয়ে তখন খুব হইচই হয়েছিল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এর মাঝে পদ্মা-যমুনায় অনেক জল গড়িয়েছে। অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে প্রশাসনের কর্মকর্তারা বদলি এমনকি বাধ্যতামূলক অবসরের আশঙ্কায় ভুগতে থাকেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের চেয়ে বেশি নজর দেন রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষকে খুশি করার কাজে। এতে সার্বিকভাবে জনকল্যাণমুখী কাজ ব্যাহত হয়।


এখন প্রশ্ন- এ থেকে উত্তরণের উপায় কী? বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তাতে প্রচলিত ব্যবস্থায় এ থেকে উত্তরণের কোনো অবকাশ আছে বলে মনে করি না। এ দেশ যখন ব্রিটিশের অধীনে একটা উপনিবেশ ছিল, তখনকার আমলাতন্ত্রের কাজই ছিল প্রভুর মনোরঞ্জন করা। তখন যেহেতু কোনো রাজনৈতিক সরকার ছিল না এবং প্রভুও ছিল একজন; আমলাতন্ত্রের এতে কোনো অসুবিধা হয়নি। যাঁরা ইংরেজ প্রভুদের এই দাসত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না, তাঁরা ওই জগতে হাঁটতে গিয়েও হাঁটেননি। যেমন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কিংবা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় তার কোনো অবকাশ নেই।
কিন্তু এখন গণতন্ত্রের যুগ। প্রভুও আগের মতো একমেবাদ্বিতীয়ম নয়। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর প্রভু বদলায়। তাই আমলাতন্ত্র পড়ে অসুবিধায়। রাজনৈতিক খেলার পুতুল হয়ে পড়েন বেশিরভাগ আমলা। নতুন প্রভুর মর্জি ও চাহিদা অনুযায়ী অনেক সময় নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে বেগ পেতে হয়। ফলে কখনও কখনও সামান্য ভুলের জন্য অসামান্য খেসারত
দিতে হয়।
সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বা সদ্য স্বাধীন দেশে আমলাতন্ত্রের এই সংকটের কথা ভেবেই হয়তো মার্কিন প্রেসিডেন্ট এন্ড্রু জ্যাকসন সেই উনিশ শতকের তৃতীয় দশকেই চালু করেন 'স্পয়েলস সিস্টেম অব পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন'। ১৮২৯ সালে ক্ষমতায় বসেই তিনি ৯১৯ জন আমলাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। তাঁর কথা ছিল- আমলাতন্ত্র যদি রাজনৈতিক সরকারের নীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারে, তাহলে সেই আমলাতন্ত্রকে দিয়ে জনগণের কল্যাণ হতে পারে না।
এই ধারণার পক্ষে-বিপক্ষে বিস্তর যুক্তি রয়েছে। কিন্তু প্রতিটা দেশকে তার নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা মেনে নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমলাতন্ত্র ছাড়া যেমন দেশ চলতে পারে না, তেমনি বাংলাদেশে এর যে অবস্থা, তা দিয়েও জনকল্যাণ হতে পারে না। তাই প্রয়োজন এর আমূল সংস্কার। জ্যাকসনীয় ব্যবস্থা না হলেও এর বাংলাদেশি সংস্করণ এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
আমলাতন্ত্রের একটা নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত আমলারা প্রজাতন্ত্রের সেবক থাকেন। তার ওপরে গেলেই হয়ে যান দলীয় সেবক। এর ফলে প্রায় প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের আগে-পরে উত্তরা ষড়যন্ত্র, সচিবালয় ষড়যন্ত্র, রেস্টুরেন্ট ষড়যন্ত্র প্রভৃতি নামে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য আশঙ্কার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। আর এর শিকার হন কিছু নিরীহ আমলা। তার চেয়ে সেই ভালো; ব্যবস্থা বদলে মার্কিন আদলে 'স্পয়েলস সিস্টেম' চালু করা হোক। যাঁরা চাকরিরত অবস্থায় দল করতে চান, প্রকাশ্যেই করুন। জনগণও জানুক, তাঁরা কারা বা কার লোক। তাহলে কর্মক্ষেত্রে শুধু শুধু ঘোমটা দিয়ে পরিচয় ঢাকার দরকার পড়বে না।
মোশতাক আহমেদ: সাবেক আমলা ও জাতিসংঘ কর্মকর্তা
[email protected]

আরও পড়ুন

×