হামে মৃত্যুর তদন্ত
শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করুন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ | ০৭:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে হামের টিকার সংকট এবং চারশত শিশুর মৃত্যুর ঘটনা খতাইয়া দেখিবার সরকারি পদক্ষেপকে আমরা স্বাগত জানাই। রবিবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘হামের প্রাদুর্ভাব ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানাইয়াছেন, ইতোমধ্যে এই তদন্ত শুরু হইয়াছে, যেইখানে উক্ত শিশুমৃত্যুর পশ্চাতে কোনো অবহেলা আছে কিনা; থাকিলে কে দায়ী, তাহা নিশ্চিত করা হইবে। যদিও তদন্ত কমিটি কবে হইয়াছে, কাহারা ইহাতে আছেন ইত্যাদি তথ্য জানান নাই তিনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, গত ১৫ মার্চ হইতে দেশে হামের উপসর্গ দেখা দিয়াছে সাড়ে ৪৭ সহস্র শিশুর শরীরে, যাহাদের মধ্যে সাড়ে ৩৩ সহস্র শিশু হাসপাতালে ভর্তি হইয়াছে। উক্ত সময়ে হাম শনাক্ত হইয়াছে প্রায় সাত সহস্র শিশুর শরীরে এবং হাম ও হামের উপসর্গে গত ১৫ মার্চ হইতে ১০ মে পর্যন্ত দেশে চারশত শিশুর মৃত্যু ঘটিয়াছে। বেসরকারি হিসাবে এই মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি হইতে পারে। উপরন্তু রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট- আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলিয়াছেন, চলমান হামের প্রাদুর্ভাব আরও এক হইতে দুই মাস থাকিবে। তাহা প্রতিরোধে এখনই উপযুক্ত পদক্ষেপ গৃহীত না হইলে নিয়ন্ত্রণযোগ্য এই রোগে কোমলমতি শিশুদের মৃত্যুর মিছিল চলিতেই থাকিবে।
বিগত কয়েক দশক যাবৎ হামসহ বিভিন্ন রোগের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি পালিত হওয়ার কারণে দেশে বিশেষত ৫ বৎসরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পাইয়াছিল। অন্তত সেই সময়ে হামের প্রাদুর্ভাব বর্তমান সময়ের ন্যায় মহামারির রূপ ধারণ করে নাই। আমরা জানি, সাফল্যের সহিত পরিচালিত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কারণেই এহেন সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ করা গিয়াছিল। তবে গত দুই বৎসরে বিশেষত অন্তর্বর্তী সরকারের ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের কারণে সময়মতো টিকা ক্রয় না করায় ইপিআই কর্মসূচি অনেকাংশে স্থবির হইয়া পড়িয়াছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিতভাবে দেশের ৯ মাস বয়সী শিশুদের হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। টিকাকে কার্যকর করিতে হইলে ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনিতে হয়; বাস্তবে তাহা হয় নাই।
হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৮৫ শতাংশই ৫ বৎসরের কম বয়সী, যে শিশুদের ৬৫ শতাংশ উক্ত সময়ে কোনো টিকাই পায় নাই; আর ২১ শতাংশ আংশিক টিকাপ্রাপ্ত। আমরা ইহাও জানি, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি হইতে বাদ পড়া শিশুদের জাতীয় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকার আওতায় আনা হয়। সর্বশেষ ক্যাম্পেইন হইয়াছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বর হইতে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে। পরবর্তী ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে। কিন্তু তারিখ পরিবর্তন করিয়া নেওয়া হয় সেপ্টেম্বরে। দুর্ভাগ্যবশত, টাইফয়েডের টিকা ক্যাম্পেইনের অজুহাতে তাহা পুনরায় স্থগিত করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে সরকার উক্ত তদন্তকার্য শুরু করিয়া গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছে। আমাদের প্রত্যাশা, তদন্তকার্য অত্যন্ত স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হইবে এবং স্বাস্থ্য সচিব যদ্রূপ বলিয়াছেন, তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশিত হইবে।
তবে এই মুহূর্তে আশু করণীয় হইল, শিশুদের যে কোনো মূল্যে রক্ষা; হামের বিরুদ্ধে তাহাদের ইমিনিউটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। টিকা কর্মসূচি চালাইয়া যাইতে হইবে। তৎসহিত হাম মোকাবিলায় ব্যবস্থাপনা কৌশলের অংশ হিসাবে আক্রান্ত শিশুর জন্য বাধ্যতামূলক ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনও চালাইতে হইবে। ছয় মাস শিশুকে স্তন্যদান এবং নিয়মিত অন্যান্য টিকাদানের ব্যবস্থাও জরুরি ভিত্তিতে করিতে হইবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
