ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

গ্যাস বিস্ফোরণ

মৃত্যুর মিছিল থামাইতে হইবে

মৃত্যুর মিছিল থামাইতে হইবে
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ০৭:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

গ্যাস বিস্ফোরণে দগ্ধ হইয়া দেশে প্রাণহানি থামিতেছে না। এইবারের ঘটনাস্থল নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা; যেখানে রবিবার আটতলা ভবনের নিচতলার একটি ফ্ল্যাটে গ্যাস বিস্ফোরণে একই পরিবারের পাঁচজন দগ্ধ হইবার ঘটনা ঘটিয়াছে। সোমবার সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানাইয়াছে, দগ্ধদের মধ্যে বাবা মীর কালাম জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে মৃত্যুবরণ করিয়াছেন। নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরিফিনকে উদ্ধৃত করিয়া সোমবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হইতেছে, উক্ত ফ্ল্যাটের রান্নাঘরের গ্যাস লাইনে ছিদ্র বা ত্রুটি ছিল। বদ্ধ ঘরে জমিয়া থাকা গ্যাস কোনো একটি আগুনের উৎসের সংস্পর্শে আসিলে উক্ত বিস্ফোরণটি ঘটে। জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান জানাইয়াছেন, কালামের শ্বাসনালিসহ শরীরের ৯৫ শতাংশ দগ্ধ হইয়াছিল। বর্তমানে কালামের স্ত্রী সায়মা ৬০ শতাংশ, পুত্র মুন্না ৩০ শতাংশ এবং দুই কন্যা কথা ৫২ শতাংশ ও মুন্নি ৩৫ শতাংশ দগ্ধ হইয়া তথায় ভর্তি রহিয়াছেন। তাহাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। 

স্মরণ করা যাইতে পারে, ২০২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাত্রিবেলায় এই ফতুল্লারই এক মসজিদে অনুরূপ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটিয়াছিল। সেই দুর্ঘটনায় ৩৪ জনের মৃত্যু হইয়াছিল। অনুসন্ধানে জানা গিয়াছিল, মসজিদের নিচের পরিত্যক্ত গ্যাসলাইন হইতে গ্যাস জমিয়া উক্ত বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটিয়াছিল। অত্যন্ত বিয়োগান্ত উক্ত দুর্ঘটনার পর তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ নারায়ণগঞ্জব্যাপী গ্যাস লাইনের ত্রুটি চিহ্নিতকরণে অভিযানে নামিয়াছিল। দুঃখজনক হইল, অন্য বিষয়সমূহের ন্যায় ইহা লইয়াও জনপরিসরে আলোচনা বন্ধ হইলে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের সেই অভিযান থামিয়া যায়। রবিবারের হৃদয়বিদারক ঘটনাটি উহারই ফল বলিলে সম্ভবত ভুল হইবে না।

গ্যাস লাইনের ছিদ্র বা ত্রুটি হইতে সৃষ্ট আগুনে মৃত্যুর ঘটনা দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় নিয়মিত বিরতিতে ঘটিয়া চলিতেছে। গত বৎসরের ১ ফেব্রুয়ারি সাভারের আশুলিয়ায় আবাসিক ভবনে গ্যাস বিস্ফোরণে শিশুসহ ১১ জন দগ্ধ হন এবং ৯ ফেব্রুয়ারি মাদারীপুরে সিলিন্ডারের পাইপ ফাটিয়া (লিকেজ) বিস্ফোরণে দগ্ধ হন একই পরিবারের তিনজন। ২০২১ সালের ২৭ জুন রাজধানীর মগবাজারে একটি ভবনে তিতাস গ্যাসের পাইপের ত্রুটি হেতু বিস্ফোরণে ১২ জনের প্রাণহানি ঘটিয়াছিল। ২০১৯ সালের অক্টোবরে বিক্রেতা এলপিজি সিলিন্ডার হইতে বেলুনে গ্যাস পূর্ণ করিবার সময় বিস্ফোরণে সাত শিশুর মৃত্যু হয়। ইহা বলিলে অত্যুক্তি হইবে না, এই সকল বিস্ফোরণ ও মৃত্যুর সম্পূর্ণ হিসাব কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষই যথাযথ সংরক্ষণ করে না। তবে গত বৎসর প্রকাশিত ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্যমতে, পূর্ববর্তী পাঁচ বৎসর গ্যাস লাইন ও সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ হইতে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৪৪ জন মৃত্যুবরণ করিয়াছেন; আহত শতাধিক। 

আমরা দেখিয়াছি, প্রাকৃতিক গ্যাসের স্বল্পতার কারণে সাম্প্রতিক বৎসরগুলিতে ‘সিলিন্ডার গ্যাস’ নামে পরিচিত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস-এলপিজি বেশ জনপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছে। বিশেষত মানহীন সিলিন্ডার ও নিরাপদ ব্যবহারবিধি সম্পর্কিত গ্রাহকের অজ্ঞতার কারণে উহা এক প্রকার মৃত্যুদূতে পরিণত হইয়াছে। একই কারণে ফিলিং স্টেশনে পরিবহনে গ্যাস পূর্ণ করিবার সময়ও দুর্ঘটনা ঘটিতেছে। হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন গ্যাসের সিলিন্ডারও কখনও কখনও বিস্ফোরিত হয়। দুর্ভাগ্যবশত একটা নির্দিষ্ট বিরতিতে এই সকল সিলিন্ডার পরীক্ষণের নিয়ম থাকিলেও তাহা কদাচিৎ পালিত হয়। এমনকি স্থানীয় পর্যায়ে অনেক ব্যবসায়ী অনুমোদনের তোয়াক্কা না করিয়া নিজেরাই সিলিন্ডারে গ্যাস পূর্ণ করিয়া বিক্রয় করিতেছেন। বলা যাইতে পারে, গ্যাসের ত্রুটিপূর্ণ পাইপলাইন, মানহীন সিলিন্ডারের কারণে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের মানুষ কার্যত বারুদের স্তূপে বসবাস করিতেছেন।

আমরা মনে করি, পাইপলাইন বা সিলিন্ডার; সকল প্রকার গ্যাস ব্যবহার নিরাপদ করা জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। এই লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট তদারক সংস্থাসমূহকে পুনর্বিন্যাসের পদক্ষেপ সময়ের দাবি।

আরও পড়ুন

×