হকার ব্যবস্থাপনা
ফলেন পরিচয়তে
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ | ০৭:৩৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
হকার লইয়া রাজধানীতে যেই ধরনের নৈরাজ্য চলমান, সেইখানে শৃঙ্খলা ফিরাইবার চেষ্টাকে আমরা সতর্কতার সহিত স্বাগত জানাই। মঙ্গলবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফি দিয়া হকারদের ফুটপাতে বসাইবার নীতিমালা গ্রহণ করিয়াছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। সেইখানে বলা হইয়াছে, কেবল নিবন্ধিত হকাররা সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত জায়গায় নির্দিষ্ট সময়ে ব্যবসা করিতে পারিবেন। সিটি করপোরেশন ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এই যৌথ উদ্যোগ কতখানি সফল হইবে, দেখিবার বিষয়। আমরা ইতোপূর্বে রাজধানীতে অনুরূপ ব্যবস্থা দেখিয়াছিলাম। বহুল আলোচিত ‘ওয়ান ইলেভেন’ সরকারের সময় ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে হকার পুনর্বাসনের অংশ হিসাবে পাঁচটি নির্দিষ্ট সড়কে ‘হলিডে মার্কেট’ প্রবর্তিত হইয়াছিল। সেই সরকারেরই শেষের দিকে উহা বিশৃঙ্খলায় পতিত হয় এবং ক্রমান্বয়ে সমগ্র নগরীর ফুটপাত পুনর্দখলে চলিয়া যায়। এই দফায় উহার পুনরাবৃত্তি প্রত্যাশিত নহে।
যাহা আশঙ্কার বিষয়, যেই পদ্ধতিতে সিটি করপোরেশন হকার ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ লইয়াছে, উহা কতটা কাজে আসিবে– এই প্রশ্ন ইতোমধ্যে উঠিয়াছে। কারণ এই ব্যবস্থাপনায় রাজধানীর কেবল এক-তৃতীয়াংশ হকার বসিবার সুযোগ পাইতে পারেন। সেই কারণে বাকিরা উচ্ছেদের শিকার হইলেও তাহাদের অন্তর্ভুক্ত করিয়া বিকল্প ব্যবস্থাপনায় লইতে হইবে। নচেৎ চলমান চাঁদাবাজি বন্ধ হইবে না এবং হকারদের সহিত পথচারীদের মুখোমুখি দাঁড় করিবার অবকাশ থাকিবে। এই ক্ষেত্রে ভারত, থাইল্যান্ড, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশে হকার আইন রহিয়াছে। ঐ সকল দেশে কীরূপে তাহারা হকার ব্যবস্থাপনা করিতেছে, উহাও বিবেচ্য।
স্বীকার্য, রাজধানীতে নগরবাসীর চলাচলের জায়গা তথা ফুটপাত দখল করিয়া ব্যবসা এবং উহা ঘিরিয়া চাঁদাবাজি, অব্যবস্থাপনা ও জনদুর্ভোগ স্থায়ী সমস্যায় পরিণত। এই প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার বিভাগের নূতন হকার নীতিমালা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। ইহা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হইলে যদ্রূপ অনিয়ন্ত্রিত হকার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব হইবে, তদ্রূপ চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যও হ্রাস পাইবে। আমরা জানি, রাজধানীর অধিকাংশ ফুটপাত বেদখল হইয়া গিয়াছে, যথায় হকার বসাইয়া বহু বৎসর ধরিয়া রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের চাঁদাবাজি হইতেছে। সেই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে না যাইবার কারণে নগর ব্যবস্থাপনায়ও কোনো ইতিবাচক প্রভাব রাখে না। উল্টা হকাররাই অনিশ্চয়তা, উচ্ছেদ আতঙ্ক ও হয়রানির শিকার হইয়া থাকেন। নিবন্ধনভিত্তিক কাঠামো প্রবর্তিত হইলে অন্তত এইখানে প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প দাঁড়াইবে। কিন্তু বৃক্ষের পরিচয় আমরা ফলেই দেখিতে চাহি।
বস্তুত কেবল নীতিমালা প্রণয়ন করিলেই সমস্যার সমাধান হইবে না; উহার বাস্তবায়ন জরুরি। কোন ফুটপাতে কতজন হকার বসিতে পারিবেন; পথচারীদের চলাচলের জন্য কতটুকু জায়গা অবাধ রাখিতে হবে; কোন এলাকায় হকার নিষিদ্ধ থাকিবে ইত্যাদি বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। এই ক্ষেত্রে নগর পরিকল্পনাবিদ, যান চলাচল বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় নাগরিক কিংবা প্রতিনিধি এবং হকার সংগঠনগুলির মতামত লইয়া সমন্বিত কাঠামো তৈয়ার করা যাইতে পারে। নূতন নীতিমালা অনুযায়ী নিবন্ধিত হকারদের পরিচয়, অবস্থান ও কার্যক্রম ডেটাবেজের আওতায় আসিলে নগর কর্তৃপক্ষের জন্য ব্যবস্থাপনা সহজ হইবে। ইহার সহিত কোনো অনিয়ম হইলে অপরাধীদের আটকও সম্ভব হইবে। সতর্ক থাকিতে হইবে, যাহাতে এই ব্যবস্থা নূতন ধরনের দুর্নীতি বা দলীয় প্রভাবের হাতিয়ার বানানো না হয়।
স্মরণে রাখিতে হইবে, হকাররা এই নগরে বহিরাগত নহে। স্বল্প শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাবে বহু মানুষ জীবিকার তাগিদে ফুটপাতকেই বাছিয়া লইয়াছেন। তাই ইহা কেবল আইনশৃঙ্খলা কিংবা নগরের বিষয় হিসাবে দেখিলে চলিবে না; ইহা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতারও অংশ। তজ্জন্য মানবিকতা ও শৃঙ্খলার সমন্বয়েই সমাধান খুঁজিতে হইবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
