ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শিশুর স্ক্রিন আসক্তি

সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি

সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ০৭:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

শিশুর মোবাইল তথা ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্তির এক উদ্বেগজনক তথ্য ঢাকায় অবস্থিত আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠিয়া আসিয়াছে। রাজধানীতে পরিচালিত এই গবেষণার তথ্য উদ্ধৃত করিয়া শুক্রবার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, ঢাকার শিশুরা গড়ে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা সময় ডিজিটাল ডিভাইসে কাটায়। গবেষণা প্রতিবেদনে শিক্ষার্থীদের এই অভ্যাসজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিকে ‘অদৃশ্য মহামারি’ আখ্যা দেওয়া হইয়াছে।

বস্তুত শিশুর ডিভাইস আসক্তি লইয়া পূর্ব হইতেই শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টজনের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ রহিয়াছে। যদিও এই সমস্যার মাত্রা কতটা, উহা অনুধাবন করা কঠিন ছিল। আলোচ্য গবেষণায় সেই সংকটের স্বরূপ কিছুটা উন্মোচিত হইয়াছে। দুই বৎসর ধরিয়া রাজধানীর তিনটি বাংলা মাধ্যম ও তিনটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পরিচালিত গবেষণায় দেখা যাইতেছে, ৮৩ শতাংশ শিশুই দুই ঘণ্টার অধিক সময় ডিভাইসে কাটাইতেছে। অন্যদিকে, গবেষণায় অংশ নেওয়া এক-তৃতীয়াংশের অধিক শিশু চোখের সমস্যায় আক্রান্ত; ৮০ শতাংশ প্রায়ই মাথাব্যথায় ভুগিয়া থাকে। তদুপরি, শিশুদের মধ্যে দুশ্চিন্তা, অতিচঞ্চলতা এবং একাধিক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা তৈয়ার হইয়াছে ডিভাইসের প্রভাবে। দুঃখজনক হইলেও সত্য, ডিভাইস আসক্তি ‘মহামারি’ পর্যায়ে পৌঁছাইলেও এই বিষয়ে প্রতিরোধমূলক সরকারি কোনো পদক্ষেপ নাই। কোনো জনসচেতনতামূলক পদক্ষেপও দৃষ্টিগোচর হইতেছে না। প্রসংগত, ইতোপূর্বে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো তথা বিবিএসের জরিপেও শিশুদের এহেন বিপজ্জনক প্রবণতার তথ্য উঠিয়া আসিয়াছিল। সংস্থাটির ২০২২ সালে প্রকাশিত তথ্য বলিতেছে, দেশে ৫ হইতে ১৭ বৎসর বয়সীদের মধ্যে স্বীয় ব্যবহারের মোবাইল রহিয়াছে অর্ধেকের বেশি শিশুর, যাহাদের ত্রিশ শতাংশ আবার ইন্টারনেটও ব্যবহার করিয়া থাকে।

আমরা জানি, চলতি বৎসরই শিশুদের জন্য স্ক্রিন টাইম নির্দেশনা প্রকাশ করিয়াছে যুক্তরাজ্য সরকার, যেথায় দুই হইতে পাঁচ বৎসর বয়সী শিশুর জন্য প্রত্যহ সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হইয়াছে। এতদ্ব্যতীত শিশুদের একা স্ক্রিন দেখিবার চাইতে পরিবারের সহিত একসঙ্গে দেখিবার সুপারিশ করা হইয়াছে। অন্যদিকে, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা দুই বৎসরের কম বয়সী শিশুর জন্য কোনো স্ক্রিন টাইম না রাখার এবং চার বৎসর বা তার কম বয়সী শিশুর জন্য প্রতিদিন সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ দিয়াছে। ডিভাইস আসক্তি শিশুদের মানসিক ও দৈহিক বিকাশের পথে বাধা, ইহা এখন কাহারও অজানা নহে। ইহাও সকলে জানেন যে, সন্তানকে ব্যস্ত কিংবা শান্ত রাখিবার সহজ উপায় হিসাবে বাবা-মাই স্মার্টফোন তাহাদের হস্তে তুলিয়া দেন। অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা, সামাজিক মাধ্যম ও ডিজিটাল বিনোদনের বিস্তারও শিশুদের স্ক্রিননির্ভর করিয়া তুলিতেছে। শিশুদের এহেন ক্ষতিকর অভ্যাস বদলাইতে এখনই ব্যবস্থা না লইলে ভবিষ্যতে সংকট আরও প্রকট হইতে পারে। প্রযুক্তির বিস্তারে ডিভাইস অনেক ক্ষেত্রেই বিকল্পহীন হইয়া পড়িয়াছে, তবে তাহার জন্য অভিভাবকেরা নিজেরাই সারাক্ষণ মোবাইল ডিভাইসে ব্যস্ত থাকিতে পারেন না। কারণ ইহা সন্তানদেরও প্রভাবিত করে।

তাই বাবা-মাকে যদ্রুপ শিশুকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হইবে এবং তাহাকে অন্য খেলায় উদ্বুদ্ধ করিতে হইবে, তদ্রুপ মোবাইল কিংবা অন্যান্য ডিভাইসও খুব জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত ব্যবহার করা উচিত নহে। শিশুদের ডিভাইসে আসক্তি কমাইতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়ও কম নহে। শিশুদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বইপড়া ও সামাজিক অংশগ্রহণ বাড়াইবার পরিবেশ তৈয়ার করিতে হইবে। স্থানীয় সরকারকে শিশুদের খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত মাঠ ও বিনোদনের ব্যবস্থা করিতে  হইবে। তাই রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সমন্বিত উদ্যোগ লইতে হইবে। শিশুর সুস্থ শৈশব ও মানবিক বিকাশে ইহার বিকল্প নাই।

আরও পড়ুন

×