বিএডিসির বীজে কৃষকের ক্ষতি
তদন্তপূর্বক দোষীদের শাস্তি দিন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ০৭:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
হাওরে কৃষকদের দুর্দশার পশ্চাতে অতিবৃষ্টি ও উজান হইতে নামিয়া আসা ঢল, তৎসহিত বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন-বিএডিসির বীজও ভূমিকা রাখিয়াছে বলিয়া শুক্রবার প্রকাশিত সমকালে যে তথ্য আসিয়াছে, তাহা দুঃখজনক তো বটেই; ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম হইলেও বিস্ময়ের কিছু থাকিবে না। সমকালের অনুসন্ধানে উঠিয়া আসিয়াছে, দেশের বিভিন্ন জেলায় বিএডিসির সরবরাহ করা ব্রি-৮৮ এর বীজের সহিত ব্রি-৯২ জাতের ধানের মিশ্রণ ঘটিয়াছে। যেই কারণে এক ক্ষেতে দুই রকমের ধান দেখা গিয়াছে; কোনোটি পাকা, কোনোটি কাঁচা। ফলে অন্য বৎসরের তুলনায় ধান কাটিতে কৃষককে অধিক সময় অপেক্ষা করিতে হইয়াছে। এই কারণে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়িয়াছেন কৃষক। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবমতে, কেবল কিশোরগঞ্জেই সাড়ে ১৩ সহস্র হেক্টর ধানক্ষেত তলাইয়া গিয়াছে, যথায় ৫২ সহস্র কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত। নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ অন্য হাওর অধ্যুষিত অঞ্চলের হিসাব মিলাইলে এই ক্ষতি হইবে কয়েক গুণ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই জাতের ধানের মিশ্রণ ঘটিয়াছে চুয়াডাঙ্গায় বিএডিসির বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে। সংস্থাটির গবেষণা সেলের যুগ্ম পরিচালকও স্বীকার করিয়াছেন, তাহারা বীজের মিশ্রণের উৎস খুঁজিয়া পাইয়াছেন। প্রশ্ন হইল, এমনতর অঘটন ঘটিল কী প্রকারে? আবার, এক-দুই কেজি নহে; ১০০ টন বা এক লক্ষ কেজি বীজে এমন মিশ্রণ ঘটিয়াছে, যাহা গুরুতর অপরাধ। উল্লেখ্য, ব্রি-৮৮ ধান পাকিতে ১৪০-১৪৫ দিবস লাগিলেও, ব্রি-৯২ পাকিতে সময় লাগে ১৫০-১৫৬ দিবস। উপরন্তু হাওরাঞ্চলে কৃষক প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বেই ফসল তুলিতে বিশেষত ব্রি-৮৮ ধানের চাষ করিয়া থাকেন। অতীতে আমরা দেখিয়াছি, ধান পাকিতে এক সপ্তাহ-দশ দিন বেশি লাগিলেই ফসলডুবির ন্যায় বড় বিপর্যয় ঘটিয়াছে। সেই হিসাবে ব্রি-৮৮ ধানের সহিত ব্রি-৯২ ধানের মিশ্রণ একটি প্রতারণার অনুষঙ্গও বটে।
অস্বীকার করা যাইবে না, দীর্ঘ অতিবৃষ্টি ও উজান হইতে নামিয়া আসা ঢলের কারণে মিশ্রণ না ঘটা ধানও ক্ষতিগ্রস্ত। তবে উক্ত মিশ্রণের কারণে যেই ক্ষতি হইয়াছে, উহাও সামান্য নহে। মনে রাখিতে হইবে, বিএডিসি প্রতিষ্ঠাকাল হইতেই ভালো মানের বীজ সরবরাহের জন্য সুপরিচিত। তাহার জন্যই কৃষক রাষ্ট্রীয় সংস্থাটির দ্বারস্থ হয়। আলোচ্য ঘটনার মধ্য দিয়া বিএডিসির প্রতি কৃষকের আস্থায় চিড় ধরিলে তাহাও বড় মাপের ক্ষতি। কারণ, তখন কৃষককে বেসরকারি নানা মুনাফালোভী কোম্পানির খপ্পরে পড়িতে হইবে। তাহাতে কৃষকের ক্ষতির সহিত জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির সম্মুখীন হইতে পারে।
অধিকতর বিস্ময়কর হইল, কৃষি বিভাগের প্রদর্শনীর জমিতেও এহেন বিপর্যয় ঘটিয়াছে। প্রতিবেদনে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের খয়রত গ্রামের কৃষক ওমর সিদ্দিকের বক্তব্য রহিয়াছে, যিনি ১৫ বিঘা জমিতে কৃষি বিভাগের প্রদর্শনী ক্ষেত করিয়াছিলেন। সেইখানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বীজ দেওয়া হইলেও একই সমস্যা দেখা গিয়াছে। মিশ্রণগত সমস্যায় তিনিও ধান ঘরে তুলিতে পারেন নাই।
ইতোপূর্বে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে আমরা হাওরের বিপর্যস্ত কৃষকের প্রতি সহযোগিতার হস্ত প্রসারিত করিতে সরকারের উদ্দেশে আহ্বান রাখিয়াছিলাম। আলোচ্য ঘটনার পর আমরা সেই আহ্বানই অধিকতর জোরালো করিতে চাহি। এ ক্ষেত্রে কৃষকের প্রণোদনা প্রয়োজন, যাহাতে কৃষক জরুরি ব্যয় মিটাইয়া অন্তত ঋণমুক্ত হইতে পারেন। আগামী মৌসুমে ধান চাষের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও যাহাতে তাহারা লইতে পারেন। তৎসহিত বিএডিসির সংস্কারও জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। বিশেষত উহাকে আরও কৃষকবান্ধব হইতে হইবে। উক্ত ঘটনার জন্য যাহাদের দায়িত্বহীনতা দায়ী, সেই সকল বিএডিসি কর্মী ও কর্মকর্তাদের স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করিয়া উপযুক্ত শাস্তির আওতায় আনিতে হইবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
