ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ডুয়েটে সংঘর্ষ

শিক্ষাঙ্গনে প্রয়োজন স্থিতিশীলতা

শিক্ষাঙ্গনে প্রয়োজন স্থিতিশীলতা
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ০৭:৪২ | আপডেট: ২০ মে ২০২৬ | ২১:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

গাজীপুরে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) নূতন উপাচার্যের যোগদান ঘিরিয়া দুই দল শিক্ষার্থীর মধ্যে রবিবার দিনভর যেই সংঘাত-সংঘর্ষ ঘটিয়াছে, উহা কেবল অনাকাঙ্ক্ষিত নহে, অশুভ বার্তাও বটে। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমসূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়টির নূতন উপাচার্য হিসাবে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবাল নিয়োগ লাভ করে ঐ দিবসেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেন। ঐদিকে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন প্রত্যাখ্যান করিয়া বিক্ষোভ মিছিল বাহির করেন এক দল শিক্ষার্থী, যাহাদের শিবিরকর্মী আখ্যা দিয়াছেন ছাত্রদল নেতারা। বিক্ষোভকারীরা ঢাকা-শিমুলতলী সড়ক অবরোধ ছাড়াও নবনিযুক্ত উপাচার্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে একটি ব্যানারও টানাইয়া দেন। রবিবার নূতন উপাচার্য দায়িত্বভার গ্রহণের জন্য ডুয়েটে আসিলে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থক শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় প্রায় পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে পুলিশসহ ১৭ জন আহত হইয়াছেন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই ধরনের সংঘাত-সংঘর্ষ নিশ্চিতভাবে শিক্ষার পরিবেশকে ব্যাহত করে, যাহার প্রধান ভুক্তভোগী সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এই শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই নিম্নবিত্ত ও সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারভুক্ত, যাহাদের অভিভাবকগণ কায়-ক্লেশে সন্তানের শিক্ষাব্যয়ের জোগান দিয়া থাকেন। উপরন্তু এই সকল অভিভাব আশায় থাকেন, সন্তান সময়মতো শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করিয়া পরিবারের হাল ধরিবে। শিক্ষার্থীরাও শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করিয়া দ্রুত কর্মজীবনে প্রবেশ করিতে চাহেন। কিন্তু শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা সংঘর্ষের জের ধরিয়া দফায় দফায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত কিংবা অচলাবস্থা অব্যাহত থাকিলে অভিভাবক ও শিক্ষার্থী, উভয়েরই স্বপ্ন ধূলিসাৎ হইবে। কারণ ইহাতে সময়মতো শ্রেণি কার্যক্রম ও পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হইতে না পারিলে শিক্ষাজীবন প্রলম্বিত হয়। যাহার কারণে অভিভাবকদের উপর অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝাও চাপে। 

ডুয়েটে এহেন শিক্ষার পরিবেশবিরোধী পরিস্থিতির উদ্ভব এমন সময়ে ঘটিয়াছে যখন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের পদোন্নতি ঘিরিয়া সৃষ্ট সপ্তাহখানেকের অচলাবস্থা মাত্রই সেখানকার উপাচার্য পরিবর্তনের মাধ্যমে কাটিয়াছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও একাধিক যৌন নিপীড়নের ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে শিক্ষা কার্যক্রমে এক প্রকার অচলাবস্থা চলিতেছে। অর্থাৎ ডুয়েটের পরিস্থিতি নিছক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নহে। আপাতদৃষ্টে, ইহার কারণ হইতে বরিশাল ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতির কারণসমূহ ভিন্ন মনে হইলেও বাস্তবে অন্তত একস্থানে উহাদের মধ্যে সাদৃশ্য রহিয়াছে। উহা হইল, সরকার যে প্রক্রিয়ায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যসহ শীর্ষ পদসমূহে নিয়োগ দিয়াছে, তাহা যদ্রূপ বিতর্কিত, অন্যদিকে শুধু বরিশাল বা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্বিবিদ্যালয় নহে, অন্যত্রও সমপ্রক্রিয়ায় নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যগণ স্বেচ্ছাচারী কায়দায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার প্রবণতায় ভোগেন। এই সকল বিষয় সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের বিশেষত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। তবে ডুয়েটে দুই দল শিক্ষার্থী যে প্রকারে সংঘর্ষে লিপ্ত হইয়াছেন, তাহা কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য নহে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকহণও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকে জিম্মি করিয়া স্বীয় দাবি আদায়ের ন্যায় অগ্রহণযোগ্য পন্থা চয়ন করিয়াছিলেন।

দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ডুয়েটের ন্যায় সংঘর্ষ অতীতেও সংঘটিত হইয়াছে। শিক্ষক আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হইবার ঘটনাও কম ঘটে নাই। আমরা এই সকল কিছুর কারণে উচ্চশিক্ষার প্রাণকেন্দ্রে জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠন ব্যাহত হইতে দেখিয়াছি। জুলাই গণঅভ্যুত্থান অন্য অনেক বিষয়ের সহিত এই সকল ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনিবে– এই প্রত্যাশা ছিল। বাস্তবে তাহা পূরণ হয় নাই, বরং ক্ষেত্রবিশেষে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটিয়াছে।
আমাদের প্রত্যাশা, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ আগামী দিনগুলিতে সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের মতের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে চলিবে; সেই ক্ষেত্রে সরকার তৎসহিত শিক্ষক ও ছাত্র সংগঠনসমূহ সর্বাত্মক সহযোগিতা করিবে। শিক্ষাঙ্গনে প্রয়োজন স্থিতিশীলতা। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি কাহারও জন্য কল্যাণকর নহে।

আরও পড়ুন

×