ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অচলাবস্থার এক যুগ

খুলনার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রে রৌদ্র প্রয়োজন

খুলনার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রে রৌদ্র প্রয়োজন
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ | ০৭:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

খুলনার সোনাডাঙ্গার সোলার পার্কে অবস্থিত দেশের প্রথম বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি এক যুগ যাবৎ অচল থাকিবার যেই সংবাদ সোমবার সমকালে প্রকাশিত হইয়াছে, উহা দুর্ভাগ্যজনক। এই ঘটনায় আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকগণের নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি অবহেলার বিষয় পুনরায় প্রমাণিত হইল। লক্ষণীয়, নিছক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ২০১২ সালে যখন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ হইয়া যায়, তখন দেশে বিদ্যুৎ সংকটে দিনে কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা দেশের অন্যান্য অংশের ন্যায় সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষদের ভোগ করিতে হইত। তথাপি তখনকার সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিবর্তে পরিবেশ-প্রতিবেশের জন্য ক্ষতিকর এবং কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করিয়া আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির উপরেই মনোযোগ নিবদ্ধ করিয়াছিল। উপরন্তু কেন্দ্রটি অদ্যাবধি অচল হইয়া, তখনও বিশেষত তীব্র জ্বালানি সংকটে দেশে বিদ্যুতের লোডশেডিং নৈমিত্তিক ঘটনা হইয়া দাঁড়াইয়াছে। আর বর্তমান সরকারও ২০১২ সালের সরকারের পথেই সমস্যার সমাধান খুঁজিতেছে। সম্ভবত এই কারণেই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পুনরায় সচল করিবার বিষয়ে ২০১২ সালের সরকারের ন্যায় এই সরকারও গরজ দেখাইতেছে না। তবে পরিহাসের বিষয়, ২০১২ সালে বিরোধী দল হিসাবে বর্তমান সরকারি দল প্রায়শ তৎকালীন সরকারের ভ্রান্ত জ্বালানি নীতির কঠোর সমালোচনা করিত।

উল্লেখ্য, প্রতিবেদন অনুসারে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটির ১৬ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ দিয়া সমগ্র সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকা অথবা কেডিএ অ্যাভিনিউর মতো ছয়টি বড় সড়কের সকল বাতি জ্বালানো সম্ভব। উপরন্তু কেন্দ্রটির সোলার প্যানেলগুলি এখনও সচল থাকায় মাত্র ১২-১৫ লাখ টাকা খরচ করিলেই ঐ ১৬ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
এদিকে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) জানাইয়াছে, ২০০৭ সালে খুলনার সন্তান জার্মানির ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন অধ্যাপক ড. বিভূতি রায়ের উদ্যোগেই কেসিসির সংস্থানকৃত জমিতে দাতা সংস্থার অনুদানে সৌরবিদ্যুৎ প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সহিত সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়। বর্তমানে অবসরে থাকা প্রকল্পটির পরিচালকের মতে, ট্রেনিং সেন্টারের কাজ সমাপ্ত হইলে ২০০৮ সালে সেন্টারের ছাদে চার সহস্র বর্গফুটব্যাপী ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতাসম্পন্ন ২২২টি সোলার মডিউল স্থাপন করা হয়। ঐ সময় প্রতিদিন ১৫০-১৬০ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন হইত। তদুপরি পার্কের সৌরবাতি, ট্রেনিং সেন্টারে ব্যবহারের পর বাকি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হইত। এই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট তিন টাকা ৯৮ পয়সায় ক্রয় করিতে সম্মত হয় ওজোপাডিকো। কয়েক বৎসর বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিকই ছিল। ইহার পর পুরাতন যন্ত্রাংশগুলি বিকল হইলে ২০১২ সালের পর আর মেরামত করা হয় নাই। মূলত তদারকি ও সংস্কারের অভাবে ২০১২ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি সম্পূর্ণ বন্ধ হইয়া যায়। আর শিক্ষার্থীর অভাবে বন্ধ হয় ট্রেনিং ইনস্টিটিউট। যতই মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ হউক; প্রায় বিনা বিনিয়োগ ও অনায়াসে প্রাপ্ত যেই কোনো কিছুর প্রতি আমাদের নীতিনির্ধারকগণের অযত্ন-অবহেলা সর্বজনবিদিত। আলোচ্য ক্ষেত্রেও এই ক্ষতিকর প্রবণতার ছাপ স্পষ্ট– অস্বীকার করা যায় না। 

আমরা জানি, বিশেষত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষয়ক্ষতি লইয়া উদ্বেগ বৃদ্ধির কারণে বিশ্বব্যাপী সৌর ও বায়ুর ন্যায় বিবিধ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের প্রতি আগ্রহ ক্রমবর্ধমান। ইহার প্রভাব অনিবার্যভাবে বাংলাদেশের জনগণ এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকগণের উপরেও পড়িয়াছে। সম্ভবত উহারই অংশরূপে বিগত কয়েক দশকে ক্ষমতাসীন সকল সরকারই নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির বিষয়ে বারংবার অঙ্গীকার করিয়াছে। এই ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারও ব্যতিক্রম নহে। এই কারণেই আমাদের প্রত্যাশা, বর্তমান সরকার জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ধীরে ধীরে হ্রাস করিয়া নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারে বিগত সকল সরকারের ব্যর্থতাকে অতিক্রম করিবে। আর খুলনার আলোচ্য বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুনরায় সচল করিবার মাধ্যমে এই ক্ষেত্রে সরকার উহার ইতিবাচক মনোভাবের প্রকাশ ঘটাইতে পারে। 

আরও পড়ুন

×