ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

যাদুকাটা নদীর অসমাপ্ত সেতু

গার্ডার ভাঙে, নিদ্রা ভাঙে না

গার্ডার ভাঙে, নিদ্রা ভাঙে না
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ | ০৭:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীর উপর নির্মাণাধীন শাহ্ আরেফিন-অদ্বৈত মহাপ্রভু মৈত্রী সেতুটির নির্মাণকার্য আট বৎসরেও সমাপ্ত হয় নাই। উপরন্তু বুধবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেতুটির একের পর এক গার্ডার ভাঙিয়া পড়িয়াছে। অবশিষ্ট গার্ডারও ভাঙিয়া পড়িবার শঙ্কা বিদ্যমান। যাহার ফলে সেতুটির নির্মাণকার্য বহুলাংশে সমাপ্ত হইলেও লুটপাটের কারণে উহার মান লইয়া শঙ্কা সৃষ্টি হইয়াছে। 

দুর্গম তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকায় যাতায়াতের সুবিধা, পর্যটন ও বাণিজ্যের প্রসারের লক্ষ্যে যাদুকাটা নদীর উপর সেতুটির নির্মাণকার্য আরম্ভ হইয়াছিল ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে। ইতোমধ্যে উহার নির্মাণকার্য সম্পন্নকরণের সময় চারবার বৃদ্ধি করা হইয়াছে। অর্ধেকের অধিক সম্পন্ন হইবার পর নির্মাণকার্য বন্ধ ছিল এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর সেতুটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক দেশ ত্যাগের কারণে সম্পূর্ণ কার্যক্রম থমকিয়া রহিয়াছে। উপরন্তু ইতোমধ্যে সম্পন্ন কার্যের মান লইয়া প্রশ্ন উঠিয়াছে। সেতুটির ৭৫টা গার্ডারের মধ্যে ৫৭টা গার্ডার তৈয়ার হইলেও ইতোমধ্যে দুই দফায় সাতটা গার্ডার ভাঙিয়া পড়িয়াছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এলজিইডির কর্মকর্তাগণ সমকালকে বলিয়াছেন, ইহা অপেক্ষা গভীর ও খরস্রোতা নদীতে সুনামগঞ্জে অনেক সেতু নির্মিত হইলেও সেইগুলিতে এইভাবে বারংবার গার্ডার ভাঙিয়া পড়িবার নজির নাই। ইহাই প্রমাণ করে, নির্মাণকার্যে কতখানি অবহেলা কিংবা অনিয়ম হইয়াছে। প্রশ্ন হইল, সেতুটি নির্মাণকালে এলজিইডি কিংবা তদারকি প্রতিষ্ঠান কী করিয়াছে? নির্ধারিত সময়ে উহা সম্পন্ন কেন হইল না? বারংবার সময় বৃদ্ধির অবকাশ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কীভাবে পাইয়াছে? সংগত কারণেই সেতুটির এই পরিণতি এলজিইডি এড়াইতে পারে না। 

বলাবাহুল্য, যাদুকাটা নদীর উপর নির্মাণাধীন সেতুর পরিণতি কেবল একটা প্রকল্পের ব্যর্থতাই নহে, বরং ইহা দেশের অবকাঠামো নির্মাণব্যবস্থার দুর্নীতি ও অনিয়মেরই প্রতিচ্ছবি। জনগণের কষ্টার্জিত অর্থে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু এইভাবে ধসিয়া পড়া প্রমাণ করে– প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়িত্বশীলদের মধ্যে জবাবদিহির কতটা অভাব রহিয়াছে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, তদারকির ঘাটতি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের কারণেই এই বিপর্যয় ঘটিয়াছে।

সেতু কেবল ইট-পাথরের কাঠামো নহে। ইহা মানুষের যোগাযোগ, অর্থনীতি ও আস্থার প্রতীক। সেতুটি এলাকাবাসীর জন্য জরুরি ছিল। গত বৎসরের জুন মাসে এই সেতুর নির্মাণকার্য লইয়া গাফিলতির প্রতিবাদ ও দ্রুত কার্যক্রম সম্পন্নকরণের দাবিতে এলাকাবাসী মানববন্ধন করিয়াছিলেন, যথায় নদীর দুই পারের ১০টি গ্রামবাসী অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। তখনই এলজিইডি জানাইয়াছিল, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে তাহাদের বাদ দিতে চিঠি দেওয়া হইয়াছে। 

এক্ষণে সেই এলজিইডি সমকালকে জানাইয়াছে, পূর্বের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানকে বাতিল করিয়া নূতন দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। এখন প্রশ্ন হইল, এই কার্য সম্পন্ন করিতে এতখানি সময় কেন লাগিল? দুঃখজনক হইলেও সত্য, সংস্থাটি এখনও নূতন দরপত্র আহ্বান করিতে পারে নাই। 

আমরা মনে করি, যাদুকাটা নদীর উপর নির্মাণাধীন শাহ্ আরেফিন ও অদ্বৈত মহাপ্রভু মৈত্রী সেতুটি লইয়া তদন্ত কমিটি গঠন করা জরুরি। সেতু নির্মাণে অনিয়ম ও অবহেলা নির্ণয়পূর্বক ইহার বাস্তব অবস্থাও পরখ করিবার দরকার। গার্ডারসমূহ কেন ধসিয়া পড়িল এবং অন্য গার্ডারসহ সমগ্র সেতুর নির্মাণকার্য নিরীক্ষা করিয়া দ্রুত বাস্তবভিত্তিক সুপারিশ দিতে হইবে, যাহার আলোকে পরবর্তী কার্যক্রমকে আগাইয়া লইতে হইবে। এই ক্ষেত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, এলজিইডিসহ সকলের দায় জনসমক্ষে আসা দরকার। 
সেতুটির আশায় এখনও বুক বাঁধিয়া রহিয়াছেন এলাকার মানুষ। তাহাদের দীর্ঘ দিবসের প্রত্যাশার এই উপহার নিশ্চিতে সরকারের তৎপরতা কাম্য। তৎসহিত দেশের সকল চলমান অবকাঠামো প্রকল্পে মান নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণের বিষয়টিও সরকারে অগ্রাধিকারে থাকা দরকার। 
 

আরও পড়ুন

×