পল্লবীতে শিশুহত্যা
বিচারে নহে বিলম্ব
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ০৮:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীতে পল্লবীতে ৭ বৎসরের শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা মর্মান্তিক ও বিক্ষোভ জাগানিয়া। এই বেদনাদায়ক অঘটন যে সকলের হৃদয়কে স্পর্শ করিয়াছে– সামাজিক মাধ্যমের ব্যাপক প্রতিক্রিয়াই উহার প্রমাণ। এই ঘটনার বিচার দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদে শামিল হইয়াছে। তবে শিশুটির পিতা ‘বিচার চাই না কিংবা বিচার করিতে পারিবেন না’ বলিয়া যেই ক্ষোভ প্রকাশ করিয়াছেন, উহাতে প্রকারান্তরে রাষ্ট্রের প্রতি তাঁহার আস্থাহীনতাই ফুটিয়া উঠিয়াছে। যদিও আইনমন্ত্রী এই ঘটনায় বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত করিবার নির্দেশ দিয়াছেন।
গত বৎসর ধর্ষণের শিকার হইয়া হৃদয়বিদারক মৃত্যু হয় মাগুরার এক শিশুর। ঐ ঘটনায়ও অনুরূপ দেশব্যাপী তোলপাড় হইয়াছিল। নাগরিক সমাজ সোচ্চার হইবার কারণে তখন অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারের উদ্যোগ লইয়াছিল। কিন্তু দুঃখজনক হইলেও সত্য, সেই অপরাধীর চূড়ান্ত বিচার এখনও অনিষ্পন্ন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিম্ন আদালতে অপরাধীর ফাঁসির রায় হইলেও উচ্চ আদালতের আপিলে উহার বাস্তবায়ন ঝুলিয়া রহিয়াছে। বস্তুত এইরূপেই আইনের ফাঁকফোকর দিয়া অপরাধী গলাইয়া যায়। আমরা জানি, ধর্ষণের মামলার বিচারে এক দীর্ঘসূত্রতা রহিয়াছে বলিয়াই অনেক সময় অপরাধী পার পাইয়া যায়। ফলে গত বৎসর মাগুরার শিশু ধর্ষণের পরই জনদাবি মানিয়া লইয়া বিশেষ ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণের বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছিল সরকার। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা সেই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাইয়া উহা ন্যায়বিচারের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিবে বলিয়া প্রত্যাশা করিয়াছিলাম। কিন্তু চাঞ্চল্যকর সেই ধর্ষণ ও হত্যার বিচারই যখন আটকাইয়া রহিয়াছে, তখন আমরা হতাশ।
পল্লবীর ৭ বৎসরের শিশুকে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় ইতোমধ্যে হন্তারক সোহেল রানা ও তাহার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করিয়াছে পুলিশ। আদালতে সোহেল দোষ স্বীকার করিয়া জবানবন্দি দিয়াছে– শিশুটিকে ধারালো অস্ত্র দিয়া গলা কাটিয়া হত্যা করিবার পূর্বে ধর্ষণ করিয়াছে। কতটা পাশবিক হইলে এহেন অপরাধ করা সম্ভব।
আইনমন্ত্রী ইতোমধ্যে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দিয়াছেন। আমরা বিশ্বাস করি, এই ক্ষেত্রে মন্ত্রীর নির্দেশনা পালিত হইবে এবং এই ঘটনার মাধ্যমে অপরাধীর বিচার দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হইবার উদাহরণ তৈয়ার হইবে।
বস্তুত সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি নৃশংসতা ও বর্বরতার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবেই ক্রমবর্ধমান। শিশুহত্যা ও ধর্ষণের পরিসংখ্যানগুলি শিহরিয়া উঠিবার ন্যায়। শিশুর প্রতি সহিংসতা তাহাদের স্বাভাবিক বিকাশ ও নিরাপদ জীবনযাপন বড় প্রতিবন্ধক হইয়া উঠিয়াছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী বা পরিচিতজনদের মাধ্যমে এহেন অপরাধ সংঘটিত হওয়ায় নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা লইয়া নূতন করিয়া শঙ্কা তৈয়ার হইয়াছে। ইহাও অস্বীকার করা যাইবে না, দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি পাইয়াছে। তজ্জন্য সরকারকে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে মনোযোগী হইতে হইবে।
তবে ধর্ষণ নিয়ন্ত্রণে ইহাই যথেষ্ট নহে। দেখা গিয়াছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয় ও পরিচিতজনই শিশু ধর্ষণ করিয়া থাকে। তজ্জন্য পিতা-মাতা ও অভিভাবকের সচেতনতা এই ক্ষেত্রে জরুরি। সন্তানের নিরাপত্তা অভিভাবকদেরই নিশ্চিত করিতে হইবে। পাশাপাশি নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে এলাকাভিত্তিক ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে সম্পৃক্ত করিয়া সামাজিক আন্দোলন গঠন করা জরুরি।
পল্লবীর শিশুহত্যার ঘটনায় যেই গণজাগরণ তৈয়ার হইয়াছে, উহা ইতিবাচক। নাগরিক সমাজ এইরূপে সোচ্চার থাকিলে নারী ও শিশু তথা নাগরিক নিরাপত্তাহীনতা দূর হইতে পারে। কিন্তু প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বই এই ক্ষেত্রে প্রধান। পল্লবীর আলোচ্য শিশুহত্যার বিচার দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্নের মাধ্যমে প্রশাসনের সেই সদিচ্ছাই আমরা দেখিতে চাহিব।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
