কন্যাশিশুর নিরাপত্তা
রাষ্ট্র ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৭:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে ক্রমবর্ধমান শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় জনমনে যে উদ্বেগ ছড়াইয়া পড়িয়াছে, তাহা সরকারের দ্রুত আমলে লওয়া উচিত বলিয়া আমরা মনে করি। শুক্রবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন বলিতেছে, গত দুই সপ্তাহে ধর্ষণের পর অন্তত চার শিশুকে হত্যা করা হইয়াছে। উপরন্তু, বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলিতেছে, গত ১ জানুয়ারি হইতে ২০ মে অবধি ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হইয়াছে; ধর্ষণচেষ্টার শিকার হইয়াছে ৪৬ শিশু। শুধু উহা নহে, উক্ত সময়ে ধর্ষণের পর হত্যা করা হইয়াছে ১৪ শিশুকে এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হইয়া হত্যা করা হইয়াছে তিন শিশুকে। ধর্ষণের শিকার দুই শিশু আত্মহত্যা করিয়াছে। বিভিন্ন ঘটনায় জানুয়ারি হইতে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ১১৫ শিশু খুন হইয়াছে। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্যও চলতি বৎসরের প্রথম চার মাসে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় প্রায় ছয় সহস্র মামলা হইবার কথা বলিয়াছে। অন্যদিকে শিশু অধিকারবিষয়ক সংস্থা বাংলাদেশ চাইল্ড হেল্পলাইনের ব্যবস্থাপক চৌধুরী মো. মোহায়মেন সমকালকে জানাইয়াছেন, উক্ত চার মাসে তাহাদের হেল্পলাইনে শিশু যৌন হয়রানি-সংক্রান্ত প্রায় ছয় সহস্র কল আসিয়াছে। তাহার মধ্যে ৫২০টি কলে শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার কথা জানানো হইয়াছে। এই সকল তথ্য নারী ও শিশু ধর্ষণের মহামারির ইঙ্গিত করিতেছে, যে পরিস্থিতিতে ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনপরিসর কোথাও শিশুরা পুরোপুরি নিরাপদ নহে।
সাম্প্রতিক সময়ের ধর্ষণ ও হত্যার পাঁচটি ঘটনা বিশ্লেষণ করিয়া দেখা গিয়াছে, সকল ঘটনায় শিশুরা প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা ঘনিষ্ঠজনের অপরাধপ্রবণতার শিকার হইয়াছে। ইহার পরিপ্রেক্ষিতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাবলিকে নিছক সংশ্লিষ্ট অপরাধীর ব্যক্তিগত অপরাধপ্রবণতার ফসল বলা যায় না; উহাদের শিকড় আরও গভীরে–যেইখানে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়কে দায়ী করা যায়। মাদকাসক্তির বিস্তার, বিকৃত, অনলাইন কনটেন্টের সহজলভ্যতা, পরিবার ও শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি ইত্যাদির ভূমিকা এই সকল ক্ষেত্রে অনস্বীকার্য। তবে ইহার সহিত এই কথাও অনস্বীকার্য যে, অপরাধ করিয়া পার পাইবার প্রবণতা এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করিয়া তুলিয়াছে। নারী নির্যাতনের ন্যায় শিশু নির্যাতন ও হত্যার মামলাসমূহের দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া লইয়া বিভিন্ন সময়ে বিচারপ্রার্থী এবং সচেতন নাগরিকদের পক্ষ হইতে বহু সমালোচনা ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হইয়াছে। এমনও দেখা গিয়াছে, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পরিবার হতাশ হইয়া মামলার কার্যক্রমে অংশগ্রহণ বন্ধ করিয়া দেয়, কেহ থানা বা আদালতের চৌহদ্দিতেই যায় না। দুর্ভাগ্যবশত, অদ্যাবধি এই সকল ঘটনা রাষ্ট্রের পরিচালকদের মধ্যে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিচার প্রক্রিয়া সংশোধনের তাগিদ সৃষ্টি করিতে পারে নাই। বিচারহীনতার কারণ লইয়া পুলিশ ও আদালতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে একপ্রকার দোষারোপের দুঃখজনক খেলাও দেখা গিয়াছে। নারী ও শিশু ধর্ষণের ন্যায় অত্যন্ত গুরুতর অধিকাংশ মামলায় অভিযুক্তের খালাস বা নামকাওয়াস্তে শাস্তি পাওয়া প্রসঙ্গে আদালতসংশ্লিষ্টরা বলেন, আইনের ধারার প্রয়োগ এবং তদন্ত যথাযথ হয় নাই। অন্যদিকে পুলিশের বক্তব্য, তাহারা কষ্ট করিয়া আসামি ধরেন, আর বিচারের দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে আসামিরা জামিনে বাহির হইয়া পুনরায় অপরাধ সংঘটনে প্রবৃত্ত হয়।
শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও বিকাশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জাতীয় শিশু নীতি-২০১১ শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ ও সুরক্ষার কথা বলিয়াছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (ইউএনসিআরসি) অনুযায়ী, শিশুদের সহিংসতা ও শোষণ হইতে রক্ষায়ও অঙ্গীকারবদ্ধ। অতএব সরকারের উচিত দ্রুত বিচার, কার্যকর শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা জোরদার করা। শিশু নিরাপদ না হইলে সমাজও নিরাপদ থাকিতে পারে না, এই কথা ভুলিয়া গেলে চলিবে না। শিশুর সুরক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের স্বার্থে নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ গড়িয়া তোলাও জরুরি।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
