শ্রদ্ধাঞ্জলি
আজ তবে এইটুকু থাক
×
লতা মঙ্গেশকর (২৮ সেপ্টেম্বর ১৯২৯-৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২)
কাওসার চৌধুরী
প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:০০
'সে যে এসেছিল বাতাস তো বলেনি/ হায় সেই রাতে দীপ মোর জ্বলেনি/ তারে সে আঁধারে চিনিতে যে পারিনি/ আমি পারিনি ফিরায়ে তারে আনতে/ প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে ...!' শাশ্বত প্রেমের এই চিরন্তন হাহাকার যার কণ্ঠে চিরভাস্বর হয়ে আছে; সুরের সেই সরস্বতী লতা মঙ্গেশকর ইহলোক ত্যাগ করেছেন। তার মহাপ্রয়াণে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে ভারত সরকার। মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে গিয়ে প্রয়াত শিল্পীকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন সে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহান এই শিল্পীর প্রয়াণে শোক জানিয়েছেন আনুষ্ঠানিকভাবে।
তার মহাপ্রয়াণে সংগীতবিশ্ব আজ বিবর্ণ। থেমে গেছে কণ্ঠ, থেমে গেছে সুর! নিভে গেছে গানের প্রদীপ- দপ করেই! কিন্তু কোটি শ্রোতার হৃদয়ে বেজে চলেছে শিল্পীকণ্ঠের সুর আর গান। বাজবে অনাদিকাল! প্রেম, বিরহ-বিচ্ছেদ, সুখপ্রাপ্তি, অর্জন, মানবতা, দেশপ্রেম, যুদ্ধ-বিগ্রহ, ভোরের আলো, গোধূলি, রাতের অন্ধকার, শ্রাবণের বারিধারা, আষাঢ়ের বর্ষণ, কার্তিকের কাশফুল, বসন্তের কৃষ্ণচূড়া, কোকিলের কুহুতান, ধ্রুপদ সংগীতের রাগ-রাগিণীসহ হেন কোনো বিষয় ও দিক বাকি নেই, যেখানে লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠ স্পর্শ করেনি!
গত প্রায় আট দশক সময় ধরে ৩৫টি ভাষায় ৩০ সহস্রাধিক (মতান্তর আছে) গান গেয়েছেন অমর এ শিল্পী। বাংলা ভাষায় গেয়েছেন ১৮৭টি গান। নিঝুম সন্ধ্যায়, আকাশ প্রদীপ জ্বলে, অন্তবিহীন কাটে না আর যেন, আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন, না যেয়ো না রজনী এখনও বাকি, ও আমার ময়না গো, একবার বিদায় দে মা, বাঁশি কেন গায়, কী লিখি তোমায়, সাত ভাই চম্পা জাগো রে, আজ তবে এইটুকু থাক ...। খুব খুশি হতাম, যদি ওই ১৮৭টি বাংলা গানের কথা বিশদভাবে এখানে উল্লেখ করা যেত! পরিসরের স্বল্পতায় সেটা সম্ভব নয়। বাংলা গান গাইতে গিয়ে লতা মঙ্গেশকর সব সময় কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন সুরস্রষ্টা সতীনাথ, সলিল চৌধুরী এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে। আজ তাদেরও কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি।
সংগীত আর সুরে কাঁটাতারের কোনো বেড়া নেই। নেই পাসপোর্ট কিংবা ভিসার ঝামেলা। সীমানা পেরিয়ে লতার গান বিস্তৃত হয়েছে ভারত উপমহাদেশের অসংখ্য জনমানুষের হৃদয়ে। বাংলাদেশ এর বাইরে নয়। আমরা তো বটেই; আমাদেরও যারা বয়োজ্যেষ্ঠ, তাদেরও দিন শুরু হয়েছে লতার মতো শিল্পীদের গান শুনে। আবার রাতে, নিদ্রাদেবীর কোলে আশ্রয় নেওয়ার আগে আরেকবার কান পেতেছি লতারই গানে। কমপক্ষে চারটি প্রজন্মের রুচিবোধ তৈরি হয়েছে লতার গান শুনে।
মহান এ শিল্পীর কাছে বাংলাদেশ ঋণী। একাত্তরে ভারতের বিভিন্ন স্থানে গান গেয়ে লতা তহবিল সংগ্রহ করেছেন বাংলাদেশ সরকারের জন্য। গানের সেই দলে আরও ছিলেন আশা ভোঁসলে, কিশোর কুমার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মোহাম্মদ রফি, মান্না দে, সলিল চৌধুরীর মতো শিল্পীরা। ১৯৭২-এর ৩০ জানুয়ারি ভারতীয় একটি সাংস্কৃতিক দলের হয়ে ঢাকার পিলখানায় গান করেন লতা। সঙ্গে ছিলেন অভিনয়শিল্পী নার্গিস, সুনীল দত্ত, মালা সিনহাসহ আরও ক'জন ভারতীয় শিল্পী। সে যাত্রায় বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেও গান গেয়ে শোনান লতা মঙ্গেশকর। সে সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে লতার একটি ছবি বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রিকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে এর মাঝেই।
মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গঠিত 'বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থার' অন্যতম সংগঠক অভিনয়শিল্পী সৈয়দ হাসান ইমাম তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বাহাত্তরে বাংলাদেশে লতার অনুষ্ঠান সম্পর্কে লিখেছেন- 'বাংলাদেশের পক্ষে এদের দেখভাল করার দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। পিলখানায় মাটির একটা ঢিবির ওপর শতরঞ্চি বিছিয়ে ওপরে শামিয়ানা খাটিয়ে মঞ্চ করা হয়েছে। প্রচণ্ড শীতে লতাজি খালি পায়ে মঞ্চে এসে গান গাইলেন। শুনলাম, উনি জুতা পায়ে গান করেন না।'
শুধু তাই নয়; সংগীতকে লতা নিয়েছিলেন তার উপাসনা হিসেবে। অশ্নীল কোনো শব্দ বা সে ধরনের ভাষার উপস্থিতি আছে- এমন কোনো গানে কণ্ঠ দেননি লতা মঙ্গেশকর। পোশাকের ক্ষেত্রে শাড়ি ছিল তার প্রিয়। সেই শাড়িটিও পরিধান করতেন নিতান্তই নিজস্ব কায়দায়, অত্যন্ত মার্জিতভাবে। কথিত আছে- 'নগ্ন নারীমূর্তি' পুরস্কারের ক্রেস্ট হিসেবে গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোয় ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের 'নগ্ন মূর্তির ক্রেস্ট'টি একটি রুমালে জড়িয়ে তাকে প্রদান করতে হয়েছিল।
১৯২৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর দীননাথ মঙ্গেশকর আর সেবন্তী মঙ্গেশকরের ঘরে এলো তাদের প্রথম সন্তান; নাম রাখলেন হেমা। পণ্ডিত দীননাথ নিজেও সংগীত আচার্য ছিলেন। সংগীত ও নাটক- দুই ক্ষেত্রেই ছিল তার সাবলীল যাতায়াত। মঞ্চ নাটক লিখতেন, সঙ্গে অভিনয়ও করতেন। নাটকের প্রয়োজনে গানও গাইতেন। 'ভাউবন্ধন' নামে এক নাটক পরিচালনার পর নাটকের প্রধান চরিত্র লতিকাকে খুব মনে ধরেছিল দীননাথ-সেবন্তী দম্পতির। তাই সন্তানের নাম হেমা থেকে বদলে রাখা হলো লতা; লতা মঙ্গেশকর।
লতা মঙ্গেশকরের পুরো পরিবারই বলতে গেলে সংগীতের রথী-মহারথী। লতার পর একে একে সেবন্তীর কোলে আসেন আশা ভোঁসলে, উষা মঙ্গেশকর, মীনা মঙ্গেশকর ও সর্বকনিষ্ঠ হৃদয়নাথ মঙ্গেশকর। পিতার ছায়া খুব বেশিদিন থাকেনি মঙ্গেশকর পরিবারের ওপর। লতার বয়স যখন মাত্র ১৩ বছর, তখন (১৯৪২ সাল) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে দীননাথ মঙ্গেশকর মারা যান। ফলে সম্পূর্ণ পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে ১৩ বছর বয়সী লতার ওপর। সেই থেকে লতার লড়াইয়ের শুরু। লতা মঙ্গেশকরের শিল্পী হিসেবে বেড়ে ওঠা যতটা না প্রতিভার; তার চাইতে দ্বিগুণ ছিল তার চর্চা, অধ্যবসায় আর সংগীতের প্রতি একনিষ্ঠতা। অগণিত পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন তিনি। ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার থেকে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন লতা মঙ্গেশকর। কিন্তু সবচেয়ে বড় পুরস্কারটি ছিল কোটি কোটি শ্রোতার ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা। চলচ্চিত্রে গান গাওয়া, সেই গানে সফলতা, ভারতীয় চলচ্চিত্র এবং রেডিওতে গান পরিবেশন করে লতা মঙ্গেশকরের এক এবং অদ্বিতীয় হয়ে ওঠার কাহিনি কমবেশি সবারই জানা। তার প্রয়াণের পর বিভিন্ন প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেছে। সেখান থেকে পাঠক অনেক সমৃদ্ধ হয়েছেন সেসব বিষয়ে। আমি লতা মঙ্গেশকরের বিশেষ দুয়েকটি দিকের ওপর সামান্য আলোকপাত করে লেখাটি সমাপ্ত করতে চাই।
সংগীতচর্চায় লতার একাগ্রতা আর নিষ্ঠা নিয়ে ভারতের এ প্রজন্মের প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক এ.আর. রহমান তার ভিডিওবার্তায় উল্লেখ করেছেন গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য। তিনি লিখেছেন, লতাজি একবার তাকে ফোনে বলেছিলেন- "আগে নওশাদ সাহেব একটা গান রেকর্ডিং করার আগে ১১ দিন ধরে প্র্যাকটিস করাতেন। তোমরা এখন কতটা সময় নাও প্রাক-রেকর্ডিং প্রস্তুতি সারতে?' তখন আমি (এ.আর. রহমান) বুঝতে পারি যে একটা গান রেকর্ড করার নেপথ্যে কতটা ভালোবাসা, আধ্যাত্মিকতা, আকাঙ্ক্ষার প্রয়োজন হয়। লতা মঙ্গেশকরই আমাকে শিখিয়েছেন- সংগীত সাধনা হোক কিংবা যে কোনো সৃষ্টি- নিজেকে সেখানে পুরোপুরি উৎসর্গ করে দিতে হয়। তিনিই শিখিয়েছেন, 'কর্ম করে যাও, ফলের আশা করো না'।" এ.আর. রহমানের এই উক্তি থেকে আমাদের অনেক কিছুই শেখার আছে। বুঝে নেওয়ার বাকি আছে আমাদের তরুণ প্রজন্মের!
লতা মঙ্গেশকরের প্রয়াণে শুধু ভারত নয়; শোকে ভাসছেন বাংলাদেশের অজস্র সংগীতপ্রেমী। আনন্দ কিংবা বিষাদে এ অঞ্চলের মানুষ বারবার আশ্রয় নিয়েছেন লতা মঙ্গেশকরের গানে, সুরে এবং তার কণ্ঠের জাদুতে। আগামী দিনেও লতা মঙ্গেশকরের গানই ছায়া দেবে সংগীতপিপাসুদের।
একটি কলাম, একটি দিনের শ্রম কিংবা শুধু একটি খাতায় লিখে লতা মঙ্গেশকরের জীবন আর কীর্তির কথা শেষ করা যাবে না। তাকে নিয়ে লেখা যাবে বহুদিন, খরচ হবে বহু খাতার অনেক পাতা। তার চেয়ে বরং তার গানের কয়েকটি লাইন দিয়ে আজকের লেখাটি সমাপ্ত করতে চাই- 'ধূসর ধূলির পথ,/ ভেঙে পড়ে আছে রথ।/ বহুদূর দূর যেতে হবে;/ আজ তবে এইটুকু থাক/ বাকি কথা পরে হবে ...।'
কাওসার চৌধুরী :প্রামাণ্যচিত্র
নির্মাতা ও অভিনেতা
তার মহাপ্রয়াণে সংগীতবিশ্ব আজ বিবর্ণ। থেমে গেছে কণ্ঠ, থেমে গেছে সুর! নিভে গেছে গানের প্রদীপ- দপ করেই! কিন্তু কোটি শ্রোতার হৃদয়ে বেজে চলেছে শিল্পীকণ্ঠের সুর আর গান। বাজবে অনাদিকাল! প্রেম, বিরহ-বিচ্ছেদ, সুখপ্রাপ্তি, অর্জন, মানবতা, দেশপ্রেম, যুদ্ধ-বিগ্রহ, ভোরের আলো, গোধূলি, রাতের অন্ধকার, শ্রাবণের বারিধারা, আষাঢ়ের বর্ষণ, কার্তিকের কাশফুল, বসন্তের কৃষ্ণচূড়া, কোকিলের কুহুতান, ধ্রুপদ সংগীতের রাগ-রাগিণীসহ হেন কোনো বিষয় ও দিক বাকি নেই, যেখানে লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠ স্পর্শ করেনি!
গত প্রায় আট দশক সময় ধরে ৩৫টি ভাষায় ৩০ সহস্রাধিক (মতান্তর আছে) গান গেয়েছেন অমর এ শিল্পী। বাংলা ভাষায় গেয়েছেন ১৮৭টি গান। নিঝুম সন্ধ্যায়, আকাশ প্রদীপ জ্বলে, অন্তবিহীন কাটে না আর যেন, আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন, না যেয়ো না রজনী এখনও বাকি, ও আমার ময়না গো, একবার বিদায় দে মা, বাঁশি কেন গায়, কী লিখি তোমায়, সাত ভাই চম্পা জাগো রে, আজ তবে এইটুকু থাক ...। খুব খুশি হতাম, যদি ওই ১৮৭টি বাংলা গানের কথা বিশদভাবে এখানে উল্লেখ করা যেত! পরিসরের স্বল্পতায় সেটা সম্ভব নয়। বাংলা গান গাইতে গিয়ে লতা মঙ্গেশকর সব সময় কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন সুরস্রষ্টা সতীনাথ, সলিল চৌধুরী এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে। আজ তাদেরও কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি।
সংগীত আর সুরে কাঁটাতারের কোনো বেড়া নেই। নেই পাসপোর্ট কিংবা ভিসার ঝামেলা। সীমানা পেরিয়ে লতার গান বিস্তৃত হয়েছে ভারত উপমহাদেশের অসংখ্য জনমানুষের হৃদয়ে। বাংলাদেশ এর বাইরে নয়। আমরা তো বটেই; আমাদেরও যারা বয়োজ্যেষ্ঠ, তাদেরও দিন শুরু হয়েছে লতার মতো শিল্পীদের গান শুনে। আবার রাতে, নিদ্রাদেবীর কোলে আশ্রয় নেওয়ার আগে আরেকবার কান পেতেছি লতারই গানে। কমপক্ষে চারটি প্রজন্মের রুচিবোধ তৈরি হয়েছে লতার গান শুনে।
মহান এ শিল্পীর কাছে বাংলাদেশ ঋণী। একাত্তরে ভারতের বিভিন্ন স্থানে গান গেয়ে লতা তহবিল সংগ্রহ করেছেন বাংলাদেশ সরকারের জন্য। গানের সেই দলে আরও ছিলেন আশা ভোঁসলে, কিশোর কুমার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মোহাম্মদ রফি, মান্না দে, সলিল চৌধুরীর মতো শিল্পীরা। ১৯৭২-এর ৩০ জানুয়ারি ভারতীয় একটি সাংস্কৃতিক দলের হয়ে ঢাকার পিলখানায় গান করেন লতা। সঙ্গে ছিলেন অভিনয়শিল্পী নার্গিস, সুনীল দত্ত, মালা সিনহাসহ আরও ক'জন ভারতীয় শিল্পী। সে যাত্রায় বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেও গান গেয়ে শোনান লতা মঙ্গেশকর। সে সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে লতার একটি ছবি বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রিকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে এর মাঝেই।
মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গঠিত 'বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থার' অন্যতম সংগঠক অভিনয়শিল্পী সৈয়দ হাসান ইমাম তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বাহাত্তরে বাংলাদেশে লতার অনুষ্ঠান সম্পর্কে লিখেছেন- 'বাংলাদেশের পক্ষে এদের দেখভাল করার দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। পিলখানায় মাটির একটা ঢিবির ওপর শতরঞ্চি বিছিয়ে ওপরে শামিয়ানা খাটিয়ে মঞ্চ করা হয়েছে। প্রচণ্ড শীতে লতাজি খালি পায়ে মঞ্চে এসে গান গাইলেন। শুনলাম, উনি জুতা পায়ে গান করেন না।'
শুধু তাই নয়; সংগীতকে লতা নিয়েছিলেন তার উপাসনা হিসেবে। অশ্নীল কোনো শব্দ বা সে ধরনের ভাষার উপস্থিতি আছে- এমন কোনো গানে কণ্ঠ দেননি লতা মঙ্গেশকর। পোশাকের ক্ষেত্রে শাড়ি ছিল তার প্রিয়। সেই শাড়িটিও পরিধান করতেন নিতান্তই নিজস্ব কায়দায়, অত্যন্ত মার্জিতভাবে। কথিত আছে- 'নগ্ন নারীমূর্তি' পুরস্কারের ক্রেস্ট হিসেবে গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোয় ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের 'নগ্ন মূর্তির ক্রেস্ট'টি একটি রুমালে জড়িয়ে তাকে প্রদান করতে হয়েছিল।
১৯২৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর দীননাথ মঙ্গেশকর আর সেবন্তী মঙ্গেশকরের ঘরে এলো তাদের প্রথম সন্তান; নাম রাখলেন হেমা। পণ্ডিত দীননাথ নিজেও সংগীত আচার্য ছিলেন। সংগীত ও নাটক- দুই ক্ষেত্রেই ছিল তার সাবলীল যাতায়াত। মঞ্চ নাটক লিখতেন, সঙ্গে অভিনয়ও করতেন। নাটকের প্রয়োজনে গানও গাইতেন। 'ভাউবন্ধন' নামে এক নাটক পরিচালনার পর নাটকের প্রধান চরিত্র লতিকাকে খুব মনে ধরেছিল দীননাথ-সেবন্তী দম্পতির। তাই সন্তানের নাম হেমা থেকে বদলে রাখা হলো লতা; লতা মঙ্গেশকর।
লতা মঙ্গেশকরের পুরো পরিবারই বলতে গেলে সংগীতের রথী-মহারথী। লতার পর একে একে সেবন্তীর কোলে আসেন আশা ভোঁসলে, উষা মঙ্গেশকর, মীনা মঙ্গেশকর ও সর্বকনিষ্ঠ হৃদয়নাথ মঙ্গেশকর। পিতার ছায়া খুব বেশিদিন থাকেনি মঙ্গেশকর পরিবারের ওপর। লতার বয়স যখন মাত্র ১৩ বছর, তখন (১৯৪২ সাল) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে দীননাথ মঙ্গেশকর মারা যান। ফলে সম্পূর্ণ পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে ১৩ বছর বয়সী লতার ওপর। সেই থেকে লতার লড়াইয়ের শুরু। লতা মঙ্গেশকরের শিল্পী হিসেবে বেড়ে ওঠা যতটা না প্রতিভার; তার চাইতে দ্বিগুণ ছিল তার চর্চা, অধ্যবসায় আর সংগীতের প্রতি একনিষ্ঠতা। অগণিত পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন তিনি। ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার থেকে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন লতা মঙ্গেশকর। কিন্তু সবচেয়ে বড় পুরস্কারটি ছিল কোটি কোটি শ্রোতার ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা। চলচ্চিত্রে গান গাওয়া, সেই গানে সফলতা, ভারতীয় চলচ্চিত্র এবং রেডিওতে গান পরিবেশন করে লতা মঙ্গেশকরের এক এবং অদ্বিতীয় হয়ে ওঠার কাহিনি কমবেশি সবারই জানা। তার প্রয়াণের পর বিভিন্ন প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেছে। সেখান থেকে পাঠক অনেক সমৃদ্ধ হয়েছেন সেসব বিষয়ে। আমি লতা মঙ্গেশকরের বিশেষ দুয়েকটি দিকের ওপর সামান্য আলোকপাত করে লেখাটি সমাপ্ত করতে চাই।
সংগীতচর্চায় লতার একাগ্রতা আর নিষ্ঠা নিয়ে ভারতের এ প্রজন্মের প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক এ.আর. রহমান তার ভিডিওবার্তায় উল্লেখ করেছেন গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য। তিনি লিখেছেন, লতাজি একবার তাকে ফোনে বলেছিলেন- "আগে নওশাদ সাহেব একটা গান রেকর্ডিং করার আগে ১১ দিন ধরে প্র্যাকটিস করাতেন। তোমরা এখন কতটা সময় নাও প্রাক-রেকর্ডিং প্রস্তুতি সারতে?' তখন আমি (এ.আর. রহমান) বুঝতে পারি যে একটা গান রেকর্ড করার নেপথ্যে কতটা ভালোবাসা, আধ্যাত্মিকতা, আকাঙ্ক্ষার প্রয়োজন হয়। লতা মঙ্গেশকরই আমাকে শিখিয়েছেন- সংগীত সাধনা হোক কিংবা যে কোনো সৃষ্টি- নিজেকে সেখানে পুরোপুরি উৎসর্গ করে দিতে হয়। তিনিই শিখিয়েছেন, 'কর্ম করে যাও, ফলের আশা করো না'।" এ.আর. রহমানের এই উক্তি থেকে আমাদের অনেক কিছুই শেখার আছে। বুঝে নেওয়ার বাকি আছে আমাদের তরুণ প্রজন্মের!
লতা মঙ্গেশকরের প্রয়াণে শুধু ভারত নয়; শোকে ভাসছেন বাংলাদেশের অজস্র সংগীতপ্রেমী। আনন্দ কিংবা বিষাদে এ অঞ্চলের মানুষ বারবার আশ্রয় নিয়েছেন লতা মঙ্গেশকরের গানে, সুরে এবং তার কণ্ঠের জাদুতে। আগামী দিনেও লতা মঙ্গেশকরের গানই ছায়া দেবে সংগীতপিপাসুদের।
একটি কলাম, একটি দিনের শ্রম কিংবা শুধু একটি খাতায় লিখে লতা মঙ্গেশকরের জীবন আর কীর্তির কথা শেষ করা যাবে না। তাকে নিয়ে লেখা যাবে বহুদিন, খরচ হবে বহু খাতার অনেক পাতা। তার চেয়ে বরং তার গানের কয়েকটি লাইন দিয়ে আজকের লেখাটি সমাপ্ত করতে চাই- 'ধূসর ধূলির পথ,/ ভেঙে পড়ে আছে রথ।/ বহুদূর দূর যেতে হবে;/ আজ তবে এইটুকু থাক/ বাকি কথা পরে হবে ...।'
কাওসার চৌধুরী :প্রামাণ্যচিত্র
নির্মাতা ও অভিনেতা
- বিষয় :
- শ্রদ্ধাঞ্জলি
- কাওসার চৌধুরী
- লতা মঙ্গেশকর
