সমকালীন প্রসঙ্গ
দুদক কর্মকর্তা শরীফ এবং সার্গেই ম্যাগনিটস্কি
জাহেদ উর রহমান
প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:০০
র্যাব এবং এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি হিউম্যান রাইটস অ্যাকাউন্ট্যাবিলিটি অ্যাক্টের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা জারির প্রেক্ষাপটে ম্যাগনিটস্কির নামটি সম্প্রতি আমরা অনেকেই জেনেছি। কয়েক দিন ধরে দুদক কর্মকর্তা মো. শরীফ উদ্দিনকে নিয়ে যা হচ্ছে, সেটা আমাকে ম্যাগনিটস্কিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিনের চাকরিচ্যুতি সারাদেশের রাজনীতি-সচেতন মানুষের মধ্যে আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে ওএসডি হওয়া, পদোন্নতিবঞ্চিত হওয়া, বদলি হওয়া খুব অভাবনীয় ঘটনা নয় এই দেশে। সম্ভবত সরাসরি চাকরিচ্যুত হওয়া এবং প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার বিষয়টি মূলধারার সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিকমাধ্যমে অনেক বেশি আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না রাখা দুদকের চাকরির যে ধারায় শরীফ উদ্দিনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, সেই ধারা সংবিধানের সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক এবং সেটা নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান। আইনে এমন একটি ধারা থাকা কিংবা সেই ধারা ব্যবহার করে কাউকে চাকরিচ্যুত করা আপাতদৃষ্টিতে খুব বিস্ময়কর মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে সেটা নয়।
তার প্রাণনাশের হুমকি পাওয়া, এখনও প্রাণভয়ে প্রায় পালিয়ে থাকা- সবকিছুই বর্তমান বাংলাদেশে কি খুব অস্বাভাবিক? দুদক সচিব মিডিয়ার সামনে ঘটনাটি নিয়ে নানা কথা বললেও স্পষ্ট করে বলেননি- কেন শরীফকে পদচ্যুত করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের একজন সর্বোচ্চ পর্যায়ের আমলা তার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার সঠিক ব্যাখ্যা দিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবেন- এমন কিছু কি আমরা প্রত্যাশা করি?
শরীফকে চাকরিচ্যুতি সমালোচনার বিনিময়ে তাকে চাকরিচ্যুত করা মানুষরা যা অর্জন করেছে, সেটা অসাধারণ। তাদের দিক থেকে এ এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে নতুন একটা শঙ্কাও সম্ভবত তৈরি হয়েছে তাদের জন্য; সেই আলাপের আগে শরীফের খবরে কেন ম্যাগনিটস্কির কথা মনে পড়ল, সেটা বলা যাক।
২০০৮ সালে রাশিয়ার আইনজীবী সার্গেই ম্যাগনিটস্কি রাশিয়ান সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগসাজশে ২৩ কোটি ডলার বা প্রায় ২০০০ কোটি টাকার আর্থিক কেলেঙ্কারির তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করেন। রাশিয়ার শাসনকারী গোষ্ঠীর (অলিগার্ক) কিছু মানুষের মালিকানার কিছু কোম্পানির কর ছাড়ের মিথ্যা দাবিতে ওই পরিমাণ টাকা সরকার থেকে দেওয়া হয়। এর আগেও দুর্নীতি নিয়ে কাজ করা ম্যাগনিটস্কি এবার আর ছাড়া পান না। বিষয়টি জেনে গিয়ে পুলিশ ম্যাগনিটস্কিকে ধরে নিয়ে যায়। কারাগারে নির্যাতনের শিকার হন তিনি। নির্যাতনে প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়লেও চিকিৎসা পাননি; কারাগারেই মারা যান।
অনুমিতভাবেই রাশিয়ান সরকার কোনো দায় স্বীকার করেনি এ ঘটনার। তবে আমাদের অবাক করবে এই তথ্য- রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মানবাধিকার কমিশন (ক্রেমলিনস হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল) তাদের তদন্ত রিপোর্টে বলে, 'জীবনের শেষ মুহূর্তে ম্যাগনিটস্কিকে চিকিৎসাসেবা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করা হয়েছে। সঙ্গে এটা বলার মতো যথেষ্ট যৌক্তিক ভিত্তি আছে যে ম্যাগনিটস্কির মৃত্যুর কারণ প্রহার এবং নির্যাতন।'
রাশিয়ার মতো দেশের মানবাধিকার কাউন্সিলও অন্তত এ ক্ষেত্রে তার দায়িত্ব পালন করেছে। ওই ঘটনার পর তৎকালীন মার্কিন সরকার রাশিয়ার মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার জন্য ম্যাগনিটস্কির নামে আইন প্রণয়ন করে। পরবর্তীকালে এই আইনের চৌহদ্দি বাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী নানা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
রাশিয়ায় জেঁকে বসা এক ভয়ংকর গোষ্ঠীতন্ত্রের (অলিগার্কি) বিরুদ্ধে লাগার মাশুল জীবন দিয়ে দিয়েছেন তরুণ আইনজীবী ম্যাগনিটস্কি। এখানে একটা স্বস্তিদায়ক অমিল আছে দুদক কর্মকর্তা শরীফের সঙ্গে। তিনি বেঁচে আছেন। যদিও মৃত্যুর হুমকি পেয়েছিলেন তিনি চাকরি হারানোর আগেই; জিডি করেছিলেন তখন। এখনও তিনি এক রকম পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এবং জীবনহানির আশঙ্কা করছেন।
ম্যাগনিটস্কি দুর্নীতির তদন্ত করেছিলেন একজন স্বাধীন আইনজীবী হিসেবে। কিন্তু শরীফ রাষ্ট্রীয়ভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন দুর্নীতির তদন্ত করার জন্য। তিনি তার চাকরির আইনি চৌহদ্দির মধ্যে থেকে তার দায়িত্বটি সুষ্ঠুভাবে পালন করেছিলেন মাত্র। কিন্তু সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন এই দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিপজ্জনক। তার চাকরিচ্যুতির ঘটনা আবারও প্রমাণ করল- বাংলাদেশেও একটা গোষ্ঠীতন্ত্র কায়েম হয়েছে।
বেশ কিছু বড় অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায়। এসব অবকাঠামোর গৌণ উদ্দেশ্য হচ্ছে এর মাধ্যমে উন্নয়নকে দৃশ্যমান করা। আর মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে অভাবনীয় দুর্নীতির মাধ্যমে কিছু মানুষের (অলিগার্ক) অকল্পনীয় সম্পদের মালিক বনে যাওয়া। যৌক্তিক ব্যয়ের কয়েক গুণ খরচে তৈরি বাংলাদেশের অবকাঠামো ব্যয় বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ- এই কথা এখন আর বিরোধী দল কিংবা দুর্নীতি নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর কথা নয়; কয়েক বছর আগে বিশ্বব্যাংক সংবাদ সম্মেলন করে এ কথা বলেছিল। অতি প্রভাবশালী গোষ্ঠীটি শরীফকে এভাবে চাকরিচ্যুত করে আরও অনেককে এই বার্তা দিতে চেয়েছে- তাদের বিরুদ্ধে লাগার ফল কী হতে পারে।
আশা করি, শরীফ নিরাপদে থাকবেন; তাকে অন্তত প্রাণনাশের শিকার হতে হবে না। শরীফের পদচ্যুতির প্রতিবাদে দুদকের অনেক কর্মকর্তা রাস্তায় নেমে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। শরীফের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ অন্য সবাইকে ভীত করে আরও অনুগত না করার পরিবর্তে অনেককে আবার কয়েক গুণ ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। হতে পারে, তরুণ কর্মকর্তাদের একটা দল দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে শক্ত হয়ে লড়ার শপথ নেবে। এটা পরাক্রমশালী গোষ্ঠীটির মনে উল্টো শঙ্কাও তৈরি করতে পারে, যার কথা শুরুর দিকে বলেছিলাম। দেশকে লুটপাটকারী গোষ্ঠীর কাছে যেটা শঙ্কার; বলা বাহুল্য, আর সব নাগরিকের কাছে সেটাই আশার ও আনন্দের।
ডা. জাহেদ উর রহমান: শিক্ষক ও নাগরিক অধিকার কর্মী
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ
- জাহেদ উর রহমান
