ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

কবিতার কাঠকয়লা

কবিতার কাঠকয়লা
×

অলংকরণ :: বোরহান আজাদ

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ০৭:৪৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

কবিতায় গাঢ় ও ঘন অবয়বের পেছনে ও আড়ালে থাকে কবির অনিঃশেষ অভিজ্ঞতার নির্যাস। কবিতার নির্মাণ নেপথ্যসহ তিন কবির কবিতা...

মারুফুল ইসলাম

সাঁইজি

নিজেকে দেখতে গিয়ে অপর দেখেছি
অপর দেখতে গিয়ে পর দেখেছি
পর দেখতে গিয়ে ঘর দেখেছি
ঘর দেখতে গিয়ে ঘর ছেড়েছি
নিজেকে দেখাতে গিয়ে কণ্ঠস্বর ছেড়েছি

সাঁইজি বলেন, বেশ
দেখো রাধাকৃষ্ণের আশ্লেষ
বলো কোনটা কৃষ্ণের বাহু
কোনটা রাধার কেশ

ভাবের রেশ অশেষ
মনেতে আউলিয়া হয় মনেতে দরবেশ

নিজেকে জানতে কে না চায়? কে চায় না নিজেকে চিনতে? কে যায় না নিজেকে খুঁজতে দশদিগন্তে? তেপান্তরে নদীপ্রবাহে মরুবুকে পর্বতচুড়োয় সমুদ্রগর্ভে অরণ‍্যক্রোড়ে মহাকাশে–এই অন্বেষণ অনন্ত অসীম। কিন্তু এর বিপরীতেও আছে আরও এক প্রেমময় আত্মঅন্বেষণ। সেই খোঁজা নিজেকে বোঝার কথা বলে রক্তকণিকায়, অন্তরের অভীপ্সায়, মর্মমূলে, অস্তিত্বের আলো-অন্ধকারে। তাই কোনো এক সন্ধ‍্যায়, যখন আমি একা, ঈশ্বরের চাইতেও নিঃসঙ্গ, তখন আমার ভাবনায় জন্ম নেয় এমন এক কবিতা; যার ভাব ভাষা ছন্দ ব‍্যাকরণ অভিব‍্যক্তি ব‍্যঞ্জনা সবকিছু আমার জন‍্য অভিনব। আমার যা ইচ্ছে তা ভাবার কবিতা, আমার যা ইচ্ছে তা লেখার কবিতা, আমার যেরকম ইচ্ছে সেরকম প্রকাশের কবিতা। সে প্রায় এক দশক আগেকার কথা, লেখা হলো প্রথম সাঁইজি কবিতা। তারপর একের পর এক। ২০১৬-য় প্রকাশিত হলো সাঁইজি কবিতাগুচ্ছের প্রথম বই–সাঁইজি। তারপর একে একে বের হলো আরও তিনটে কাব্যগ্রন্থ–সাঁইজি পুনশ্চ (২০১৯), সাঁইজি পরিশেষ (২০২৩), সাঁইজি অনিঃশেষ (২০২৬)।

কিন্তু সাঁইজি কবিতা লেখা চলতেই থাকে।
কী আছে সাঁইজি কবিতায়? কী নিয়ে লিখি আমি সাঁইজি? এ কি শুধু মরমি কবিতা? আধ‍্যাত্মিক ভাবের কাব‍্যপ্রকাশ? বাউলদর্শন? নাকি আমার নিজের ভেতরটিকে আমার প্রতিবেশ সমাজ সমকাল ইতিহাস ঐতিহ্য দর্শন পুরাণ কিংবদন্তি লোককথা রূপকথা নশ্বরতা চিরন্তনতা সবকিছুসহ প্রকাশের এক আত্মমগ্ন প্রকল্প? যেখানে একটা মুহূর্তের গর্ভে একইসঙ্গে জন্ম নেয় জীবনের নিত‍্যতা এবং অনিত‍্যতা। যেখানে একটি আমির ভেতরে থাকে অজস্র আমি। যেখানে স্ববিরোধ স্বাভাবিক। যেখানে জীবনধর্ম স্বতঃস্ফূর্ত। যেখানে শিল্প মৃত্তিকাসঞ্জাত।
আজকের সাঁইজি কবিতাটাও কাকতালীয়ভাবে রচিত হয়েছে কয়েকদিন আগের এক একাকী সন্ধেবেলায়, ঠিক প্রথমটার মতো। কিন্তু পুরোটা নয়, দুই স্তবক। দুই পংক্তির তৃতীয় তথা শেষ স্তবকটা লেখা হয়েছে একদিন পর। কারণ মনের মধ‍্যে কাজ করছিল অসম্পূর্ণতার অস্বস্তি। কেবলই মনে হচ্ছিল, কবিতাটা পায়নি যথাযথ পরিণতি। আর তা থেকেই প্রসূত হয়েছে শেষ দুই চরণ; যার প্রথমটা আমার, দ্বিতীয়টা হাছন রাজার গানের কলি।


 

আলফ্রেড খোকন

যে কোনো দিবসের কবিতা

শ্রমিকেরা কোনো দিনই পাবে না ন্যায্য মজুরি
‘বাজারে মালের দাম কম’ এই একমাত্র জুজুবুরী
দিয়ে জগতের সকল বণিকেরা হয়েছে রচিত; 
তাদের কারখানা তবু হতে থাকবে সম্প্রসারিত।

যে তুমি আমার কাছে মে দিবসের কবিতা চাও
কবি তো শ্রমিক তার কাছে পাওয়া যাবে ফাও
যে শ্রমিক ঊনমজুরিতে কারখানায় লেখে ক্ষত:
দৈনিকের সাহিত্য পাতায় সে তরুণ কবির মত।

এ কবিতা লিখে রাখছি বেদনার বিষণ্ন খাতাতে
শ্রমিকেরা ঘাম দিয়ে লিখে রাখছে কারখানাতে
কবিরা কলম দিয়ে লিখে যাচ্ছে এই সমস্ত ভুল;
শ্রমিকের কলমের নিবে চাপা পড়ে সহস্র আঙুল। 
২৯ এপ্রিল ২০২৬

উত্তর আমেরিকা থেকে একজন সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক চলতি মে মাসের আগেই ফোন করে বললেন, ‘ভাই, আসছে মে দিবস উপলক্ষে আমার পাতার জন্য আপনার একটি কবিতা লাগবে।’ আমি তাঁকে বললাম, ‘২৫ সালের মে দিবসে দিয়েছিলাম, এবার মাফ করে দেন।’ তাঁর লেখা চাওয়ার ভঙ্গিটা সুন্দর। সহজে না করা যায় না। তবে এবার আমি না-ই করলাম। তিনি জানতে চাইলেন– তাঁকে কবিতা না দেওয়ার বিশেষ কোনো কারণ আছে কিনা। আমি বললাম, ‘তা তো আছেই, মে দিবসে আর ফাও কবিতা দিতে চাই না।’ কবিতা লিখতে আমার সর্বোচ্চ শ্রম দিতে
হয়। তারপরও যদি চান তবে কিন্তু একথাটাই লিখব কবিতায়। তিনি বললেন, লিখে দিন আমি ছাপব। এভাবেই যে কোনো দিনের কবিতা লেখা হয়। এটি তাঁকে দিইনি, আরেকটি কম পরিশ্রমে লেখা কবিতা তাঁকে ই-মেইল করেছিলাম।

 

 

সাকিরা পারভীন

অ  ফিসের শহীদ মিনারের মেঝেতে বসে থাকি মাঝেমধ্যে। আগত সন্ধ্যা দেখি। সজনে পাতাদের সাজগোজ, কাকেদের প্রেমবিরহ মেঘেদের পাগলামি এইসব অথবা কিচ্ছু নয়। শুধুমাত্র কিছু নার জন্য বসে থাকি। তো একটা এরোপ্লেন উড়ে যায়– তো কি হয়েছে? কতই তো যায় আর মেঘের বুকে একটা দাগ টেনে চলে যায় বহুদূর। সেদিনের সেই দাগটুকুই আমার হাতে কলম তুলে দেয় কবিতার।

আলাপের দিঘল ক্ষতিরেখা

তখন তুমি সিঙ্গেল মল্টের বোতল নিয়ে বসেছ। বিকাল।
আমি তালপাতার পাখা দিয়ে হাওয়া টানছি। শুকাচ্ছি। রং।
এক টুকরো আগেই এক কোটি ড্রামে ড্রামে গুলেছিলাম। রং।
ছাল-চামড়া উঠো যাওয়া বুকে
ধুঁকে ধুঁকে মরা সাদা মেঘের ওপর আজই ঢেলেছি।
ভালো করে শুকাতে পারিনি।

এরই মধ্যে একটি এরোপ্লেন উড়ে গেল। যার যখন খুশি উড়ে যায়।
যাবার সময় একটা দাগ কেটে যায়। সেই দাগ দেখতে মেঘে মেঘে বৃষ্টিরা ঝরে। মরে। সঙ্গে চাতক।
আর কয়েকটি কালো কাকও। এলো। আর তারা ফিরেও গেল। বাড়ি।

এইসব বিদগ্ধ আহাজারি দেখতে শুনতে গিরিজা দেবী মঞ্চে উঠলেন।
এক খিলি পান পুরে দিয়ে ঘণ্টাকাল সা ণ্‌ ণ্‌ র সা। আর কিছু না।
অনেক বসন্ত যায়, শীত। দিঘল দাগটার দিকে
একজন মেয়েলোক অপলক তাকিয়েই থাকে।
হাজার বছর পর আমার আকাশ জীবন ধন্য হয়।
মনে হয় এরোপ্লেনটাকে চুমু খাই।
মনে হয় দাগ ছাড়া কোনোদিন আলাপের সারগাম জমে না কিছুতেই।

আরও পড়ুন

×