প্রিয় দৃশ্য, প্রিয় সিনেমা
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ০৭:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
নিজের অভিনীত সিনেমার কিছু দৃশ্য শিল্পীদের কাছে কেবল কাজ নয়। এগুলো হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত স্মৃতি, অভিজ্ঞতা আর আবেগের অংশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃশ্যগুলোই তাদের অভিনয়যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে ওঠে। নিজেদের অভিনীত সিনেমার প্রিয় দৃশ্য ও সেই কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন চঞ্চল চৌধুরী এবং আফরান নিশো...
চঞ্চল চৌধুরী, অভিনয়শিল্পী
‘মনপুরা’ আমার অভিনয়জীবনের এমন একটি কাজ, যেটা শুধু একজন অভিনেতা হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবেও আমাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সোনাই চরিত্রটা করতে গিয়ে আমি যেন অন্য এক জগতে চলে গিয়েছিলাম। সেই জগতের নাম মনপুরা। যেখানে নদী আছে, কুয়াশা আছে, ঝড় আছে, অথচ মানুষের ভিড় নেই। আছে নিঃসঙ্গতা, অপেক্ষা আর বুকভরা এক ধরনের নীরব কষ্ট।
সোনাই ছোটবেলা থেকেই সে বঞ্চনার মধ্যে বড় হয়েছে। তারপর ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তাকে নির্বাসনে যেতে হয় মনপুরা দ্বীপে। এই দ্বীপে এসে সে যেন মানুষ থেকে ধীরে ধীরে প্রকৃতির অংশ হয়ে ওঠে। নদী তার সঙ্গী, বাতাস তার ভাষা, আর পশুপাখি তার আপনজন। চরিত্রটি করতে গিয়ে আমি বুঝেছিলাম, একজন মানুষ যখন দীর্ঘদিন মানুষের সংস্পর্শ ছাড়া বেঁচে থাকে, তখন তার ভেতরের নীরবতা কত ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। মনপুরার লোকেশনগুলো সত্যিই অসাধারণ ছিল। বিশাল নদী, কাদামাটি, খোলা আকাশ, দূরে জেগে থাকা চর। সবকিছু মিলিয়ে একটা বিচ্ছিন্ন পৃথিবীর অনুভূতি তৈরি হতো। শুটিংয়ের সময় অনেক মুহূর্তে মনে হয়েছে, আমি অভিনয় করছি না, সত্যিই যেন নির্বাসিত একজন মানুষ হয়ে সেখানে বেঁচে আছি। বিশেষ করে নদীর পারে একা বসে থাকা, পশুপাখির সঙ্গে কথা বলা কিংবা দূরের কোনো নৌকার দিকে তাকিয়ে থাকার দৃশ্যগুলো আমার কাছে খুব আবেগের ছিল। সোনাইয়ের সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা ছিল– সে কথা বলতে চায়, কিন্তু বলার মতো মানুষ নেই। এই একাকিত্বের অনুভূতি প্রকাশ করা খুব কঠিন ছিল। আমি চেষ্টা করেছি, সোনাইয়ের নীরবতা অনুভব করতে। তার ভেতরের হাহাকার নিজের মধ্যে ধারণ করতে।
একটা দৃশ্য এখনও খুব মনে পড়ে। সোনাই নদীর পারে বসে দূরে তাকিয়ে আছে। চারপাশে শুধু বাতাসের শব্দ আর নদীর স্রোত। ওই দৃশ্য ধারণের সময় আমার মনে হচ্ছিল, এই মানুষটা আসলে পৃথিবীর সবচেয়ে একা মানুষ। সে হয়তো চিৎকার করে কাউকে ডাকতে চায়, কিন্তু জানে। কেউ শুনবে না। একজন অভিনেতা হিসেবে এই অনুভূতি আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। আর পশুপাখির সঙ্গে সোনাইয়ের সম্পর্কটা ছিল প্রতীকী। কারণ মানুষ তাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু প্রকৃতি তাকে গ্রহণ করেছে। তা হলো গরু, ছাগল, পাখি। এসবের সঙ্গে কথা বলে, তাদের সঙ্গে সময় কাটায়। যেন ওরাই তার পরিবার। এই দৃশ্যগুলো করতে গিয়ে আমার নিজেরও মনে হয়েছে, প্রকৃতির কাছে মানুষ কত অসহায়, আবার কত শান্তিও খুঁজে পায়। তারপর পরির আগমন। পরি যেন সোনাইয়ের অন্ধকার জীবনে হঠাৎ আলো হয়ে আসে। দীর্ঘ নিঃসঙ্গতার পর একজন মানুষের মুখ, একজন মানুষের কণ্ঠস্বর। এসব সোনাইয়ের জীবনে নতুন করে বেঁচে থাকার অনুভূতি তৈরি করে। পরিকে দেখার পর সোনাইয়ের চোখে যে পরিবর্তন আসে, সেই অনুভূতিটা খুব সূক্ষ্মভাবে ধরার চেষ্টা করেছি আমি। কারণ এটা শুধু প্রেম ছিল না, এটা ছিল এক নির্বাসিত মানুষের জীবনে মানবিকতার ফিরে আসা। আমার মনে হয়, ‘মনপুরা’র সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর সরলতা। এখানে প্রেম আছে, কিন্তু সেই প্রেম চিৎকার করে না। এখানে কষ্ট আছে, কিন্তু সেটা অতিনাটকীয় নয়। সবকিছু খুব নীরবে, খুব গভীরভাবে দর্শকের হৃদয়ে গিয়ে লাগে। আজও যখন কেউ ‘মনপুরা’র কথা বলেন, আমি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি।
আফরান নিশো, অভিনয়শিল্পী
বাংলা চলচ্চিত্রে আমার যাত্রাটা শুরু হয়েছিল ‘সুড়ঙ্গ’ দিয়ে। তাই সিনেমাটি আমার কাছে শুধু একটি কাজ নয়, অনেকটা নিজের জীবনের একটা নতুন অধ্যায়ের মতো। একজন অভিনেতা হিসেবে দীর্ঘদিন কাজের পরও প্রথম সিনেমা নিয়ে যে ধরনের নার্ভাসনেস, উত্তেজনা আর আবেগ কাজ করে, সেটা আমি খুব কাছ থেকে অনুভব করেছি। এখনও যখন এ সিনেমার কথা ভাবি, মনে হয় আমি যেন আবার সেই সময়ে ফিরে গেছি। যখন প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি শট, প্রতিটি মুহূর্ত আমার কাছে নতুন এক অভিজ্ঞতা ছিল। এই সিনেমার অনেক স্মৃতি আছে আমার। কিন্তু যদি সবচেয়ে প্রিয় কোনো দৃশ্যের কথা বলতে হয়, তাহলে আমি অবশ্যই বলব মাটির নিচে একা সুড়ঙ্গ খোঁড়ার দৃশ্যটির কথা। কারণ ওই দৃশ্যটি শুধু অভিনয় ছিল না, এটা ছিল একটা মানসিক ও শারীরিক যাত্রা। একজন মানুষ যখন চারপাশের সব পথ বন্ধ দেখে নিজের জন্য নতুন একটা পথ তৈরি করতে চায়, তখন তার ভেতরে যে ভয়, হতাশা, ক্ষোভ আর বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। সেই অনুভূতিটা ধারণ করার চেষ্টা করেছি আমি।
শুটিংয়ের সময় পুরো সেটআপটাই এমন ছিল, যাতে আমরা বাস্তব অনুভূতির কাছাকাছি যেতে পারি। সংকীর্ণ জায়গা, চারপাশে মাটি, কম আলো, গরম আর দমবন্ধ করা পরিবেশ। সব মিলিয়ে একটা চাপ তৈরি হতো। অনেক সময় সত্যিই নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতো। কিন্তু আমি মনে করি, সেই কষ্টটাই দৃশ্যটাকে বাস্তব করেছে। কারণ একজন অভিনেতা হিসেবে আমি সব সময় চাই, দর্শক যেন অভিনয় না দেখে, একটা বাস্তব মানুষকে অনুভব করে।
ওই দৃশ্যের একটা বিষয় আমাকে খুব নাড়া দিয়েছিল। তা হলো নিঃসঙ্গতা। চরিত্রটা তখন সম্পূর্ণ একা। তার পাশে কেউ নেই, তাকে সাহস দেওয়ার কেউ নেই। শুধু নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই। এই একাকিত্বটা অনুভব করার জন্য আমি শুটিংয়ের আগে অনেক সময় নিজেকে চুপচাপ রেখেছি। আমি চেয়েছিলাম চরিত্রটির মানসিক অবস্থাটা নিজের মধ্যে তৈরি করতে। কারণ অনেক সময় সংলাপের চেয়ে চোখের ভাষা, নিঃশ্বাসের শব্দ বা নীরবতা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সুড়ঙ্গ খোঁড়ার সময় চরিত্রটির মধ্যে একটা জেদ ছিল। এই জেদটা আসলে জীবনেরই একটা প্রতীক। আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে নিজেদের জীবনের সুড়ঙ্গ খুঁড়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। হয়তো এ কারণেই দর্শক দৃশ্যটার সঙ্গে এত বেশি কানেক্ট করতে পেরেছেন। আমি এখনও মনে করতে পারি, শুটিংয়ের পর শরীর ভীষণ ক্লান্ত হয়ে যেত। মাটি, ধুলা আর ঘামে পুরো শরীর ভরে থাকত। কিন্তু মনটা অদ্ভুতভাবে তৃপ্ত থাকত। কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম, আমরা একটা গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য তৈরি করছি। পরে যখন সিনেমা মুক্তি পেল আর দর্শকের প্রতিক্রিয়া দেখলাম, তখন মনে হয়েছে আমাদের সেই পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। অনেকেই আমাকে বলেছেন, ওই দৃশ্য দেখার সময় তারা নিজেরাও অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। একজন অভিনেতার জন্য এর চেয়ে বড় প্রশংসা আর কী হতে পারে! আরেকটি বিষয় আমি সব সময় অনুভব করি। ‘সুড়ঙ্গ’ আমাকে নতুনভাবে চিনিয়েছে। আমি চেয়েছিলাম, প্রথম সিনেমাতেই এমন একটা চরিত্র করতে, যেটা মানুষ অনেকদিন মনে রাখবে। আলহামদুলিল্লাহ, দর্শক সেই ভালোবাসা দিয়েছেন। আমার কাছে ‘সুড়ঙ্গ’ শুধু একটি সিনেমা নয়, এটা আমার সাহসের গল্পও। একজন অভিনেতা হিসেবে নিজের সীমা ভাঙার গল্প।
- বিষয় :
- সিনেমা
