ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মিরাফ্লোরের মেঘবনানী ও করোটি-বৃশ্চিক

মিরাফ্লোরের মেঘবনানী ও করোটি-বৃশ্চিক
×

মিরাফ্লোর

মঈনুস সুলতান, কথাশিল্পী

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ০৭:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

একটু আগে মিরাফ্লোর পাহাড়ের মাঝামাঝি লেয়ারে ইভা মরালেসদের এককালের পারিবারিক খামারবাড়ি ফিনকা নেবলিনাতে গিয়েছিলাম। নিকারাগুয়ার ইসতেলি শহরের কাছাকাছি মেঘবনানী-ঋদ্ধ পাহাড় মিরাফ্লোর সম্পর্কে আমার আগ্রহ প্রচুর, যেহেতু এ পার্বত্য জনপদের একটি বনেদি খামারবাড়িতে শৈশরের সুন্দর দিনগুলো কাটিয়েছে ইভা মরালেস, সুতরাং আমি এখানে খানিকটা ঘোরাফেরার জন্য মেয়েটির ওপর ভরসা করে আছি। বয়সের নিরিখে ইভা আমার অনেক কনিষ্ঠ, তবে নানা কারণে ইতিমধ্যে তার সঙ্গে আমার বেশ খানিকটা অন্তরঙ্গতা গড়ে উঠেছে। ইসতেলি শহরে ‘ইসকুয়েলা হরাইজনতি’ নামে এসপানিওল ভাষা শিক্ষার যে বিদ্যালয়ে বর্তমানে আমি শিক্ষার্থী, ওখানে ইভা শিক্ষয়িত্রী হিসেবে কর্মরত। এ ছাড়া প্রতিদিন এসপানিওলে লক্যাল পত্রিকা ও শিশুতোষ বইপত্র পড়ার ব্যাপারে সে আমাকে সহায়তা করছে। এসপানিওল ভাষায় বইপত্তর কিছুটা পড়তে পারলেও এখনও আমি চিঠিচাপাটি সুশারে লিখে উঠতে পারছি না। ভাষাগত এ খামতি কাটানোর প্রয়োজনে ইসকুয়েলা থেকে লটারির মাধ্যমে ইভাকে আমার ‘আমিগা সিকরেতা’ বা ‘গোপন বান্ধবী’ হিসেবে নির্বাচন করে দেওয়া হয়েছে। এ সম্পর্ক স্থাপনের পর থেকে আমরা প্রতিদিন পরস্পরের সাথে চিঠিপত্র বিনিময় করছি, এবং আমাদের জীবনের যেসব বিষয় মুখ ফুটে বলতে পারি না, তা পত্র মারফত আলোচনাও করতে পারছি।
ফিনকা নেবলিনা নামক ইভাদের পারিবারিক খামারবাড়িটি বিপ্লব-উত্তর বর্তমানে হয়েছে সমাজতান্ত্রিক কেতার একটি কো-অপারেটিভ। মরালেস পরিবারের রেসিডেনশিয়াল শ্যালে– যেখানে কেটেছে ইভার শিশুকাল, তাও বদলে হয়েছে টুরিস্টদের প্রিয় গেস্ট হাউস। ইভা ওখানে যেতে চায়নি। তবে আমি তীব্র কৌতূহলবশত তাদের পারিবারিক খামারবাড়িটি একনজর দেখতে চেয়েছিলাম। মিরাফ্লোর পাহাড়ের ওপরের লেয়ার থেকে নেমে এসে ইভার সাথে যোগ দিতেই, তার কাছে ছুটে আসে তার শৈশবের ফ্যামিলি ডগ অদনচিয়ার সন্তান ব্রিসা।
পিকনিক-লাঞ্চের জন্য নিয়ে আসা আধখানা চিকেন-তমালে ব্রিসাকে খাইয়ে, তাকে ফিনকা নেবলিনার শ্যালেতে ফিরে যেতে বলে ইভা। তারপর গাছ থেকে ঝুরি নামা লতা ধরে বড়সড় বোল্ডার ডিঙিয়ে, কখনওবা মাটির ওপর সরীসৃপের মতো এঁকেবেঁকে জেগে থাকা শিকড়ে পা দিয়ে নিচের দিকে আমরা দুজনে একত্রে নামি। নামতে গিয়ে পায়ের ভিন্ন কিছু মাসলে চাপ পড়ে। এদিকে ত্রিকোনা জগদ্দল পাথরের নিরেট দেহে সাদাটে রঙের একটি বিচিত্র রেখাচিত্র দেখে দারুণ অবাক হই! ইভা বলে ওঠে, হাজার বছর আগে আদিম মানুষের আঁকা নাঙ্গা পাথরের গায়ে এ রকমের চিত্র মাঝেমধ্যে নিকারাগুয়ার বনভূমিতে পাওয়া যায়। এ নিয়ে আর্কিওলজিস্টরা কিছু গবেষণাও করেছেন, কিন্তু নকশাগুলোর সঠিক মর্মার্থ এখনও অনুধাবন করা যায়নি। চিত্রিত-পাথরটি একপাশে রেখে, আমরা কুয়াশায় ঘোর হয়ে আসা ক্লাউড ফরেস্টে সবুজে ধূসর মাখা পত্রপল্লবের ছত্রীর ভেতরে ঢুকি। তখনই ইভা ঘাড় বাঁকিয়ে ওপরের দিকে তাকায়। মস্ত একটি রকের ওপর বসে জিব বের করে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে ব্রিসা। সে মুখের সামনে দুহাতে কাপ করে, ‘ভলবের আ লা শ্যালে’ বা ‘ভিলাতে ফিরে যাও ব্রিসা’, বললে মেয়েটির গাঢ় স্বর প্রতিধ্বনিতে ছড়িয়ে পড়ে মেঘময় পাথুরে বনানীতে।
ক্লাউড ফরেস্টের ভিন্ন এ ক্লাইমেটিক জোনের বাতাবরণে ছড়িয়ে আছে শীতার্ত অনুভূতি। গাছপালার নিবিড় ছায়ায় শরীরে মেঘের আবেশ মেখে যেতে যেতে ভারি স্নিগ্ধ লাগে। নীরবে হেঁটে আমরা চলে আসি ‘লা লাগুনা’ বা লেকের পাড়ে। এখানে বেজায় সবুজ হয়ে জলের কিনার ঘেঁষে ফলেছে ঘন দিঘল ঘাস। পানির ওপর বাষ্প হয়ে মৃদু হাওয়ায় উড়ছে কুয়াশা। আমরা ক্লান্ত, তাই শরীর ছেড়ে দিয়ে বসে পড়ি, আমাদের চারদিকে ওড়ে পলকা সব ঘাসফড়িং। আমরা কলাপাতায় মোড়া ফ্রেশ চিজের সঙ্গে ফিনকা নেবলিনার আউটলেট থেকে কেনা পানীয় পান করি। টি-শার্ট ও টাইটস খুলে সুইমিং স্যুটের বিকিনি পরে নীরবে পানির দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকে ইভা। তার অসাধারণ দেহবল্লরী ছড়ায় আশ্চর্য আকর্ষণ। আমি তার চোখের দিকে তাকাই, তাতে খানিক মায়া ছড়ালেও আমার প্রতি ওখানে কোনো আগ্রহ দেখি না। হ্রদের জলে কুয়াশা কেটে জোড়ায় জোড়ায় উড়ছে ফড়িং। স্তব্ধতা এখানে এত গাঢ় হয়ে জমে আছে যে, আমরা পরস্পরের হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি পরিষ্কার শুনতে পাই। নীরবতা একসময় অসহনীয় হয়ে উঠলে আমি জানতে চাই, ‘ইভা, তুমি বলছিলে না মিরাফ্লোরে পাখি আছে ২৩৬ প্রজাতির, তারা সবাই কি বিশ্রাম করছে? জলের হাঁসগুলো আজ গেল কোথায়?’ সে আমার হাতটি তুলে ধরে পাশে একটি গাছের ডালের দিকে নিশানা করে মৃদু হেসে সরসরিয়ে নেমে যায় জলে; আর আমি দেখি, ডালজুড়ে পালকের কালচে-নীলে লালচে সোনালি রং ছড়িয়ে বেজায় ইমপ্রেসিভ ঠোঁটে খুনসুটিতে মেতেছে এক জোড়া টুক্যান পাখি। আমিও সরোবরে গা ডোবাই। কুয়াশার উর্ণনাভ ছত্রখান করে দিয়ে সাঁতরে যায় ইভা। ভাসতে ভাসতে ইভার কাছ থেকে মাত্র কয়েক দিন আগে পাওয়া উপহার লাটিমটির কথা মনে পড়ে। দিনমান ঘুরতে ঘুরতে পাহাড়-বনানী ডিঙিয়ে হ্রদে এসে আমার ঘূর্ণনের গতি শ্লথ হয়ে আসছে।
অবগাহনের পর এক চিলতে রোদের সন্ধানে আমরা এসে পড়ি জলপ্রপাতের কাছাকাছি। এদিকে পাহাড় নিরেট পাথরে বাঁধানো। রকওয়ালের খাড়াই বেয়ে ঝরছে প্রপাতের চলমান জল। তাতে জুনিপোকার মতো ঝিলিক পাড়ছে সূর্যালোক। ইভা রোদে আধশোয়া হলে, আমি চিকেন-তমালের প্যাকেট খুলে প্লাস্টিকের প্লেটে আগুয়াকারতের স্যালাদ সাজাই। সে উঠে বসে তমালেতে কষে কামড় দেয়, তাতে তার বিকিনি লাইনের ওপর কোমরে উল্কি করে আঁকা করোটির মণিহীন চোখের কোটরে বৃশ্চিকের চিত্রটি পরিষ্কার চোখে পড়ে। নিকারাগুয়ার ইসতেলি শহরে আমি সপ্তা-কয়েক হলো বসবাস করছি। এ চিত্র যে কুখ্যাত গ্যাং ‘ক্রানেও এসকরপিওন’ বা ‘করোটি-বৃশ্চিকে’র প্রতীক– এ ব্যাপারেও আমি সম্যক অবগত। কিডন্যাপিং ও ড্রাগসের সঙ্গে যুক্ত এই গ্যাংয়ের নানাবিধ তৎপরতার খবর আমি হামেশা লক্যাল পত্রিকায় পড়ি। আমার যুগপৎ নার্ভাসনেস ও বেজায় অবাক হওয়ার বিষয়টি সে বুঝতে পেরে, উল্কি করে আঁকা চিত্রটির ওপর অনামিকা রেখে মৃদুস্বরে বলে, ‘আই হোপ, ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড করোটি-বৃশ্চিকের একজন আমাকে নিয়েছে, আমি স্বেচ্ছায় তার পৌরুষকে বরণ করে নেওয়াতে আমার শরীরের ওপর জন্মেছে তার অধিকার। সে আমাকে প্রটেকশন দিচ্ছে। এই প্রতীক আছে বলে আমার শরীর নিরাপদ, কেউ তা স্পর্শ করতে সাহস পায় না।’
খানিক নিশ্চুপ থেকে বিষয়টির ভয়াবহতা নিয়ে আমি ভাবি। যেহেতু ইভার সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে জড়িয়ে পড়েছি, সুতরাং নার্ভাস হয়ে ব্যাপারটিকে কেঁচে-গণ্ডূষ না করে সরাসরি তাকে ফেইস করতে চাই। ইভাকে তৃষ্ণার্থ দেখায়, সুতরাং নীরবে তার হাতে তুলে দেই পানীয়ের বোতল। সে পান করতে করতে যেন আমার ডিলেমা ও নার্ভাসনেস বুঝতে পারে, ম্লান হেসে খুব সহমর্মী দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায় সে। আমি কিঞ্চিৎ ভেবেচিন্তে অতঃপর বলেই ফেলি, ‘তুমি তো আমার আমিগা সিকরেতা বা গোপন বান্ধবী, তুমি কি তোমার সিক্রেটটি সম্পর্কে আমাকে বিস্তারিত বলতে চাও?’ ইভা কোনো দ্বিধা না করে জবাব দেয়, ‘বলা যাবে না কেন? ইসতেলি শহরের অনেকেই তো এ বিষয়ে কমবেশি জানে। সো ইফ ইউ আর ইন্টারেস্টেড...। বললামই-বা তোমাকে...।’ এবার সরাসরি প্রশ্ন করি, ‘আমার যা জানতে ইচ্ছা হচ্ছে সেটা হলো, তুমি কি ড্রাগসে আসক্ত, ইভা?’
‘নো, নট রিয়েলি’, বলে সে মাথা দোলায়, আমি আবার জিজ্ঞেস করি, ‘দ্যান টেল মি করোটি-বৃশ্চিক গ্যাংয়ের কী তোমাকে আকর্ষণ করেছে?’ সে জবাব দেয়, “এ বিষয়টা বুঝতে হলে তোমাকে জানতে হবে আমার ব্যাকগ্রাউন্ড। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে কারাবরণ করেন আমার বাবা, ভুল ওষুধ খেয়ে জেলে মৃত্যু হয় তার। আমাদের পরিবারে চার প্রজন্মের খামারবাড়ি ফিনকা নেবলিনার শ্যালে থেকে উৎখাত হয়ে আমরা বর্তমানে বসবাস করছি ভাড়াবাড়িতে। আমার স্পোর্টসে তীব্র আগ্রহ কিন্তু স্কুলের বাস্কেটবল টিমে আমাকে নেবে না পুঁজিবাদী প্রতিক্রিয়াশীলের সন্তান বলে। আমার বয়স পনেরো-ষোলো হতেই স্কুল থেকে যাওয়া-আসার পথে বিপ্লবের সঙ্গে যুক্ত ছিল যারা, এসব পরিবারের ছেলেরা ‘প্রসতিতুতা রিঅ্যাকশনারিও’ বা ‘প্রতিক্রিয়াশীল রূপজীবা’ বলে হিড়িক দিত। একদিন সন্ধ্যার দিকে কয়েকটি ছেলে আমাকে কর্নার করে ভূত-প্রেত উপদ্রুত একটি পোড়ো চার্চবাড়ির কাছে। তারা আমাকে ঘণ্টাঘরের অন্ধকারে টেনে নিতে নিতে বলছিল, ‘দানোস তু এরমোসো কুয়ারপো’, বা ‘দাও আমাদের তোমার চমৎকার শরীর, দেবে না প্রতিক্রিয়াশীল রূপজীবা?’ আমাকে যখন তারা বিবস্ত্র করছে, ঠিক তখন অশ্বারোহীর মতো চার্চের চাতালে লাফিয়ে ল্যান্ড করে হেডলাইট নেভানো একটি মোটরবাইক। এরিক হুসতিস তার হেলমেটে বাঁধা হেডল্যাম্প জ্বেলে ঘণ্টাঘরের নিচের ভূতুড়ে আঁধার আলোকিত করলে, আমাকে সেক্সুয়ালি অ্যাবিউস করতে থাকা ছেলেগুলো স্রেফ পালিয়ে যায়। এরিক তার রিভলভার ইউজ না করে তা গুটিয়ে রাখে জ্যাকেটের ভেতর হৌলস্টারে।”
ইসকুয়েলা হোরাইজনতিতে এসপানিওল শেখার একটা পদ্ধতি হিসেবে আমি নিয়ম করে ইভার সহায়তায় লক্যাল পত্রিকার পুরোনো সংখ্যাগুলো পড়ছি। করোটি-বৃশ্চিক গ্যাংয়ের প্রধান চাঁই এরিক হুসতিসের প্রসঙ্গ এতবার পত্রিকায় ছেপেছে যে, নাম শুনে তাকে শনাক্ত করতে আমার কোনো অসুবিধা হয় না। তবে মফস্বল শহরের এই টেররের উল্লেখে আমার শিউরে ওঠাকেও গোপন করতে পারি না। ইভা বিষয়টি লক্ষ করে যেন বাচ্চাকে রূপকথার গল্প বলছে, এমন ভঙ্গিতে কন্টিনিউ করে। ‘মোটরবাইকের পেছনে বসিয়ে এরিক আমাকে পৌঁছে দেয় বাসায়। দুদিন পর স্কুলে করোটি-বৃশ্চিকের লোগো আঁকা পোস্টার পড়ে। তাতে আমার নাম ঊহ্য রেখে ঘণ্টাঘরের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ঘোষণা দেওয়া হয়, এ মেয়েকে নিয়ে এ রকমের কিছুর পুনরাবৃত্তি হলে অ্যাসিড মাখিয়ে বিলোপ করে দেওয়া হবে প্রজননের ক্ষমতা।’
‘লিসেন মাই সিমপেথিক ফ্রেন্ড, আমার সঙ্গে করোটি-বৃশ্চিকের যোগাযোগ হয় আরও বার কয়েক, বাস্কেটবল টিমে স্থান পাওয়ার বিষয়টি তারা নিশ্চিত করে, তবে বিনিময়ে এরিক হুসতিস কিছু চায়নি। কিন্তু আমিই বরং বছরখানেক পর আদ্যোপান্ত বিবেচনা করে; প্রটেকশনের ব্যাপারটি পাকাপোক্ত করার জন্য নিজেকে অফার করি। আমি যেদিন এরিককে বরণ করে নিই, সেদিন করোটি-বৃশ্চিক একটি রিচ্যুয়েলের আয়োজন করে। এ আচারের ভেতর আনুষ্ঠানিকভাবে আমি শরীরে উল্কি আঁকিয়ে নিলে, গ্যাংয়ের অন্য সদস্যরা আমাকে প্রটেক্ট করার শপথ নেয়।’ ইভা এবার ফিক করে হেসে বলে– ‘আয়োরা সয় সু চিকা, ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড, নাও আই অ্যাম হিজ গার্ল।’
বিষয়টি নিয়ে ভাবতেই আমার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, ‘এরিক হুসতিস তো কারাগারে, তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে না?’ আমার এ প্রশ্নে ইভা কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করে বলে, ‘অ্যারেস্ট হওয়ার মাসখানেক আগে সে আমাদের জন্য চমৎকার একটি কাজ করে। মাঝেমধ্যে এরিক আমাদের বাসায় এসে আমার আবুয়েলো বা গ্র্যান্ডফাদারের সঙ্গে কথাবার্তা বলত। আবুয়েলোর অভিযোগ আছে যে, তাকে স্থানীয় বিপ্লবী সান্দিনিস্তা পার্টির কর্মকর্তারা নাহকভাবে পারিবারিক রেসিডেনশিয়াল শ্যালে থেকে উৎখাত করেছে। তার ব্যক্তিগত জিনিস– বইপুস্তক, গানের রেকর্ড বা আসবাব ইত্যাদি হুকুম দখলের পেছনে কোনো আইনি ভিত্তি নেই। এরিক আমাকে কথা দিয়েছিল যে পার্টির সঙ্গে লড়ে সে আমাদের শ্যালে ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু সফল হতে পারেনি। একেবারে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র সে না। আবুয়েলোর গত জন্মদিনে সে পিকাপ-ট্রাক নিয়ে শ্যালেতে যায়। স্টেনগানের গুলি ছুড়ে কো-অপারেটিভের কর্মচারীদের ভড়কে দিয়ে কিছু আসবাব, যেমন আবুয়েলোর ডেকচেয়ার, সৈকত-ছাতা, টেলিস্কোপ, মায়ের গ্র্যান্ডপিয়ানো ও আমার বাবার ক্যামেরাগুলো ট্রাকে তুলে নিয়ে আসে আমাদের বাসায়। এ ঘটনা থেকে তার লক্যাল পার্টি-বসদের সঙ্গে কনফ্লিক্টের সূত্রপাত হয়।’ 
আমি জানতে চাই, ‘এরিক হুসতিসের মৃত্যুদণ্ড কি সত্যি সত্যি কার্যকর হবে?’ চিন্তিত মুখে ইভা জবাব দেয়, ‘আমার অবুয়েলোর ধারণা ইলেকশনের পর তা মওকুফ করে যাবজ্জীবন দেওয়া হবে। সান্দানিস্তা পার্টির বর্তমান নেতা দানিয়েল অরতেগা যে কোকেনের প্রচলন ও গ্যাং ভায়োলেন্স সংযত করার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে ভোটে লড়ছেন, এর জন্যই তো এরিককে গ্রেপ্তার করা হলো।’
এ পর্যন্ত বলে ইভা একটু পজ নেয়। খানিকক্ষণ নীরব থেকে সে বলে, ‘আমিগো সিকরেতো’ বা গোপন বন্ধুত্বের সূচনা যেহেতু আমি করেছি, সুতরাং অন্য একসময় না হয় তোমাকে আরও খানিকটা সিক্রেট বলব।
ইভাকে পরিশ্রান্ত দেখায়। সে চুপ করে চেয়ে থাকে ষাট মিটার উঁচু থেকে নেমে আসা প্রপাতের জলধারার দিকে। জল ঝরছে, আর নিকারাগুয়ার এক অখ্যাত শহরে আমারও সময় কেটে যাচ্ছে। কখনও আমি ইভার মতো কারও সঙ্গ পাচ্ছি। আবার কখনও নিঃসঙ্গভাবে আমার দিন যাচ্ছে। আরও কিছুক্ষণ পর আমি মিরাফ্লোরে বসে থাকব না। কিছুদিন পর আমি নিকারাগুয়াতেও থাকব না। অন্য কোনো দেশের ভিন্ন প্রতিবেশে, ইভার সঙ্গে নিবিড়ভাবে অন্তরঙ্গ হয়েও প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার খেদ মুছে যাবে আমার স্মৃতি থেকে, দিন কাটবে…। একদিন ক্রমাগত ভ্রমণের আগ্রহও মিইয়ে আসবে। দেখা হবে না আর কারও সঙ্গে। কিংবা যদি দেখাও হয় আমি আগ্রহবোধ করব না। আমার মেয়াদ শেষ হবে। যখন আমি থাকব না, হাজার বছর পরও কিন্তু প্রপাতের জলধারা এমনিভাবে বয়ে যাবে।
বেলা পড়ে আসছে, তাই আমি ইসতেলি শহরে ফিরে যেতে চাই। ইভা দাঁড়িয়ে পড়ে বিকিনি বটম থেকে শুকনো ঘাস ও ঝরা পাতা ঝাড়তে ঝাড়তে বলে, ‘নো তে প্রেঅকুপে’ বা ‘দুশ্চিন্তা কোরো না তো। সন্ধ্যা হলেও মিরাফ্লোর থেকে ইসতেলি শহরে ফেরার জন্য পিকআপ-ট্রাক বা ভ্যান কিছু একটা পাওয়া যাবেই।’ আমি তার সঙ্গে আবার ব্যাকপ্যাক কাঁধে ক্লাউড ফরেস্টের ভেতর দিয়ে ওপরে উঠতে শুরু করি। মেঘ গাঢ় কুয়াশা হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে, তাই সবুজ বনানীকে ওয়াশ পদ্ধতিতে আঁকা জাপানিজ ল্যান্ডস্কেপের মতো দেখায়। মেঘে আর্দ্র পাথরের পিছল শ্যাওলা সাবধানে ডিঙাতে ডিঙাতে ইভা বলে, ‘আই উন পকো মাস পারা ভের,’ বা ‘আরও ছোট্ট একটা জিনিস আছে যা দেখতে হয় কিন্তু।’ আমরা মেঘ কেটে কেটে বেশ খানিকটা ওপরে চলে উঠে আসি। সূর্যালোকে পাহাড়ের তাবৎ বনভূমি এ প্রেক্ষিতে হয়ে ওঠে সিল্কস্ক্রিনের বর্ণিল প্রিন্ট। হাই এলিভেশনে বদলে যেতে থাকে গাছপালার আকার-আকৃতি। মুখর হয়ে ওঠে অজস্র পতঙ্গ। আরও মিনিট বিশেক ওপরে ওঠার পর আমরা দম নিতে থামি। নিচে বাটকুল আকারের বৃক্ষ-ঝোপে লেগে আছে শেভিং-ফোমের মতো থোকা থোকা মেঘ। 


পাথরের ওপাশ থেকে সাদা রঙের কটি গিনিপিগ-জাতীয় ইঁদুর কিচকিচ করে বেরিয়ে আসে। চলতে চলতে পথে পড়ে থাকা মস্ত এক সরীসৃপের খোলসের পাশে আমরা একটু থামি। ঝরা পাতা সরসরিয়ে পাথরের আড়ালে চলে যাচ্ছে দীর্ঘদেহী একটা কিছু। সে মোড় ফিরে ফণা তুললে আমার তো বাপের নাম ভুলে যাওয়ার উপক্রম হয়। আমার ভীতি টের পেয়ে ইভা হাত ছুঁয়ে বলে, ‘এটা খুঁজছে সাদা ইঁদুর, আমাদের ভয়ের কিছু নেই। কামন আপ।’
বসে জিরোতে থাকা উটের পিঠের মতো ছড়ানো একটি বেজায় উঁচু পাথর বেয়ে আমরা উপরে উঠি। এ রকে লেগে থাকা সবুজ শ্যাওলায় সাদাটে হয়ে জন্মেছে বেশ কিছু ফাঙ্গাস। ‘দিস ইজ দ্য হাইয়েস্ট পয়েন্ট। আমরা চলে এসেছি এক হাজার চারশ চুরাশি মিটার উঁচুতে।’ আমরা পরস্পরের শরীর ছুঁয়ে ভারসাম্য রক্ষা করতে করতে ষাঁড়ের কুঁকুদের মতো আরেক খণ্ড পাথরের ঠেকে উঠতে যাই। বেশ খানিকটা নিচে চা-ঝোপের মতো বনানীতে লেগে থাকা মেঘ কেটে টার্ন নেয় একঝাঁক বলাকা। পাখিগুলো ভি-ফর্মেশনে উড়ে যাচ্ছে ঈশান কোণের দিকে। আমি ওদিকে নিরিখ করে তাকাই। বেশ কয়েকটি আলাদা আলাদা পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে দিগন্তে। একটি-দুটির ভলকেনিক কৌন থেকে উড়ছে ধোঁয়া। ‘দ্য ভিস্টা, দ্য বিউটি ইজ টোটালি ক্যাপটিভেটিং! হোয়াট আর দে, আমরা কী দেখছি, ইভা?’ প্রশ্ন করে আমি তার দিকে তাকাই। ইভা আমার কাঁধে ভর দিয়ে কুঁকুদের ওপর দাঁড়িয়ে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘বসকেস লস ভলকেনসিতোস,’ বা ‘তুমি তাকিয়ে আছ এক সারি আগুন-পাহাড়ের দিকে।’ আমরা ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এল তায়াকান, সেরো ইয়েলুকা, সেরো নিগ্রো, মমতমবিতো ইত্যাকার আগ্নেয়গিরিকে আলাদা আলাদাভাবে শনাক্ত করি। পাহাড়চূড়ার ধূসর ধোঁয়ায় গোধূলি মাখিয়ে দিচ্ছে হালকা গোলাপি শেড।
সন্ধ্যা হতে তেমন একটা দেরি নেই, তাই আমি নেমে আসি বিশাল এই রক থেকে। আমার পেছন পেছন নামছে ইভা। আমি ঘাড় ফিরিয়ে তাকাই। আমার চোখে তার দৃষ্টি লক হলে সে শ্যাওলায় পা ফসকাতে ফসকাতে ভারসাম্য রক্ষা করে। আমি নিচ থেকে দেখি, হাওয়ায় দুলে ওঠা ফলন্ত বাতাবি লেবুর ডালের মতো তার ভরাট বুকে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র দোদুল্যমানতা। আমি তার অর্ধন্মোচিত স্তন-যুগলের দিকে তাকিয়ে দৈহিকভাবে আকর্ষণবোধ করি। কিন্তু যেহেতু আমার চরিত্রে সংবেদনশীলতা নিয়ে কোনো সংকট নেই, তাই এ ব্যাপারে ভজঘট না করে খুব সংযতভাবে তার কাঁধে হাত রেখে বলি, ‘ইভা, প্রপাতের পাশে তুমি যা বললে, এ বিষয়ে আমি কি কোনো হেল্প করতে পারি?’ ইভা নতমুখী হয়ে জবাব দেয়, ‘তোমার হেল্পের একটু দরকার পড়েছে বলেই তোমাকে এসব পার্সোনাল সিক্রেট বলা। তুমি তো ইংরেজিতে চিঠি ড্রাফট করতে পারো। ইন্টারনেটে খোঁজ নিয়ে বের করতে পারবে আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থার অ্যাড্রেস, যারা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সাজা মওকুফ করে যাবজ্জীবন দেওয়ার জন্য নিকারাগুয়ার অরতেগা সরকারকে অনুরোধ করে চিঠি লিখবে?’ আমি তাকে আশ্বস্ত করে বলি, ‘ইন্টারনেটে খুঁজে এ ধরনের দু-একটি সংস্থার ঠিকানা বের করা কঠিন হবে না।’ ইভা আমাকে ‘গ্রাসিয়াস’ বা ‘ধন্যবাদ’ দিয়ে বলে, ‘কোকেন চোরাচালানের সঙ্গে এরিক যুক্ত ছিল, তার করোটি-বৃশ্চিক গ্যাং ব্যাংক ডাকাতি ও খুনের সঙ্গে লিপ্ত হলেও এরিকের কিন্তু রবিন হুড গোছের একটা চরিত্র আছে। সে ফাস্টফুডের রেস্তোরাঁ থেকে হ্যামবার্গার ছিনতাই করে শহরের গৃহহীনদের বিতরণ করা থেকে বস্তির দরিদ্রদের অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করার মতো অনেক ভালো কাজও করেছে। আমি এ ব্যাপারে কিছু স্পেসিফিক তথ্য জোগাড় করেছি। তুমি যদি একটু হেল্প করো, তাহলে তার ভালো কাজের বর্ণনা দিয়ে একটি চিঠি ড্রাফট করে কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থায় পাঠাতে চাই।’
আমরা অন্ধকার হওয়ার আগে দ্রুত হেঁটে পাহাড়ের নিচের লেয়ারে নামতে শুরু করি। নামতে নামতে ইভা বলে, ‘যদি এরিকের যাবজ্জীবন হয়, আমার আবুয়েলো বলছে, সে বেরিয়ে আসবে বছর দশেক পর। না হয় অপেক্ষাই করলাম এক দশক। তারপরও তো আমাদের হাতে থাকবে বছর কয়েক একত্রে জোড় বাঁধার। 

আরও পড়ুন

×